পাস করাইয়া দেওয়ার দাবিতে তাণ্ডব

আপডেট : ০৭ জানুয়ারি ২০১৩, ২১:১৫
ছাত্রলীগ নিয়মিতভাবে সংবাদের, বলিতে গেলে মন্দ সংবাদের জন্ম দিয়া চলিতেছে। তাহাদের সৃষ্ট মন্দ সংবাদসমূহের কতকগুলি ধারা এইরকম যে, তাহারা আধিপত্য কায়েমের সূত্র হিসাবে নিজেরা নিজেরা গণ্ডগোল করে, বিরোধী সংগঠন বিশেষত সাধারণ শিক্ষার্থীদের নানান ইস্যু লইয়া আন্দোলনরত বাম সংগঠনগুলির কর্মীদের প্রহার করে এবং ক্ষমতার দম্ভে সাধারণ শিক্ষার্থীদের যখন-তখন চড়-চাপড় দিয়া বসে। পুলিশের সহায়তায় তাহারা বেশিরভাগ ক্যাম্পাস হইতে বিরোধী ছাত্র সংগঠনকে বিতাড়িত করিয়াছে। যাহারা বা আছে তাহাদের আন্দোলন করিবার গণতান্ত্রিক অধিকারটুকুও দিতে রাজি নয় ছাত্রলীগ। ছাত্রলীগ একের পর সহিংস ঘটনা ঘটাইয়া চলিতেছে, তাহাদের কীর্তির সামপ্রতিক বৃত্তান্ত এইরূপ: গত বত্সরের ৮ জুলাই সিলেটের এমসি কলেজের ছাত্রাবাসে তাহারা ৪২টি কক্ষ পোড়াইয়া দিয়াছিল। ২ সেপ্টেম্বর শাহবাগ মোড়ে সাধারণ শিক্ষার্থীরা ফুটওভার ব্রিজ তৈরি করিবার দাবিতে কর্মসূচি পালন করিতে গেলে ছাত্রলীগ তাহাদের উপর হামলা করে। বুয়েটে আন্দোলনকারী সাধারণ শিক্ষার্থীদের উপরও ছাত্রলীগ হামলা চালাইয়াছিল। এইদিকে কুষ্টিয়ার ইসলামিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ৯২ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ লইয়া আর্থিক লেনদেনে ছাত্রলীগের দুইটি অংশ জড়াইয়া পড়িয়াছিল বলিয়া অভিযোগ উঠিয়াছে। গত রবিবারের হরতালের দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় কর্তব্যরত কয়েকজন আলোকচিত্রীকে পিটাইয়া আহত করে তাহারা। এইবারের ঘটনাটি ঘটিয়াছে তাহাদের অদ্ভূত এক আব্দার পূরণ না হইবার কারণে। তাহারা বা তাহাদের লোকজন পরীক্ষায় ফেল করিয়াছে, পাস করাইয়া দিতে হইবে। তেজগাঁও পলিটেকনিক ইন্সটিটিউটের শিক্ষকেরা তাহাদের এই অন্যায় আব্দার পূরণ করেন নাই। অতএব সোমবার তাহারা ইন্সটিটিউটে তাণ্ডব সৃষ্টি করিয়াছে। কেবল ব্যাপক ভাংচুরই তাহারা করে নাই, আহত করিয়াছে তিন শিক্ষক ও সাধারণ কর্মচারীসহ ১০ জনকে। বাধ্য হইয়া ইন্সটিটিউট প্রশাসন অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করিয়াছে। ৪ জানুয়ারির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতারা ছাত্রলীগকে সুপথে চলিবার যে উপদেশ দিয়াছিলেন, তাহাদের কর্ণকুহরে তাহা প্রবেশমাত্র যে করে নাই তাহার প্রমাণ, পরদিনই তাহারা সাংবাদিক পিটাইয়াছে এবং পরপরই পলিটেকনিক ইন্সটিটিউটে বন্ধ করিয়া দেওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি করিয়াছে। আমরা জানি, বরাবরের মতোই ছাত্রলীগ পলিটেকনিক ইন্সটিটিউটের ঘটনার দায় অস্বীকার করিবে অথবা বলিবে জড়িতরা ছাত্রলীগের সদস্য নহে। স্থানীয় এমপি বলিয়াছেন জড়িতদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা লওয়া হইবে। কিন্তু আমরা এও জানি যে আদৌ কোনো ব্যবস্থা লওয়া হইবে না, অথবা এত সামান্য ব্যবস্থা লওয়া হইবে যে, তাহার প্রভাবও পড়িবে সামান্যই এবং ছাত্রলীগ অন্য কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরবর্তী কোনো অপকর্ম করিতে সামান্যই সময় লইবে। সব সরকারের সময়েই ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনের সোনার ছেলেদের অপকর্ম দেখিয়া আমরা বিরক্ত-বীতশ্রদ্ধ হইয়াছি, অনেকক্ষেত্রে এইসব আমাদের কাছে গা-সওয়া হইয়া গিয়াছে। ছাত্র হইয়া শিক্ষককে প্রহার করিলে আমরা নড়িয়া চড়িয়া বসি। কিন্তু আজ একি আব্দারের কথা শুনিতে হইলো আমাদের? ফেল করিয়াছি, পাস করাইয়া দাও — এই অন্যায় আব্দার মানিতে গেলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অস্তিত্বই থাকে না, শিক্ষার অবশিষ্ট মান ও মহত্ত্বটুকুও আর থাকে না! অন্যায় করিতে করিতে কোথায় থামিতে হইবে, এই ন্যূনতম জ্ঞানটুকুও লোপ পাইয়াছে ছাত্র নামধারী এই বিশৃঙ্খলাকারীদের। তাহাদের ভাংচুরের তাণ্ডবে বাধা দিলে তাহারা আক্রমণ করে শিক্ষক ও কর্মচারীদেরও। এই ঘটনায় জড়িতদের সমুচিত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না দিলে শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষার পরিবেশ আর কিছুই অবশিষ্ট থাকিবে না।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন