আলোকপাত

মানবতা, রাজনীতি ও গণমাধ্যম

আপডেট : ০৭ জানুয়ারি ২০১৩, ২১:১৬
২৪ বছরের তরুণ বিশ্বজিত্ দাস নামের এক দর্জি দোকানের শ্রমজীবী যুবক হরতালের দিনে হরতাল প্রতিহত করার দায়িত্বপ্রাপ্ত ছাত্রলীগ নামধারী কতিপয় সন্ত্রাসীদ্বারা নিহত হলো। হত্যা করার কায়দা যে কোন বিবেকবান মানুষকে কাঁদাবে। হঠাত্ আবির্ভূত কোন বন্য পশুকে গ্রামবাসী লাঠি-সোঁটা, ছুরি, রামদা দিয়ে যেমন করে ধরাশায়ী করে মৃত্যু নিশ্চিত করে তেমনিভাবে ছাত্রলীগ নামধারী সন্ত্রাসীরা বিশ্বজিেক রড চাপাতি ও ছুরি দিয়ে উপর্যুপরি আঘাত করে তার মৃত্যু নিশ্চিত করেছে। যে নৃশংস কায়দায় ঘাতকরা বিশ্বজিেক নিহত করেছে গণমাধ্যমের বদৌলতে ভিডিও ফুটেজ দেখে মনে হয় এটা ওদের পরিকল্পিত মিশন ছিল। সে মিশন নিজেদেরকে পুরষ্কৃত করার উদ্দেশ্যই হোক অথবা কোন গডফাদারের আদেশেই হোক সফল করার জন্যই ওরা মরিয়া হয়ে উঠেছিল। অবশেষে লাশ নিয়ে টানাটানি এবং বিপরীত দিক দিয়ে ঘাতকদের বাঁচানোর প্রচেষ্টা চলতে লাগলো। মৃত বিশ্বজিতের পরিচয় নিয়ে সরকার ও বিরোধী দল বাদানুবাদে লিপ্ত হলো। বিএনপি বললো বিশ্বজিত্ তাদের কর্মী, আওয়ামী লীগ বললো বিশ্বজিত্ এককালে ছাত্রলীগ করতো। সব পরিচয় মিথ্যা প্রমাণ করে বিশ্বজিত্ লাশ হলো। এখন ঘাতকদের পরিচয় নিয়ে আবার বিতণ্ডা, সাফাই চললো। মিডিয়ার রিপোর্ট ও ভিডিও ফুটেজ থেকে জানা গেছে হরতালে অবরোধকারী ছাত্রলীগের মিছিল থেকেই তাকে ধাওয়া করে চাপাতি, রড ও ছুরি দিয়ে আঘাত করে মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়। কিন্তু ছাত্রলীগ দাবী করেছে তারা বহিষ্কৃত। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বললেন ছাত্রলীগের কোন কর্মী বিশ্বজিেক হত্যা করেনি। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সংবাদ সম্মেলনে ঘটা করে জানালেন বিশ্বজিত্ হত্যার দায়ে অভিযুক্তদের পরিবার বি এন পি ও জামাতে ইসলামীর রাজনীতি করে। পরিবার বিএনপি ও জামায়েতের রাজনীতি করে বলে কি বিশ্বজিেক মরতে হবে এবং মরার পরও ঘাতকরা ছাড়া পেয়ে যাবে। তাহলে বলা যায় যে রাজনীতি মানবতার শত্রু। রাজনীতি করলেই অপর পক্ষ হত্যা করতে পারবে। তারপর প্রশ্ন উঠে রাষ্ট্রের ভূমিকা কতো দুর্বল। সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্র প্রত্যেকটি নাগরিকের জান-মালের সুরক্ষা দেবে। কিন্তু বিশ্বজিতের বেলায় রাজনীতির পচা সংশ্লেষে হত্যাকাণ্ডে জড়িত ঘাতকদেরকে আড়াল করার চেষ্টা করা হয়েছে,বিএনপির মতো জজমিয়া কাহিনী বানানোর পাঁয়তারা করা হয়েছে। সাধুবাদ জানাই মিডিয়াকে, মিডিয়ার ত্যাগী বন্ধুদেরকে । গোলাগুলি, মারামারির মধ্যেও যারা জীবন বাজী রেখে ভিডিও ফুটেজ নিয়ে রাখে। এ ভিডিও ফুটেজ না থাকলে বিশ্বজিতের ঘাতকরা হয়তো অজ্ঞাত থেকে যেতো। তাহলে রাষ্ট্র ও রাজনীতি ছাত্র-ছাত্রীদেরকে শিক্ষা দিচ্ছে যে দলীয় পরিচয়ে কাঙ্ক্ষিত হত্যা করলে ঘাতকদের দুশ্চিন্তার কারণ নেই। ছাত্রদল, ছাত্রলীগ উভয়েই দলীয় রাজনীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। হরতাল, অবরোধ প্রতিহত করার জন্য আওয়ামী লীগ সরকার ছাত্রলীগকে রাস্তায় নামায়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজেই ছাত্রলীগকে রাস্তায় নামার আদেশ দেন। অন্যদিকে বিএনপি নেতা-নেত্রীরাও অনেক সময় বলে থাকেন যে আন্দোলন দমানোর জন্য ছাত্রদলই যথেষ্ট। ছাত্রদের ব্রত হলো লেখাপড়া করে নিজেকে শিক্ষিত করে ভবিষ্যতে দেশের সেবা করা। ছাত্রাবস্থায় যদি তাদেরকে রাজনীতির নোংরা খেলা শিখানো হয় তাহলে তারা যদি রাষ্ট্রনায়ক, মন্ত্রী বা সাংসদ হয় সততার সঙ্গে দেশ সেবার মানসিকতা তাদের জন্ম নিবে কিভাবে? সবশেষ সংবাদে জানা গেছে, বিশ্বজিত্ হত্যাকারী ছাত্র নামধারীরাই জ,বি ক্যাম্পাস দাবড়ে বেড়াতো, সংঘর্ষ চাঁদাবাজি, ছিনতাইয়ের ঘটনায় ওদেরকেই অগ্রভাগে দেখা যেতো। একজন নিরপরাধ নিরীহ ব্যক্তির হত্যাকে প্রাধান্য না দিয়ে ঘাতকদেরকে বাঁচানোর প্রয়াস নিকৃষ্ট নীতির প্রতীক । রাজনীতি, দলনীতি বা রাষ্ট্রনীতির কোন অধ্যায়েই এর স্থান হওয়া উচিত নয়। সাধারণ নাগরিক যদি জান-মালের জন্য রাষ্ট্রের নিরাপত্তা না পেয়ে উল্টো রাজনীতির শিকার হয় তার চেয়ে দুর্ভাগ্য কি হতে পারে। আজকের দুনিয়ার মিডিয়ার বদৌলতে ইন্টারনেটের সুবিধায় কোন তথ্য গোপন করা সম্ভব নয়, যারা করতে চায় তারা বোকার স্বর্গে বাস করে। মিডিয়ার টুঁটি চেপে ধরলেও ইন্টারনেট বন্ধ করা যাবে না । সত্য গোপনের অপচেষ্টা রাষ্ট্রকে ব্যর্থতায় পর্যবেশিত করতে পারে। এ দেশের মিডিয়া এখনও সত্যনিষ্ঠ । ওদের স্বাধীনতা যতদিন থাকবে আমরা সাধারণ জনগণ অন্তত একটি আশ্রয়ের নিশ্চিত আশ্বাস পাব। রাজনীতি, রাষ্ট্রনীতি, মানবতাকেও পদদ্বলিত করে কিন্তু মিডিয়া মানবতাকে শ্রদ্ধা করে, নিপীড়িত,নির্যাতিতকে জনসমক্ষে তুলে ধরে , নিরাশ্রয়কে ভরসা দেয়, চোর-চামার-সন্ত্রাসী-দুর্নীতিবাজকে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। তাই মিডিয়ার পক্ষে আছে জনশক্তি, কোন সরকার মিডয়ািকে হত্যা করতে পারবে না।  লেখক : এফ,সি,এ ও কথাসাহিত্যিক

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন