গত চার মাস ধরে নারী নির্যাতন আর ধর্ষণের ঘটনায় তোলপাড় আমাদের গণমাধ্যম। কি পত্রিকা, কি টেলিভিশন সর্বত্রই হতাশাব্যঞ্জক এসব খবর। শুধু নারী ধর্ষণ নয়, শিশু ধর্ষণের ঘটনা এবং ধর্ষণের পর হত্যার মতো নৃশংস ঘটনাও ঘটছে এখন। এসব ঘটনা আমাদের বিবেককে বিচলিত করার কথা। বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে এগুলোকে না দেখে বরং সমাজেরই যে ভেতরে মূল্যবোধের অবক্ষয় সৃষ্টি হয়েছে তা ভাবতে হবে। তা না হলে এসব জঘন্য অপরাধ থেকে সমাজকে মুক্ত করা যাবে না। আমরা অনেক ক্ষেত্রে দেখি, আমাদের বড় বড় সামাজিক বিপর্যয়েও রাজনৈতিক এবং বুদ্ধিজীবী সমাজ সমান নীরবতা পালন করেন। তারা মুখর থাকতে ভালো বাসেন রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে। নারী নির্যাতন এবং ধর্ষণের ঘটনা নিয়ে প্রতিবাদ করেন নারীনেত্রী এবং এনজিওসহ কিছু কিছু সামাজিক প্রতিষ্ঠান। এই অবস্থা সমাজের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগের ঘটনা। আমরা সবাই জানি সমাজের চালিকাশক্তি হয়েছে রাজনীতিবিদগণ। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ভালো মন্দ নির্ভর করে তাদের ওপরেই। অর্থাত্ তাদের নেতৃত্বের সাফল্য-ব্যর্থতার সঙ্গে সমাজ ওঠানামা করে। আমাদের সমাজে আজ যে মূল্যবোধের ধস, সন্তানতুল্য ১০/১১ বছরের শিশুকে ধর্ষণের ঘটনা কোন সমাজে ঘটে এবং কখন সমাজের নেতৃবৃন্দ নীরব থাকেন? আমরা কি তাহলে এতটাই আত্মকেন্দ্রিক এখন যে, এত বড় বিপর্যয়ে রাজনৈতিক কোন ভূমিকা দেখবো না? সংবাদপত্র এবং বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলগুলো না থাকলে কি হতো সমাজে তা সত্যি বলা মুশকিল। দিল্লিতে চলন্ত বাসে ধর্ষণের স্বীকার হয়ে একজন মেডিক্যাল ছাত্রীর করুণ মৃত্যু সে দেশের সরকারি দল, বিরোধী দল ও সরকার প্রধান থেকে শুরু করে দলীয় প্রধান, বিরোধী দলীয় নেতা সবাইকে এক কাতারে এনেছে। কেউ কাউকে দায়ী করেনি। এ দায়ই সমগ্র জাতি গ্রহণ করেছে এমনকি দর্শকদের বিরুদ্ধে জনমত এমন অবস্থায় গেছে যে, সে দেশের কোন আইনজীবীও ধর্ষকদের পক্ষে আদালতে দাঁড়াতে রাজি হননি। আমাদের দেশের আইনজীবী, ডাক্তারসহ সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীরা কি এ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করবেন? জানি না সেই শুভ দিন এদেশে কবে আসবে। ২০১২ সালের ১৬ ডিসেম্বর অর্থাত্ ৩ সপ্তাহ আগে ভারতে যে মেয়েটি গণধর্ষণের স্বীকার হয়ে প্রাণ হারালেন তার বন্ধু প্রত্যক্ষদর্শী যে নিজেও আক্রান্ত হয়েছিল তার সাক্ষাত্কার প্রচার করেছে জি নিউজ। তাতে দেখা গেল পুলিশ তাদের বাঁচাতে যথাসময়ে যথা ভূমিকা পালন করেননি। অন্যদিকে পুলিশ পাল্টা বিবৃতি দিয়ে তার বক্তব্য খণ্ডন করেছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় ব্রিটিশ শাসকের তৈরি করে রেখে যাওয়া পুলিশী নীতি এই উপমহাদেশে এখনও একই রকম রয়ে গেছে। তবে এ অবস্থা থেকে ভারতীয় সমাজ অগ্রসর হচ্ছে ধীরে ধীরে। আমরা এখনো পিছিয়ে। তারা ধর্ষকদের শাস্তি নিশ্চিত করতে কঠোর শাস্তি দিতে প্রয়োজনে আইন পরিবর্তনের জন্যও আলাপ-আলোচনা শুরু করেছেন। আমাদের দেশে গত ৩ সপ্তাহে অন্তত ৭-৮টি মারাত্মক ধর্ষণ ও ধর্ষণজনিত হত্যার খবর প্রকাশ পেয়েছে।
প্রতিবাদ হয়েছে, হচ্ছে। কিন্তু এই ভয়াবহ অবস্থা প্রতিরোধ করতে সমাজ থেকে এই বিপর্যয় দূর করতে জাতীয় ঐকমত্য নিয়ে রাজনীতিবিদরা বসেননি আজও। টাঙ্গাইলের গণধর্ষণের স্বীকার স্কুল ছাত্রী, সাভারের কলেজ ছাত্রী, ফরিদপুরের জাকিয়া আক্তার চম্পার মত কিশোরীসহ কতগুলো বর্বর নৃশংস ঘটনা ঘটে গেল। হত্যার বিষয় ধামাচাপা দিতে আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেয়ার অপচেষ্টা, ময়না তদন্তে আত্মহত্যা দেখানোর অপচেষ্টার খবর পড়ে বিচলিত হই। তাহলে আমাদের সমাজ কোথায় চলেছে! দিল্লীর ধর্ষণে নিহত মেডিক্যাল ছাত্রীর বাবা শেষ পর্যন্ত বিদেশের গণমাধ্যমে বলেছেন, আমাদের মেয়ে কোন অন্যায় করেনি, কেন তার নাম গোপন রাখবো। তার নাম জ্যোতিসিং পান্ডে। সে বীরের মত প্রতিরোধ করার চেষ্টা করে মরেছে। যদি আইন হয় তাহলে সে আইন যেন নিহত জ্যোতিসিং পান্ডের নামে হয়। তার বাবা বদরিসিং পান্ডেকে অভিনন্দন জানাই তার এই সত্ সাহস ও উদার দৃষ্টিভঙ্গির জন্য। টাঙ্গাইলের মেয়েটির বাবা কিন্তু তার স্ত্রী এবং ধর্ষিতা কন্যাকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিলেন। এই ২টি ঘটনার বিপরীত অবস্থান দেখেই আমরা আমাদের মূল্যবোধের দীনতা টের পাই। আমাদের পুরুষরা কেন এখনও স্মরণ করে না রাস্তায় যে মেয়েটাকে টিজ করা হচ্ছে, লাঞ্ছিত করা হচ্ছে, ধর্ষণ করা হচ্ছে সে তো আমার আপনার বা আমাদের কারো সন্তান, নিকটাত্মীয়ও হতে পারতো বা পারে। অন্যের মেয়েকে লাঞ্চনা দিচ্ছেন যদি আপনার মেয়েটি এর স্বীকার হয়? তখন কি করবেন? সামাজিক মূল্যবোধ বদল এই ব্যাধি দূর হবে না।
লেখক :ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক
