এমন অনিয়ম আর নৈরাজ্য সব সময়েই ছিল। আপনার উচিত চোখ বন্ধ করে থাকা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রায় অবসর নিতে যাওয়া প্রথিতযশা এক রসায়ন বিজ্ঞানী উপদেশ দিচ্ছিলেন তার এক তরুণ সহকর্মীকে। অন্য এক বৈঠকে কেউ একজন যখন দেশের বিদ্যমান পরিস্থিতিতে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ আর বিরোধী দলগুলোর কার্যক্রম সম্পর্কে তেতো আর অসহিষ্ণু মতামত ব্যক্ত করছিলেন তখন গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের এক তরুণ অধ্যাপক প্রবোধ দিলেন এই বলে: তুমি কী জান না যে, এরা এভাবেই চলে! সুতরাং এদের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নাও।
তাহলে আমাদের করণীয় কী? নিজেদেরকে পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেয়ার চেষ্টা করা? সবাই যদি মানিয়ে নেই তাহলে এ নৈরাজ্য কবে কোথায় গিয়ে থামবে? আমরা যদি নিজেদেরকে মানিয়ে নেই তাহলে হাসিনা-খালেদা-এরশাদ-নিজামীর ক্ষমতার লড়াইয়ে বিশ্বজিেদর প্রাণ হারানো কী করে থামবে, জাতীয় ও ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়গুলোর চরম অপমান আর নির্যাতন কবে অবসান হবে, পোশাক-শ্রমিকদের নির্বিচারে পুড়িয়ে মারা কবে বন্ধ হবে? আর শোষণ ও দুর্নীতির মাধ্যমে গরিব-নিষ্পেষণ কবেইবা থামবে? স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে আমাদের সামনে দিয়ে এত কিছু ঘটে যাওয়ার পরও আমরা কেন সবকিছুর সঙ্গে মানিয়ে নিচ্ছি? শোষিত-বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর একটা ছোট্ট অংশ যারা শাসকগোষ্ঠীর সঙ্গে মুরুব্বি-মক্কেল (পেট্রন-ক্লায়েন্ট) সেজে সমাজে বিদ্যমান অসম বন্দোবস্ত থেকে লাভবান হয়ে থাকেন। লাভালাভের এ পরিমাণ যত নগণ্যই হোক না কেন বন্দোবস্তটি কোন কারণে টিকিয়ে রাখতে না পারলে যে তাদের তাত্ক্ষণিক ক্ষতি গুনতে হবে সেটা বুঝতে কারো সময় লাগে না। ফলে দীর্ঘমেয়াদে সামষ্টিক লাভালাভের হিসেব-নিকেশের চাইতে তাত্ক্ষণিক প্রয়োজনটাই যাদের কাছে মুখ্য বিচার্য, সে ধরনের লোকদের মধ্য থেকে এমন অসম বন্দোবস্তের প্রতি শর্তহীন আনুগত্যসম্পন্ন লোকের অভাব হয় না। কেন্দ্র থেকে প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত সর্বত্রই এদের পাওয়া যাবে। তারা চান বিদ্যমান পরিস্থিতির স্থিতাবস্থা।
মুরুব্বি-মক্কেল সম্পর্কের বাইরে থাকা জনগণের একটি বিরাট অংশ চলমান শোষণ-নিপীড়নমূলক ব্যবস্থার সঙ্গে নিজেদেরকে মানিয়ে নিয়েছেন। এদের প্রত্যাশা-পরিস্থিতি যেমন আছে, তেমনই থাক, এর চাইতে খারাপ যেন না হয়। ফলে শেষ বিচারে এরাও চলমান পরিস্থিতির স্থিতাবস্থার পক্ষে অবস্থান নেন। সমাজের এই অংশটির কাছে শোষণ আর বঞ্চনাই স্বাভাবিক পরিণতি। এ ব্যাপারে অর্থনীতি শাস্ত্রের পিতা এডাম স্মিথের ফতোয়া হলো: আমজনতা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে যে, এভাবেই চলা উচিত; আর আশা করে এভাবে চলতে থাকলে এক সময় তারাও অন্যের উপর আধিপত্য বিস্তার করার মতো অবস্থানে যেতে পারবে। সে কারণে চরম নিষ্পেষণমূলক সামাজিক ও রাজনৈতিক নিয়ম-কানুনের ব্যাপারেও সমাজে অনেকের সমর্থন মেলে।
তাহলে পরিবর্তনের উপায় কী? যে কোন পরিবর্তনই প্রাথমিকভাবে ধারণা হিসেবে সমাজে হাজির হয়। এই কাজটি ঐতিহাসিকভাবে বুদ্ধিজীবীরা পালন করেন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ফরাসি বিপ্লবের ভিত্তিভূমি প্রস্তুত করে রেখেছিলেন রুশো আর ভলতেয়ার। বাঙালি মুসলিম সমাজের অচলায়তন ভেঙ্গে দেয়ার জন্য রোকেয়া সাখাওয়াত্ হোসেন ও তত্পরবর্তী শিখা গোষ্ঠীর তত্পরতাও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সে প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের সমাজের কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তনে