শীতে চুলা জ্বলছে না। গ্যাসের চাপ নেই, দরকারী তাপও নেই রান্নাঘরে। তাই গৃহিণীর রান্নায় ব্যাঘাত ঘটছে। অপেক্ষা শীত শেষের। সংকট কিছুটা কমবে, সেই আশায়। কিন্তু ব্যবসায়ীদের কি হবে?
ঋতু বৈচিত্র্যে এদেশে ব্যবসা-বাণিজ্যেরও পরিবর্তন হয়। বিশেষত মৌসুমী ব্যবসায়। কিন্তু শিল্পখাতের জন্য মৌসুম ঠিক সে রকম নয়। বছরের একটি নির্দিষ্ট সময় ভাল গেলেও শিল্প-কারখানার জন্য সারাবছর জুড়ে ‘কলের চাকা’ সচল রাখাই মুখ্য। প্রশ্ন হচ্ছে, সচল রাখা কি আদৌ সম্ভব হবে?
অর্থচিন্তা যাদের আছে, তারা নিশ্চয়ই ভুলবেন না ওয়ান ইলেভেনের পর যে শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি মোকাবেলা করেছিল স্বদেশ, বিনিয়োগমন্দায় তার রেশ এখনো আছে বেশ। উদ্যোক্তা হয়তো মুক্ত নিশ্বাস ফেলতে পারছেন। কিন্তু চলার গতি পাননি। যা বিনিয়োগ পরিস্থিতি পর্যালোচনা করলেই স্পষ্ট। তারচেয়েও বড় সত্য অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত নিজেই স্বীকার করেছেন বিনিয়োগ মন্দার কথা। ব্যবসায়ীদের পক্ষেও বলা হচ্ছে একই কথা। গবেষণা সংস্থাগুলোও বলছে বিনিয়োগ হচ্ছে না। কিন্তু কেন? এখন তো আর ‘জুজু’র ভয় নেই।
কথা সত্যি ভয় কেটে গেছে। হয়তো আশংকা আছে। কিন্তু যা নেই তা হচ্ছে গ্যাস-বিদ্যুতের চাহিদামাফিক সরবরাহ। বিশ্বমন্দা আর বাংলাদেশে বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলের বাণিজ্যিক ক্ষতি পুষিয়ে নিতে দারুণ সময় কেটে গেছে। অভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিকভাবেও পণ্যের চাহিদা বেড়েছে। কিন্তু সমস্যা ছিল চাহিদামত উত্পাদন করা যায়নি। কারণ, জ্বালানি সংকট। কেউ বলবেন, এ সংকট তো একদিনে হয়নি। অতীতের ধারাবাহিকতায় সংকট ক্রমে তীব্র হয়েছিল। এই সংকট কাটাতে কাটাতেই চলে গেছে অনেক সময়। এখনো পুরোপুরি সংকট কাটেনি। কিন্তু কোন সংকটই চান না শিল্পমালিকরা। তারা চান কারখানার চাকা ঘুরবে, ঘুরতেই থাকবে। তাতে তারা ক্রেতাদের সময়মত পণ্য পৌঁছে দিতে পারবেন। দেশে বৈদেশিক মুদ্রা আয় বাড়বে। নতুন করে বিনিয়োগ হবে। বিনিয়োগ হলে কর্মসংস্থান হবে। দারিদ্র্যের হার কমবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আতিউর রহমান কিংবা সরকারের অন্য নীতিনির্ধারকরা প্রায়ই বলে থাকেন, বাংলাদেশ শীঘ্রই মধ্য আয়ের দেশে পরিণত হবে। কিন্তু কর্মসংস্থান না হলে এটি স্বপ্নই থেকে যাবে। শুধু কর্মসংস্থানই নয়, মানবসম্পদ উন্নয়নসহ আরো বেশকিছু পদক্ষেপ বাস্তবায়নেরও দরকার আছে। সেসব তো পরে। আগে অগ্রাধিকার ঠিক করতে হবে। দরিদ্র মানুষের সংখ্যা যেখানে বেশি, মূল্যস্ফীতির যে ঊর্ধ্বগতি তাতে জনজীবন অসহনীয় হয়ে উঠবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ জোরদার করার কথা বলছে। এই ঋণ কারা নেবে। যারা বিদ্যমান কারখানা পূর্ণোদ্যমে চালাতে পারছে না, তারা নতুন করে কারখানা সম্প্রসারণ করবে? নতুন কারখানা করবে? শিল্প মালিকদের বলতে শুনেছি- ‘ভাই গ্যাস নাই, বিদ্যুত্ নাই। এভাবে আর কতদিন?’ যেখানে একজন বিনিয়োগকারী তার বর্তমান কারখানা চালাতে পারছেন না, তিনি কিভাবে নতুন খাতে বিনিয়োগে উত্সাহী হবেন? ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে তিনি কি ঋণের বোঝা বইবেন?
অর্থনীতির এই হাল হলে বছর শেষে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা কিভাবে পূরণ হবে? কৃষিই একমাত্র ভরসা। কৃষিতে কম বিনিয়োগে বেশি ফল পাওয়া যায়। জিডিপির হিসাব কষতেও সুবিধা হয়। ফলন ভাল হলে কৃষিপণ্যের দামও কম থাকে। বোধ করি এই কৌশলেই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মহোদয় কৃষিতে সর্বোচ্চ নজর দিয়েছেন। ব্যাংকগুলোতে নির্দেশ দিয়েছেন বেশি বেশি করে কৃষকদের ঋণ দিতে। কিন্তু সব ব্যাংকের শাখা তো গ্রামে নেই। এমনকি বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী শহরে চারটি শাখা খুললে গ্রামে একটি শাখা খুলতে হয়। কৌশলী বেসরকারি ব্যাংকাররা সেটাও ঠিকমত করেননি। তারা পৌর শহরের সন্নিহিত গ্রামে শাখা খুলেছেন।
কৃষিতে জোর অবশ্যই দিতে হবে। কারণ, কৃষি আমাদের অর্থনীতির প্রাণ। তাই বলে শিল্পকে অবহেলা করা চলে না। বিশেষত কর্মসংস্থান ও দক্ষ আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর শ্রমশক্তি গড়ে তোলার জন্য শিল্পের বিকল্প নেই। শিল্প গড়ার জন্য সরকারের নানারকম প্রণোদনাও রয়েছে। রয়েছে কর অবকাশ সুবিধা। এত কিছুর পর শুধু কি গ্যাস-বিদ্যুতের অভাবে শিল্পখাতে দুর্দিন নেমে আসবে? সেটা মানা সম্ভব নয়। তাহলে ব্যাংকিং খাতেও এর বিরূপ প্রভাব পড়বে। কর্মহীন হয়ে পড়বে বিশাল জনগোষ্ঠী। তাই গ্যাস-বিদ্যুত্ সরবরাহ, উত্পাদন বাড়াতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। কেবল রেশনিং করে ক্ষান্ত হলেই চলবে না। মনে রাখতে হবে সরকারের দায়িত্ব অনেক বেশি। যদিও কেউ কেউ বলেন, সরকার এখনো গ্যাস-বিদ্যুতের বিষয়ে উদাসীন। আসলে কি তাই? গত সাধারণ নির্বাচনে জনগণ যে রায় দিয়েছে তাতে সরকারের উদাসীন হওয়া চলে না। নীতি-নির্ধারকদের অবশ্যই বিষয়টি মনে রাখতে হবে। নইলে কবির ভাষায় বলতে হয়-
‘আমি যেমনটি ভাবি,
তুমি কি তেমনটি ভাবতে শেখোনি
নাকি বসন্ত এখনো আসেনি।’
ক্ষমতাসীনদের জন্য নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকা সত্ত্বেও বসন্ত না এসে থাকলে এ জাতির মুক্তির আশা দুরাশা ছাড়া আর কি!
লেখক: কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক
