পৃথিবীর প্রায় সর্বত্র কাজের ঝুঁকির সহিত মজুরির একটা ইতিবাচক সম্পর্ক রহিয়াছে। ঝুঁকিপূর্ণ কাজের মজুরি বেশি। অথচ কাজের ঝুঁকির সহিত মজুরির সম্পর্ক উল্টো বাংলাদেশে। বাংলাদেশের পোশাক কারখানায় কাজ করিলে আগুন লাগিয়া বা অন্য কোন কারণে মৃত্যুর একটা বড় আশঙ্কা আছে। ফলে এইখানে কাজের মজুরি তুলনামূলকভাবে বেশি হওয়া উচিত। অথচ এইখানে মজুরি কম। কারণ তাহাদের অন্য কোন ভালো বিকল্প নাই। বিকল্পের অভাবে কম মজুরিতেই তাহারা করিতেছেন এই ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। বিকল্প কর্মসংস্থান থাকিলে হয়তো অনেক বেশি মজুরি না দিলে তাহারা এইখানে কাজ করিতে আসিতেন না। একই কারণে তাহাদের জীবনের দামও কম এইখানে। সেজন্যে কর্মপরিবেশও খারাপ । ফলে বেকারত্বের ফাঁদে পড়িয়া কিংবা ভালো বিকল্পের অভাবে যাহারা এইখানে আসিতেছেন তাহাদের কর্মপরিবেশ নিশ্চিত হইবে না বাজার ব্যবস্থার অন্তর্নিহিত সূত্রে। বিকল্পের অভাব থাকিলে প্রতিযোগিতার পরিবেশ থাকে না। পোশাক শ্রমিকদের ক্ষেত্রে আসলে তাই ঘটিয়াছে। তাহা না হইলে শ্রমিকেরা কাজ করিতেছে যে মালিকের জন্যে সেই মালিককে চাপ দিতে হয় বিদেশি ক্রেতার দ্বারা। সেই মালিকের উপর চাপ দিতে হয় মিডিয়া আর সুশীল সমাজের দ্বারা।
বিদেশি ক্রেতারা এই দেশ হইতে পোশাক কিনিতেছে কারণ এইখানে দাম কম। দাম কম কারণ উত্পাদন খরচ কম। খরচ কম কারণ শ্রম সস্তা। তাহার মানে এইখানে মজুরি কম। ফলে বিদেশি ক্রেতারা এইখানে আসিতেছে শ্রমিকের কম মজুরির সুবিধা নিতেই। যে দেশে শ্রমিকের মজুরি এত কম সেইখানে শ্রমিকের কাজের পরিবেশ কেমন হইবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিক্রয় প্রতিষ্ঠান ওয়ালমার্ট কি জানে না কিংবা অনুমান করিতে পারে না? অবশ্যই পারে। পারিলেও তাহারা সেই ব্যাপারে ব্যবস্থা নিবে না। মার্কিন মিডিয়ার খবর হইতে জানা গিয়াছে যে, বত্সর দেড়েক আগে ওয়ালমার্ট বাংলাদেশের পোশাক কারখানার কর্মপরিবেশ- এর জন্যে প্রয়োজনীয় খরচ বহন করিতে আপত্তি জানায়। ওয়ালমার্ট তো সেইদেশের নিম্ন- মধ্যবিত্তের কেনার জায়গা। সেই নিম্নমধ্যবিত্তের জন্যে কম দামে কিনিতে হয় বলিয়া তাহারা বাংলাদেশে আসিয়াছে। আরও কমে কোথাও পাইলে সেইখানে চলিয়া যাইবে। এখন কর্মপরিবেশের কথা বলিতেছে তাহার ব্র্যান্ডের ইমেজ রক্ষা করিতে। এই কথা সত্য সকল বিদেশি ক্রেতার জন্যেই। বাস্তবতা হইলো কোন ক্রেতাই প্রকৃত অর্থে কর্মপরিবেশের জন্যে খরচ করিবে না। করিলেও পোশাকের দাম হইতে তাহা কোন না কোন উপায়ে কাটিয়া রাখিবে। বাংলাদেশের পোশাক শিল্প মালিকরা সবচাইতে কম দামে দিতে পারিতেছে হয়তোবা এখানকার কর্মপরিবেশ খারাপ বলিয়াই। কর্মপরিবেশ ভাল রাখিবার তো খরচ আছে। যদি কর্মপরিবেশ ভালো করিতে গেলে আমরা আমাদের প্রতিযোগীদের মতো ব্যয়বহুল হইয়া যাই তাহা হইলে আমাদের শিল্প টিকিবে না। বরং কর্মপরিবেশ ভালো করিয়া টিকিয়া থাকিতে পারিলেই তবে আমাদের পোশাক শিল্প যুগ যুগ টিকিয়া থাকিবে। বেহাল কর্মপরিবেশ নিয়া চলিতে থাকিলে একদিন শ্রমিকরাই এই শিল্প ত্যাগ করিবে। শুধু বিকল্পের অপেক্ষায় থাকিবে ততদিন। তবে পরিবর্তনশীল বিশ্বে বিকল্প তৈরি হওয়া সময়ের ব্যাপার। আমাদের দক্ষ-অদক্ষ শ্রমিকদের চাহিদা কিন্তু বাড়িতেছে বহির্বিশ্বে। চীন আর ভারতের সস্তা শ্রম ফুরাইয়া যাইতেছে দিনকে দিন। ফলে বিকল্প কিন্তু হাতছানি দিয়া ডাকিতেছে।
