নরসিংদী কি আতঙ্কের জনপদ হইয়াই থাকিবে

আপডেট : ০৫ জানুয়ারি ২০১৩, ২০:৫২
নরসিংদীতে গত ১৪ মাসে ১১২টি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হইয়াছে। জেলা পুলিশের প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, এই হত্যাকাণ্ডসমূহ সংঘটিত হইয়াছে ২০১১ সালের ১ নভেম্বর হইতে এই বত্সরের ২ জানুয়ারি পর্যন্ত সময়কালে। তন্মধ্যে শুধু ২০১২ সালেই সংঘটিত হইয়াছে ৯৫টি হত্যাকাণ্ড। তবে পূর্ববর্তী ২০১১ সালের চিত্রটি আরও ভয়াবহ। এই বত্সর খুন হইয়াছে ১১৫ জন। আর শুধু গত নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসেই খুন হইয়াছে ২৬ জন। সর্বশেষ হত্যাকাণ্ডটি সংঘটিত হইয়াছে ২০১৩ সালের প্রথম দিনেই। এইদিন সন্ত্রাসীরা ঘোড়াশাল পৌর বিএনপির কার্যালয়ে ঢুকিয়া জেলা বিএনপির সদস্য ও উপজেলা যুবদলের সাবেক সভাপতি পতিক উল্যাহকে নৃৃশংসভাবে কোপাইয়া হত্যা করে। ইতঃপূর্বে অনুরূপ বর্বরতার শিকার হইয়াছেন বিরোধী দল বিএনপির আরও কমপক্ষে ২ জন নেতা। তাহারা হইলেন পাইকারচর ইউনিয়ন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক আবুল কাসেম এবং রায়পুরার উত্তর বাখরনগর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি মোহাম্মদ হানিফ। কথায় আছে—‘নগর পুড়িলে দেবালয় কি এড়ায়’ অর্থাত্ নগর পুড়িলে দেবালয়ও রক্ষা পায় না। একইভাবে রক্ষা পান নাই ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দও। এই সময়ে দলটির কমপক্ষে ৫ জন নেতা খুন হইয়াছেন নির্মমভাবে। তন্মধ্যে নরসিংদী পৌরসভার মেয়র ও শহর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক লোকমান হোসেনের হত্যাকাণ্ড সারাদেশে আলোড়ন সৃষ্টি করিয়াছিল। ইহাছাড়াও নিহতদের তালিকায় আছেন স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধি, কলেজ ছাত্র সংসদের জিএস, ব্যবসায়ী, ব্যাংকার, সাংবাদিক ও স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রীসহ আরও অনেকে। রাজধানীর পার্শ্ববর্তী জেলা নরসিংদীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কতোটা ভয়াবহ হইয়া উঠিয়াছে তাহা অনুধাবন করিবার জন্য উল্লিখিত তথ্যই যথেষ্ট বলিয়া বিবেচিত হইতে পারে। সব মিলাইয়া এক আতঙ্কের জনপদে পরিণত হইয়াছে নরসিংদী। একের পর এক হত্যাকাণ্ডে জনমনে উত্কণ্ঠা চরম আকার ধারণ করিয়াছে। কিন্তু প্রতিকার মিলিতেছে না। বিশেষ করিয়া মেয়র লোকমান হোসেনের নৃশংস হত্যাকাণ্ড পরিস্থিতিকে আরও অস্থিতিশীল করিয়া তুলিয়াছে বলিয়া সংশ্লিষ্ট অনেকে মনে করেন। নরসিংদীর পরিস্থিতিকে ‘ভয়াবহ’ অভিহিত করিয়া জাতীয়ভিত্তিক একটি নাগরিক সংগঠনের জেলা প্রতিনিধি হলধর দাস বলিয়াছেন যে, এই পরিস্থিতি হইতে উত্তরণের জন্য প্রশাসনের কার্যকর কোনো উদ্যোগ অদ্যাবধি তাহার চোখে পড়ে নাই। প্রায় অভিন্ন অভিমত ব্যক্ত করিয়াছেন নরসিংদী পৌরসভার বর্তমান মেয়র কামরুজ্জামান। তাঁহার মতে, উপর্যুপরি হত্যাকাণ্ডের কারণে নরসিংদী বসবাসের অনুপযোগী হইয়া পড়িয়াছে। হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু ও দ্রুত বিচার না হওয়ায় অপরাধীরা উত্সাহ পাইতেছে বলিয়া তিনি মনে করেন। তবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখিয়া জনগণের জানমালের নিরাপত্তা বিধান করা যাহাদের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট সেই পুলিশ কর্তৃপক্ষ আত্মপক্ষ সমর্থনে কিছু অজুহাত দেখাইয়াছেন। যেমন— নরসিংদী আগে হইতেই একটি অপরাধপ্রবণ এলাকা। ইহারই ধারাবাহিকতায় নাকি এইসব হত্যাকাণ্ড ঘটিতেছে! দ্বিতীয় অজুহাতটি আরও চমকপ্রদ। তাহাদের মতে, যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো হওয়াও হত্যাকাণ্ডের আরেকটি কারণ। ফলে বাহিরের পেশাদার খুনিরা এইখানে হত্যাকাণ্ড ঘটাইয়া সহজেই পালাইয়া যাইতে পারে। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, ভুক্তভোগী জনগণ কোনো অজুহাত শুনিতে চায় না। তাহারা নিরাপত্তা চায় এবং অপরাধী যেই হউক তাহাকে বিচারের কাঠগড়ায় দেখিতে চায়। আর ইহা নিশ্চিত করাই হইল পুলিশ ও প্রশাসনের অবশ্যপালনীয় কর্তব্য। কিন্তু সেই দায়িত্ব যে যথাযথভাবে পালিত হইতেছে না তাহার উদাহরণ ভূরি ভূরি। শেষপর্যন্ত ইহার সমুদয় দায়দায়িত্ব যে দেশ যাহারা চালান সেই নীতিনির্ধারকদের ঘাড়েই বর্তাইবে— তাহাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নাই। কিন্তু তাহারা এই ব্যাপারে যথেষ্ট সচেতন বলিয়া তো মনে হইতেছে না। যদি সচেতন হইতেন— তাহা হইলে পরিস্থিতির এতোটা অবনতি হইতে পারিত না। কারণ তাহারা ভালো করিয়াই জানেন যে, বেশিরভাগ রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের মূলে একদিকে যেমন রহিয়াছে অসহিষ্ণুতা, বাড়াবাড়ি ও ক্ষমতার দাপট, অন্যদিকে তেমনি ক্ষমতাবানদের অনভিপ্রেত হস্তক্ষেপ ও আশ্রয়-প্রশ্রয়ের কারণে প্রকৃত অপরাধীরা প্রায়শ ধরাছোঁয়ার বাহিরেই থাকিয়া যায়। অতএব, সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারক মহল এই ব্যাপারে আন্তরিক ও কঠোর না হইলে শুধু স্থানীয় প্রশাসন কিংবা পুলিশের পক্ষে এই ধরনের পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কখনই সম্ভবপর নহে।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন