[ রা জ নী তি ]

সংকট সমাধানে রাজনীতিতে সুবাতাস

আপডেট : ০৩ জানুয়ারি ২০১৩, ২১:৪৪
গত ৩১ ডিসেম্বর স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বাংলাদেশ সচিবালয়ে তার নিজ দফতরে সাংবাদিকদের বলেন, চলমান রাজনৈতিক সংকট নিরসনে বিরোধী দল বিএনপির সঙ্গে ভেতরে ভেতরে আলোচনা চলছে। এখন তাদের কাছ থেকে সাড়া পেলে শিগগির আলোচনা শুরু হবে। আলোচনার পর আগামী সংসদ নির্বাচনে সব দল অংশ নেবে। তার এ বক্তব্যের জবাবে বিএনপি সরকারের সঙ্গে সংলাপে বসার আগ্রহ প্রকাশ করে বলেছে, সে সংলাপ হতে হবে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ফর্মুলার ভিত্তিতে। গত ১ জানুয়ারি রাজধানীর এক অনুষ্ঠানে বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রূপরেখা নিয়ে সরকারের সঙ্গে প্রকাশ্য আলোচনার ওপর জোর দিয়েছেন। ২০১১ সালের জুনে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী দ্বারা ১৯৯৬ সালে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে প্রবর্তিত নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের পর হতে রাজনৈতিক সংকট ঘনীভূত হতে থাকে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনকালে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহালের দাবিতে বিএনপি গত দেড় বছরে রাজধানী ঢাকা এবং সারাদেশে লংমার্চ, হরতাল, অবরোধ ও গণসমাবেশ করেছে। তারা বলছেন, সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠেয় নির্বাচনে কারচুপি করে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ পুনরায় ক্ষমতায় যাওয়ার নীল নকশা করেছে। বিএনপি দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠেয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করার কথা বলে আসছে। তারা সংসদ নির্বাচনকালে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহালে সংসদে বিল আনতে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ওপর চাপ অব্যাহত রেখেছে। নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রূপরেখা এবং প্রধান উপদেষ্টা নিয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সঙ্গে আলোচনায় বসতে তারা রাজি আছে। এরূপ তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে ‘অন্তর্বর্তী’ সরকার বলে আখ্যায়িত করতেও তারা সম্মত আছে। এদিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংসদ নির্বাচনকালে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহালে বিএনপির দাবি একাধিকবার নাকচ করে দিয়েছেন। তার যুক্তি হলো, দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রীম কোর্ট নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বাতিল করে দিয়েছেন এবং শুধু জনগণের দ্বারা নির্বাচিত জাতীয় সংসদের সদস্যগণ দ্বারা তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের পক্ষে রায় দিয়েছেন। সুতরাং অনির্বাচিত ব্যক্তিবর্গের সমন্বয়ে নির্বাচনকালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে। তাছাড়া সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের আলোকে জাতীয় সংসদ সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি প্রবর্তনকারী ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল করেছে। সংকট সমাধানের উপায় হিসেবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত ৩০ জুলাই লন্ডনে বিবিসিকে দেয়া সাক্ষাত্কারে নির্বাচনকালে বিরোধী দলের সমন্বয়ে সরকার গঠনের প্রস্তাব দেন। তিনি বলেন, ‘অন্তর্বর্তী মন্ত্রিসভায় বিএনপিও অংশগ্রহণ করতে পারবে। নির্বাচনের সময় সরকার গঠনে বিরোধী দল যদি অংশীদারিত্ব চায় সেটা দিতে পারি। সবাই মিলে আমরা নির্বাচন করতে পারি। একটা ছোট মন্ত্রিসভা করে ইলেকশন করতে পারি।’এজন্য সংসদে এসে বিএনপিকে প্রস্তাব দেয়ার আহবান জানান প্রধানমন্ত্রী। যদিও আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ বর্তমান সরকারের অধীনেই আগামী সংসদ নির্বাচন হবে বলে মাঝে মাঝে বক্তব্য দেন, এটি তাদের রাজনৈতিক কৌশল বলে মনে হয়। বিএনপির প্রতিনিধির সমন্বয়ে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ তাদের আগের প্রস্তাব থেকে সরে যায়নি। ২ জানুয়ারি বাংলাদেশ সচিবালয়ে তার নিজ দফতরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা এবং কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী বিএনপির সদস্য সমন্বয়ে নির্বাচনকালীন অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের প্রস্তাব পুনর্ব্যক্ত করেছেন। তিনিও বিএনপি নেতৃবৃন্দের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিকভাবে চলমান আলাপ-আলোচনার কথা স্বীকার করেছেন। সংসদ নির্বাচনকালে বিএনপির সদস্য সমন্বয়ে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনে বেগম খালেদা জিয়ার আপত্তি করা উচিত হবে না এ কারণে যে, এরূপ অন্তর্বর্তী সরকার গঠন মূলত তারই চিন্তার ফসল। ১৯৯৪ সালে প্রধান বিরোধী দল আওয়ামী লীগসহ জাতীয় পার্টি ও জামাতে ইসলামি নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলন শুরু করলে প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া প্রথম বিরোধী দলের সমন্বয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের প্রস্তাব করেছিলেন। তিনি দশ সদস্যের একটি মন্ত্রিসভা প্রস্তাব করেছিলেন যেখানে বিরোধী জোটের চারজন এবং সরকারি দলের পাঁচজন সদস্য থাকার কথা ছিল। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রস্তাব করা হয়েছিল তখন ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে। প্রধান বিরোধী দল আওয়ামী লীগ খালেদা জিয়াকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মেনে নিতে রাজি না হওয়ায় তখন উদ্যোগটি সফল হয়নি। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধানমন্ত্রী নিয়োগসহ পুরো বিষয়টি নিয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও প্রধান বিরোধী দল বিএনপি খোলা মনে আলোচনা করে সমাধানে পৌঁছতে পারে। ইতিপূর্বে বিএনপি বলেছিল, রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে সংলাপের উদ্যোগে নিলে তারা তাতে ইতিবাচক সাড়া দেবে। সুতরাং রাষ্ট্রপতি এ সংলাপ অনুষ্ঠানের উদ্যোগ নিয়ে চলমান সংকট সমাধানে সফল হলে জাতি তার কাছে কৃতজ্ঞ থাকবে। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের সামপ্রতিক বক্তব্যে অনেকে চলমান সংকট সমাধানে আশার আলো দেখছেন। সরকারি ও বিরোধী দলের নেতৃবৃন্দের অনানুষ্ঠানিক আলোচনাকে তারা আনুষ্ঠানিক আলোচনার পূর্বাভাস বলে মনে করছেন। এটাকে তারা রাজনীতিতে সুবাতাস বইছে বলেও মনে করছেন। বিএনপি বলছে, নির্বাচনকালে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা, তা তত্ত্বাবধায় বা অন্তর্বর্তী যে নামেই হোক, পুনর্বহাল না করা হলে তারা নির্বাচনে অংশ নেবে না। তবে এটাই কী তাদের শেষ কথা। অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করেন, যে ফর্মেই আগামী সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হোক না কেন, শেষ পর্যন্ত বিএনপি সে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে চাইবে। মুখে বিএনপি যাই বলুক, বেশ কয়েকটি কারণে তারা নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য তলে তলে মুখিয়ে আছে। আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার জন্য দলটি পূর্ণ প্রস্তুতি নিচ্ছে মর্মে সমপ্রতি পত্র-পত্রিকায় খবর প্রকাশিত হয়েছে এবং এর সত্যতা দলটির নীতিনির্ধারণ পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ স্বীকার করেছেন। যেসব কারণে বিএনপি নির্বাচনে যাবে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে—এক. দেশি-বিদেশি সংস্থার জরিপে আওয়ামী লীগের তুলনায় বিএনপির অবস্থান ভালো। দুই. দলটি মনে করে, নির্বাচনে আর যাই হোক, ১৯৯০পূর্ববর্তী ভোট ডাকাতির সুযোগ থাকবে না। সরকারের জনপ্রিয়তা কমে যাওয়ায় ‘সূক্ষ্ম কারচুপি’ হলেও সরকার পরাজয় ঠেকাতে পারবে না। তিন. বিএনপি জানে, আগামী সংসদ নির্বাচনী প্রতিযোগিতায় তারা ভালো অবস্থানে থাকায় রাজনৈতিক সংঘাত বা অন্য কোনো অজুহাতে অগণতান্ত্রিক শক্তির রাষ্ট্রক্ষমতা গ্রহণ তাদের জন্য চরম ক্ষতিকর। চার. বর্তমানে বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশী এবং মাঝারি হতে তৃণমূল পর্যায়ের কর্মীদের মধ্যে উচ্ছ্বসিত ভাব বিরাজমান। নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করে তাদের মধ্যে কোনভাবেই হতাশা সৃষ্টি করা সম্ভব নয় বিএনপির পক্ষে। ক্ষমতাসীন দল হিসেবে আওয়ামী লীগকে দেশ ও গণতন্ত্রের স্বার্থে সংকীর্ণ দলীয় স্বার্থ ত্যাগ করে এগিয়ে আসতে হবে। চলমান সংকট সমাধানে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। চলমান সংকট সমাধানে বিরোধী দলকে আলোচনার টেবিলে নিয়ে আসতে তাদের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা নিতে হবে। তাদের নিকট অতীত থেকে এ শিক্ষা নিতে হবে যে, চলমান সংকট বা সংঘাতের অজুহাতে অগণতান্ত্রিক শক্তির উত্থান ঘটলে বিরোধী দল ও সরকারি দল উভয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বরং নিকট অতীতের শিক্ষা থেকে বলা যায়, সরকারি দল বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। রাজনীতিতে যে সুবাতাসের আভাস পাওয়া যাচ্ছে তা আরো জোরে বয়ে সংকট সমাধানে পথের সকল বাধা-বিপত্তিকে দূরে নিক্ষেপ করুক। সবশেষে যা বলা দরকার তা হলো, সংঘাত ও ঝঞ্ঝাটপূর্ণ একটি বছরকে পেছনে ফেলে দেশবাসী একটি নতুন বছরকে স্বাগত জানিয়েছেন। তারা চান, নতুন বছর দেশের জন্য নিয়ে আসুক শান্তি ও অগ্রগতি। তারা চান, একটি সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত হোক জাতীয় সংসদ। সংসদ হোক রাষ্ট্রের সকল কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু। একটি সফল গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে বাংলাদেশ বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াক। লেখক :সাবেক সচিব E-mail: latifm43¦gmail.com

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন