আজকের বিশ্বে সার্বিক পর্যটন উন্নয়নে সাংস্কৃতিক পর্যটন একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। পর্যটকদেরও একটি বড় অংশের ভ্রমণ প্যাকেজে সাংস্কৃতিক উপাদানসমূহ অন্তর্ভুক্ত থাকে। মানুষ আজ মানুষকে দেখতে চায়, মানুষের কার্যক্রম সম্পর্কে অবগত হতে চায় এবং মানুষের আচরণ ও জীবন পদ্ধতি সম্পর্কে অভিজ্ঞতা অর্জন করতে চায়। এ অবস্থায় সংস্কৃতি ও পর্যটন আজ পরস্পরের পরিপূরক হিসেবে গণ্য হচ্ছে। যদিও বাংলাদেশ একটি নতুন রাষ্ট্র, কিন্তু সভ্যতার দিক থেকে দেশটি প্রাচীন সভ্যতার আবাসস্থল। দেশটির ভৌগোলিক অবস্থা এবং ইতিহাস এটিকে একটি আলাদা পর্যটন গন্তব্যে এবং এর বাংলাভাষী মানুষকে আলাদা জাতি হিসেবে বিশ্ববাসীর কাছে পরিচিত করেছে। বাংলাদেশ প্রকৃতপক্ষেই সমৃদ্ধ ও রোমাঞ্চকর সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যসমৃদ্ধ দেশ। যেহেতু বাংলাদেশ ২০১৪ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে দশ লাখ বৈদেশিক পর্যটক আকৃষ্ট করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে, সেজন্য অন্যান্য পর্যটন উপাদানের সাথে ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক উপাদানসমূহকেও বিভিন্ন মাধ্যমে বিশ্ববাসীর কাছে উপস্থাপন করতে হবে। এরফলে একদিকে যেমন বিদ্যমান পর্যটন-আকর্ষণসমূহের সাথে নতুন মাত্রা যোগ হবে, অন্যদিকে অধিক সংখ্যক পর্যটকও আকৃষ্ট হবে। পাশাপাশি বিশ্ব পর্যটন বাজারে বাংলাদেশ পর্যটন শিল্পের তথা সার্বিকভাবে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিও বৃদ্ধি পাবে।
পর্যটন শিল্প আজ বিশ্বের বৃহত্তম শিল্প। ফলস্বরূপ পৃথিবীর বহু পর্যটন গন্তব্যের অর্থনৈতিক ও ব্যবসায়িক কার্যক্রমের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে এ শিল্প চিহ্নিত হয়েছে। ২০১০ সালের হিসাব অনুযায়ী পর্যটন শিল্প বিশ্বব্যাপী ৬ ট্রিলিয়ন ডলার আয় সৃষ্টি এবং ২২১ মিলিয়ন মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেছে। সংস্কৃতি হতে পারে একমাত্র উপাদান যা একটি পর্যটন এলাকার সার্বিক আকর্ষণীয়তা (attractiveness) সৃষ্টি করতে পারে। আমেরিকার Travel Industry Association (TIA) উল্লেখ করেছে যে, তাদের দেশের কম-বেশি ২০০ মিলিয়ন পর্যটকদের মধ্যে প্রায় ৪৬% ভাগ অন্তত একটি সাংস্কৃতিক উপাদান (কলা, ঐতিহ্য বা ইতিহাস) অন্তর্ভুক্ত করে থাকে। TIA এবং Smithsonian Magazine- এর অন্য একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, পর্যটকদের ভ্রমণ পরিকল্পনায় ইতিহাস, ঐতিহ্য, কলা এবং সাংস্কৃতিক উপাদান অন্তর্ভুক্ত করার আগ্রহ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ প্রবণতাই প্রমাণ করে যে, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড এবং উপাদানসমূহ পর্যটকদের মধ্যে অনেকটা আবেদন সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছে। তাছাড়া অন্যান্য গবেষণার ফলাফলেও দেখা গেছে যে, সাংস্কৃতিক পর্যটকরা অন্য পর্যটকদের তুলনায় পর্যটন গন্তব্যে এসে তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি অর্থ ব্যয় করেন। ফলস্বরূপ, সাংস্কৃতিক ভ্রমণকারীরা পর্যটন গন্তব্যসমূহের জন্য একটি আকর্ষণীয় বাজার খণ্ডে পরিণত হয়েছে। সাংস্কৃতিক পর্যটন উন্নয়নের ফলে পর্যটক এবং গন্তব্যে বসবাসকারী সমপ্রদায়—উভয়ের মূল্যবোধ, ব্যক্তিগত আচরণ, পারিবারিক সম্পর্ক, সমষ্টিগত জীবনপদ্ধতি এবং অন্যান্য সামাজিক রীতি-নীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসে। যেহেতু পর্যটক ও গন্তব্যে বসবাসকারী সমপ্রদায়ের মধ্যে নানারকম প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ওঠা-বসা ও ভাবের আদান-প্রদান হয়, সে কারণে এ ধরনের ওঠা-বসা ও ভাব বিনিময়ের ফলে পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ, সহিষ্ণুতা এবং পারস্পরিক বোঝা-পড়া সৃষ্টি হয়। ফলে ধীরে ধীরে বিশ্বব্যাপী শান্তি, সৌহার্দ্য এবং ভ্রাতৃত্ববোধ সৃষ্টি হয়। তাছাড়া একটি দেশ যখন সাংস্কৃতিক পর্যটনের উন্নয়ন ঘটায় তখন সে দেশটি তার ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং অন্যান্য সাংস্কৃতিক উপাদানসমূহের সংরক্ষণ ও উন্নয়নে অধিক মনোনিবেশ করে। বিশেষ করে জাদুঘর, ঐতিহাসিক নিদর্শন ও স্থান, স্মৃতিস্তম্ভ, দৃষ্টিনন্দন প্রাচীন ভবন ইত্যাদির উন্নয়ন ও সংরক্ষণে দেশটি তত্পর হয়। ফলে দেশটির অতীত ইতিহাস ও বর্তমান জীবনধারার সাথে সেতুবন্ধন সৃষ্টি হয়।
বাংলাদেশে পর্যটন শিল্প বিশেষ করে সংস্কৃতিভিত্তিক পর্যটন শিল্প উন্নয়নের সম্ভাবনা ব্যাপক। এজন্য প্রয়োজন কাঙ্ক্ষিত সংস্কার ও সৌন্দর্য বৃদ্ধিকরণ এবং প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা সরবরাহ সম্পর্কিত পরিকল্পনা প্রণয়ন ও সেগুলোর বাস্তবায়ন। আশার ব্যাপার হলো যে, বাংলাদেশ সরকারও এ ব্যাপারে মোটামুটি তত্পর হয়ে উঠেছে। ইতোমধ্যে ১৯৯২ সালে প্রণীত পর্যটন নীতিমালার সংস্কার করে বাংলাদেশ পর্যটন নীতিমালা-২০১০ প্রণয়ন করেছে, বাংলাদেশ পর্যটন বোর্ড গঠন করেছে এবং পর্যটন সম্পর্কিত বেশ কিছু আইনও প্রণয়ন করেছে। ধীরে ধীরে ওই পর্যটন নীতিমালার বাস্তবায়নও শুরু হয়েছে। প্রয়োজনীয় ভৌত অবকাঠামোর উন্নয়ন, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং সুবিধাদি নিশ্চিত করার পাশাপাশি পর্যটন গন্তব্যসমূহে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড সংযোজন ও প্রচলন করা সম্ভব হলে বাংলাদেশ অদূর ভবিষ্যতে পর্যাপ্ত সংখ্যক সাংস্কৃতিক পর্যটক আকৃষ্ট করতে সক্ষম হবে। যত দ্রুত উল্লিখিত আয়োজনসমূহ করা সম্ভব হবে তত দ্রুতই বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পর্যটন তথা সার্বিক পর্যটন শিল্পের উন্নয়ন ও প্রসার ঘটবে।
লেখক :অধ্যাপক, ট্যুরিজম এন্ড হসিপটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