বুদ্ধিজীবীরা পথ দেখাবেন সেটাই প্রত্যাশিত। কিন্তু প্রত্যাশার সঙ্গে বাস্তবতার মিল সকল ক্ষেত্রে পাওয়া দুষ্কর। আমাদের দেশের বুদ্ধিজীবীদের বুদ্ধিজীবিতা দলীয় আনুগত্যের বৃত্তে বন্দি। অধ্যাপক নিলুফার পারভীন ‘পাবলিক ইনটিলেকচুয়ালস এন্ড পার্টিসানশিপ ইন বাংলাদেশ’ (২০১২) শিরোনামে প্রকাশিত গবেষণা গ্রন্থে এ বিষয়ে বিশদ ব্যাখ্যা হাজির করেছেন। ব্যক্তির দলীয় আনুগত্য থাকা স্বাভাবিক। তাই বলে কোন একজন বুদ্ধিজীবী যদি দাবি করেন শেখ হাসিনা বা খালেদা জিয়ার হাতকে শক্তিশালী করা তার কাজ তাহলে বুঝতে হবে কোথাও বিরাট গরবর আছে। সে কারণেই দেখা যায় একান্নজন বুদ্ধিজীবী যদি কোন একজন নোবেল জয়ী জাতির বিরুদ্ধে কোন ষড়যন্ত্র করেছিলেন সেটা ব্যাখ্যা করে বিবৃতি দেন, তার পরক্ষণেই বায়ান্নজন বুদ্ধিজীবী পাল্টা বিবৃতি হাজির করেন। এক ডজন বুদ্ধিজীবী যদি জাতিকে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে জনগণকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান, পরের মুহূর্তেই দেড় ডজন বুদ্ধিজীবী হাজির হন প্রহসনের বিচার রুখে দাঁড়ানোর ডাক নিয়ে। ফলে সমাজ বদলের একটি শর্ত বাংলাদেশে গরহাজির দেখা যাচ্ছে।
যে কেউ দাবি করতে পারেন যে, সমাজ পরিবর্তনের তত্ত্ব বিশ্বব্যাপী অনেক হয়েছে। বুদ্ধিজীবীদের তত্ত্বের কচকচানি আর নয়। এবার চাই প্রয়োগ। এ ব্যাপারে প্রথমেই বলে নেয়া দরকার যে, ভিনদেশি তত্ত্বের নির্বিচার প্রয়োগে সমাজ বদলের চিন্তা হলো ইউটোপিয়া বা সুখ-কল্পনা। প্রসঙ্গত বলা যায়, পশ্চিম ইউরোপের শিল্পোন্নত দেশগুলোর বাস্তবতা বিবেচনায় মহামতি মার্কস যে তত্ত্ব দিয়েছিলেন রাশিয়াতে লেনিন তার একটি পরিমার্জিত রূপকে প্রয়োগ করেছিলেন। ঠিক তেমনি চীনে মাও জে দুং সমাজতন্ত্র কায়েম করেছেন বটে, তবে সেটা ছিল একেবারেই চৈনিক। মার্কসের অনুসারী ছিলেন তারা; কিন্তু তার তত্ত্বের শাসন মানেননি।
আর তত্ত্ব না হয় আমদানি করা গেল। সমাজদেহে এসব তত্ত্বের প্রয়োগ কে করবে? তত্ত্ব প্রয়োগের এ কাজ সংগঠনের। রাজনৈতিক সংগঠনের। সুশীল সমাজ বা সিভিল সোসাইটির নয়, আমলাতন্ত্র বা সেনাবাহিনীর নয়। এই বিষয়টা জনগণ যৌক্তিকভাবে বুঝতে পারুক বা না পারুক, আড়েঠাড়ে বা ইনটুইটিভলি ঠিকই বুঝতে পারে। সে কারণে রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকে অন্য সকল প্রতিষ্ঠানের চাইতে তারা সবচাইতে বেশি আশা করেন। তাই নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস বা স্যার উপাধিপ্রাপ্ত ফজলে হাসান আবেদের কাছ থেকে জনগণের প্রত্যাশা যতটুকু, তার চাইতে সহস্রগুণ বেশি প্রত্যাশা রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকে। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে রাজনৈতিক দলই প্রত্যাশা অনুযায়ী কাজ দেখাতে পারেনি। ফলে সমাজ বদলের অনুকারক হিসেবে এগুলো যে নতুন কিছু করে দেখাতে পারবে সেটার সম্ভাবনা খুবই কম।
তাহলে নতুন বছর কি সাধারণ মানুষের জন্য নতুন কিছু নিয়ে আসবে না? উত্তর নেতিবাচক। কারণ সমাজে গুণগত পরিবর্তন আনার জন্য যে অনুঘটকগুলো দরকার সেগুলোর কোনটাকে এ মুহূর্তে ক্রিয়াশীল দেখা যাচ্ছে না। ফলে ২০১৩ সালেও খবরের কাগজগুলো জুড়ে থাকবে হত্যা-গুম-ধর্ষণ-নির্যাতন-শোষণ আর দুর্নীতির কাহিনী দিয়ে। হত্যাগুলোর রকমও অপরিবর্তিত থাকবে: নৌ ও সড়ক দুর্ঘটনায় হত্যা, গার্মেন্টস কারখানায় পুড়িয়ে হত্যা, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় হত্যা ইত্যাদি। ধর্মের নামে ব্যবসা ও রাজনীতিও চাঙ্গা থাকবে; ধনীরা আরো ধনবান হবে। দেশ এগিয়ে যাবে। ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টে যেতে থাকবে। আর আমরা ভাবতে থাকবো এমনটা সব সময়েই ছিল।
লেখক :শিক্ষক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
