জীবনের মূল্যে লাভজনক ট্যানারি ব্যবসা

আপডেট : ০৫ জানুয়ারি ২০১৩, ২০:৫২
যুক্তরাজ্য ভিত্তিক দ্য গার্ডিয়ান বাংলাদেশের ট্যানারি শিল্পে শ্রমিকদের স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়া গত বৃহস্পতিবার একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করিয়াছে। ‘বাংলাদেশ’স টক্সিক ট্যানারিস টার্নিং এ প্রফিট এট এন ইনট্ররেবল হিউম্যান প্রহিস’ শীর্ষক এই প্রতিবেদনে নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও ট্যানারি কারখানাগুলিতে অনেক শিশু শ্রমিক ব্যবহূত হইতেছে বলিয়া উল্লেখ করিয়াছে। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে কারখানার শ্রমিকেরা অতি কম মজুরিতে কাজ করিতেছে বলিয়া উল্লেখ করিয়াছে এই প্রতিবেদন। এই প্রতিবেদনে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার বরাত দিয়া যে ভয়ংকর সংবাদটা দেওয়া হয়, তাহা হইলো হাজারীবাগের ট্যানারি কারখানার ৯০ ভাগ শ্রমিক ৫০ বত্সর বয়সের আগে মারা যান। কারখানার অর্ধেক রোগীই শ্বাসকষ্ট জনিত রোগে ভোগেন। হাজারীবাগের কারখানার দূষিত বর্জ্য নদীর পানিকে চরম দূষিত করিতেছে। এই অভিযোগগুলির কোনটিই অস্বীকার করা যাইবে না। কারণ এইসবের প্রত্যেকটিই ঘটিয়াছে এই কারখানাগুলি হইতে। এই অভাগা কিংবা হতভাগা শ্রমিকদের জীবিকার জন্য অন্য কোন বিকল্প থাকিলে নিঃসন্দেহে এই কারখানায় তাহারা কাজ করিতেন না। বেকারত্ব আর ছদ্ম বেকারত্বের অভিশাপের কারণে তাহারা এইখানে কাজ করিতেছেন। তাহাদের জন্য কর্মসংস্থানের বিকল্প তৈয়ার না করিয়া সরকারের পক্ষেও তাত্ক্ষণিকভাবে কোন ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব নয়। তবে এই ট্যানারি শিল্পের দীর্ঘমেয়াদী সমস্যার কথা মাথায় নিয়া আমাদের নীতি নির্ধারণ করিতে হইবে। এই ট্যানারি শিল্প শ্রমিকদের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে কাজ করিয়া যে স্বাস্থ্যহীনতার দিকে ঠেলিয়া দিতেছে তাহার চাইতেও ভয়াবহ হইল এই ট্যানারির বর্জ্য আশপাশের নদীগুলিকে যেভাবে দূষিত করিতেছে তাহার বিশালতা। ঢাকার আশপাশের নদীগুলির পানি এখন আর ব্যবহারের উপযুক্ত নয়। সম্প্রতি ওয়াসা তার ভূগর্ভস্থ স্তরের পানির উপর নির্ভরতা কমাইয়া ভূ-উপরিভাগের পানির উপর নির্ভরতা বাড়াইতে চাহিতেছে। বর্তমানে ওয়াসা ঢাকা শহরের প্রয়োজনীয় মোট পানির ৮৭ শতাংশ ভূগর্ভস্থ উত্স হইতে উত্তোলন করে। ফলে ভূগর্ভে শূন্যতা তৈরি হওয়া এবং ভবিষ্যতে ভূমিকম্পে ঢাকা শহর দাবিয়া যাওয়ার আশংকায় ভূগর্ভ হইতে পানি উত্তোলন কমাইতে চাহিতেছে। তবে আশেপাশের নদীগুলি দূষিত হওয়ার ফলে ঢাকা হইতে প্রায় পঞ্চাশ-ষাট কিলোমিটার দূরবর্তী স্থান হইতে বিশুদ্ধ পানি আনিতে হইবে। যাহার খরচ বহন করা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। সরকার ২ বিলিয়ন ডলার খরচ করিয়া কয়েকটি পানি বিশুদ্ধকরণ প্লান্ট স্থাপনের পরিকল্পনা হাতে নিয়াছে। কিন্তু প্রশ্ন হইলো এই যে অতিরিক্ত খরচ পানি বিশুদ্ধকরণের কিংবা অনেক দূর হইতে ঢাকায় বিশুদ্ধ পানির সরবরাহের তাহা বহন করিবে সরকার অর্থাত্ জনগণ। কিন্তু যাহারা বর্জ্য ফেলিয়া পানি দূষণ করিতেছে অর্থাত্ ট্যানারির মালিকরা তাহারা তো এই ক্ষতির সৃষ্টিকারী। তাহারাতো সাভারে স্থানান্তরের খরচও চাহিতেছে সরকারের কাছে। সত্যিকার অর্থে দেশের স্বার্থ বিবেচনায় আনিলে এবং দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাবের কথা চিন্তা করিলে এই ধরনের শিল্প বিকশিত হইতে দেওয়া উচিত নয়। শিল্পোন্নত দেশগুলি এই নোংরা শিল্পগুলো অনুন্নত দেশে স্থাপন করার প্রণোদনা দেয় এবং ইহার উত্পাদিত পণ্য কিনে নিজেরা ধন্য হয়। তবে মাঝেমধ্যে এই শিল্পগুলোর পরিবেশ নিয়া কথা বলিয়া তাহারা যে অনেক মানবিক তা বুঝাতে চায়। যেহেতু স্বল্পমেয়াদে এই শিল্প বন্ধ করা সম্ভব নয়, শ্রমিকদের স্বার্থে তাই সরকারের এই বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন