কেন এই নৃশংসতা

আপডেট : ০৪ জানুয়ারি ২০১৩, ২০:০৩
গত সোমবার কুমিল্লায় নির্মমভাবে খুন হইয়াছে সাঈন জাকারিয়া নিলয় নামে এক স্কুলছাত্র। সংবাদপত্রে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ছুরি ও চাপাতি দিয়া কোপাইয়া হত্যা করা হয় এই কিশোরটিকে। সব চাইতে লোমহর্ষক তথ্যটি হইল— সন্দেহভাজন খুনিদের মধ্যে ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণীর দুইজন ছাত্রও রহিয়াছে। জাতিসংঘের প্রদত্ত সংজ্ঞা অনুযায়ী, হতভাগ্য সেই স্কুলছাত্র এবং তাহার ঘাতকরা এখনও শিশু বা শিশুর পর্যায়ভুক্ত। তবে শিশু-কিশোরদের এই ধরনের নৃশংসতায় জড়াইয়া পড়িবার ঘটনা ইহাই প্রথম নহে। শুধু চট্টগ্রামেই অনুরূপ কমপক্ষে দুইটি চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটিয়াছে ২০১২ সালে। তন্মধ্যে হিংস্র কুকুর লেলাইয়া দিয়া সহপাঠীকে হত্যার ঘটনাটি সারাদেশে আলোড়ন তুলিয়াছিল। শিশু-কিশোরদের মধ্যে খুনখারাবির মতো মারাত্মক অপরাধপ্রবণতা যে ক্রমবর্ধমান— ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) এক জরিপেও তাহা সন্দেহাতীতভাবে প্রতিভাত হইয়াছিল। বিষয়টি যে খুবই উদ্বেগজনক তাহাতে সন্দেহ নাই। অপরাধীদের অবশ্যই দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া প্রয়োজন। তবে শুধু শাস্তি দিয়া কার্যকরভাবে এই ধরনের বিপজ্জনক প্রবণতা রোধ করা যাইবে বলিয়া মনে হয় না। বরং কেন কোমলমতি শিশু-কিশোররা গুরুতর অপরাধের সাথে জড়াইয়া পড়িতেছে; ইহা কি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নাকি সামগ্রিক সমাজ-বাস্তবতারই প্রতিচ্ছবি— তাহা উদ্ঘাটন করিয়া যথোপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি বলিয়া আমরা মনে করি। সংবাদপত্রে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের প্রণীত এক প্রতিবেদনে বলা হইয়াছে যে, শুধু ২০১২ সালেই ৯০০ জন নারী ও শিশুকে হত্যা করা হইয়াছে। তবে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) হাসান মাহমুদ খন্দকার ইহাকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি বলিতে নারাজ। তাহার মতে, যাহা ঘটিতেছে তাহা বিচ্ছিন্ন ঘটনা মাত্র। এই ধরনের ঘটনা সকল সমাজেই ঘটিয়া থাকে। হত্যাকাণ্ডের সামগ্রিক পরিসংখ্যান বা প্রবণতা যাহাই হউক না কেন, সামগ্রিকভাবে সমাজে নৃশংসতার মাত্রা যে বাড়িতেছে তাহা সহজেই অনুমেয়। কুমিল্লার স্কুলছাত্র নিলয় যেই রাত্রে খুন হইয়াছে, সেইদিনই নরসিংদীর ঘোড়াশাল পৌর বিএনপির কার্যালয়ে ঢুকিয়া কোপাইয়া হত্যা করা হইয়াছে জেলা বিএনপির সদস্য পতিক উল্যাহকে। ইহার আগেরদিন মিরপুরে নিজগৃহে খুন হইয়াছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের স্ত্রী আইনজীবী রওশন আরা। এই তালিকা অনায়াসে আরও দীর্ঘ করা যায়। কারণ প্রায় প্রতিদিনই অনুরূপ হত্যার ঘটনা ঘটিতেছে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনিকেও নিজগৃহে নির্দয়ভাবে কোপাইয়া খুন করা হইয়াছিল। মর্মান্তিক সেই হত্যাকাণ্ডের পর প্রায় এক বত্সর অতিক্রান্ত হইতে চলিয়াছে। কিন্তু হত্যাকারীরা এখনও ধরাছোঁয়ার বাহিরে। অল্পদিনের ব্যবধানে মহাখালীতে একইভাবে খুন হইয়াছিলেন জাতীয় বক্ষব্যাধি হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক ডা: নারায়ণ চন্দ্র দত্ত। দেশব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টিকারী বিশ্বজিত্ সাহার নৃশংস হত্যাকাণ্ডের বিষয়টিও এইখানে দৃষ্টান্ত হিসাবে উপস্থাপন করা যায়। প্রকাশ্য দিবালোকে পুলিশসহ বহু লোকের সামনে চাপাতি দিয়া কোপাইয়া হত্যা করা হইয়াছে নিরপরাধ এই তরুণটিকে। ভয়ঙ্কর সেই দৃশ্যটি ইতোমধ্যে অসংখ্যবার প্রদর্শিত হইয়াছে বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে। এখনও হইতেছে। এইখানে দুইটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয়। প্রথমত, প্রতিটি ক্ষেত্রেই হত্যার ধরন প্রায় অভিন্ন। চাপাতি ও ছুরি দিয়া কোপাইয়া যেইভাবে মানুষ খুন করা হইতেছে— তাহা গল্প-উপন্যাস কিংবা সিনেমাকেও হার মানায়। দ্বিতীয়ত, টিভি চ্যানেলগুলিতে যেইভাবে বিশ্বজিতের উপর পাশবিক আক্রমণের বিষয়টি বারবার দেখানো হইয়াছে বা হইতেছে শিশুকিশোরদের উপর তাহার প্রভাব কী হইতে পারে তাহা কি কেউ ভাবিয়া দেখিয়াছেন? মনোবিজ্ঞানীরাই বিষয়টি ভালো বলিতে পারিবেন। তবে আমাদের মনে হইয়াছে যে শিশুকিশোরদের মধ্যে যেই গুরুতর অপরাধপ্রবণতা দেখা যাইতেছে তাহা বিচ্ছিন্ন কিছু নহে। সমাজদেহের রন্ধ্রে রন্ধ্রে যে অসহিষ্ণুতা, অন্যায়, অনিয়ম এবং নীতি ও আদর্শহীনতা বাসা বাঁধিয়াছে— শিশুকিশোররা তাহার অসহায় শিকারে পরিণত হইতেছে মাত্র। অতএব, এই আত্মঘাতী প্রবণতার লাগাম টানিয়া ধরিতে হইলে রাজনীতিবিদ, নীতিনির্ধারক মহল ও গণমাধ্যমসহ সংশ্লিষ্ট সকলকেই এই ব্যাপারে যথেষ্ট সাবধান ও সংযত হইতে হইবে।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন