রা জ নী তি

জোর-জুলুমের হরতাল আর হাতকড়া পরা লাশ

আপডেট : ০৮ জানুয়ারি ২০১৩, ২০:৫৫
নতুন ইংরেজি বছরের প্রথম মাসের দ্বিতীয় দিন নয়নাভিরাম হাতিরঝিল প্রকল্প উদ্বোধন করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, এটাই দেশবাসীর প্রতি তার সরকারের নববর্ষের উপহার। কিন্তু দুদিন যেতে না যেতেই এই উপহারের আনন্দ ম্লান হয়ে যায় জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্তে। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোটাও দেশবাসীর জন্য উপহার কি না সেটা অবশ্য বলা হয়নি। হাতিরঝিল প্রকল্প চালু হওয়ায় যারা খুশি হয়েছেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় তারা হয়েছেন বিরক্ত ও অখুশি। কারণ এতে মানুষের কোনো উপকার হয়নি বরং তাদের ওপর নানা রকম চাপ বাড়বে। জিনিসপত্রের দাম বাড়বে, বাড়বে যাতায়াত ব্যয়। এই সরকার ক্ষমতায় এসে কয়েক দফা জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধির অজুহাতে দেশে তেলের দাম বাড়ানোর কথা বলা হলেও এবার সরকারের এই যুক্তির সঙ্গে অর্থনীতিবিদরা একমত হতে পারছেন না। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এ মুহূর্তে এ ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা ঠিক হয়নি। নির্বাচনী বছরে এসেও সরকার কেন এমন অপ্রিয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলো সেটা অনেকের কাছেই বোধগম্য হচ্ছে না। সরকার জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কি-না সে প্রশ্ন উঠছে। এমনিতেই সরকারের শেষ বছরে এসে মানুষ সাফল্য-ব্যর্থতার হিসাব-নিকাশ শুরু করেছে। সরকারের সাফল্যগুলো ম্লান করে দিচ্ছে যেসব ঘটনা সেসব বন্ধ করতে সরকারের কোনো আগ্রহ না দেখে সরকারের হিতাকাঙ্ক্ষীরাও স্বস্তি বোধ করছেন না। এই অবস্থায় জনস্বার্থের কথা বিবেচনা না করে আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল বা আইএমএফের পরামর্শ বা চাপের কারণেই সরকার জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়ে উচিত কাজ করেননি বলেই মনে করা হচ্ছে। সরকারের এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ৬ জানুয়ারি সারাদেশে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল পালন করেছে বিএনপিসহ ১৮ দল। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর ফলে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বাড়বে। হরতাল আহ্বান করায় কি মানুষের দুর্ভোগ কোনোভাবে কমেছে, নাকি বেড়েছে? সরকারের গণবিরোধী পদক্ষেপের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ অবশ্যই জানাতে হবে। প্রশ্ন হচ্ছে, হরতাল ছাড়া প্রতিবাদ জানানোর আর কী কোনো উপায় নেই? হরতাল যেহেতু শান্তিপূর্ণভাবে পালন করা হয় না, সেহেতু হরতাল আহ্বান করলেই মানুষ আতঙ্ক বোধ করে, ভয় পায়। হরতাল কার্যকর করার জন্য যেভাবে শক্তি প্রয়োগ করা হয়, গণপরিবহনে অগ্নিসংযোগ করা হয়, ভাংচুর করা হয়, সেটা কোনোভাবেই সমর্থন করা যায় না। এসবে সরকারের কোনো ক্ষতি হয় না। ক্ষতিগ্রস্ত হয় গাড়ির মালিক, যার হয়তো সরকার বা সরকারি দলের সঙ্গে কোনো ধরনের সম্পর্কই নেই। হরতাল যারা আহ্বান করে তারা এখন জনগণকে সংগঠিত করে এর পক্ষে সমর্থন আদায়ের পরিবর্তে ভয়ভীতি দেখিয়ে হরতাল পালনে বাধ্য করতে চায়। ৬ জানুয়ারির হরতালেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। আগের দিন বিকাল থেকেই ভাংচুর, অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। হরতাল কিংবা ধর্মঘট রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দাবি আদায়ের একটি স্বীকৃত গণতান্ত্রিক পদ্ধতি। আইন করে হরতাল কিংবা ধর্মঘট বন্ধ করার উদ্যোগ অগণতান্ত্রিক পদক্ষেপ বলেই বিবেচিত হবে। মানুষের অধিকার হরণ করা চলবে না, তবে অধিকার প্রয়োগ করতে গিয়ে যদি দায়িত্বহীনতার পরিচয় দেয়া হয়, তাহলে সেটাও সমর্থন করা যাবে না। আজকাল হরতাল ডেকে যেভাবে জ্বালাও-পোড়াও করা হয়, মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ও ভয়ভীতি ছড়ানো হয় তার বিরুদ্ধে সবাইকে সোচ্চার হতে হবে। সরকারের কোনো নীতি বা কাজের প্রতিবাদ জানানোর জন্য হরতালের বিকল্প কিছু খুঁজে বের করতে হবে। দাবির পক্ষে জনগণের সমর্থন থাকলে শান্তিপূর্ণ পিকেটিংয়েই কি হরতাল সফল হওয়ার কথা নয়? গণতান্ত্রিক অধিকার চর্চার নামে জোরজুলুম করে হরতাল ‘সফল’ করার রীতি অবশ্যই পরিহার করতে হবে। না হলে এই গণতান্ত্রিক অধিকারটি হরণ করার সুযোগ ক্ষমতাসীনরা পেয়ে যাবে। ৬ জানুয়ারি হরতাল ডেকে গাড়ি পুড়িয়ে আতঙ্ক ছড়ানোর বিরুদ্ধে মানুষ ক্ষুব্ধ হয়েছে। তবে তার চেয়ে বেশি ক্ষুব্ধ হয়েছে ৫ জানুয়ারি রাতে কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার আদাবাড়িয়া এলাকা থেকে বিএনপি নেতা রফিকুল ইসলাম মজুমদারের হাতকড়া পরা অবস্থায় লাশ উদ্ধারের ঘটনায়। গাড়ি পোড়ানোর ঘটনায় মানুষ যতটা না তার থেকে অনেক বেশি আতঙ্ক বোধ করেছে এমন বীভত্স হত্যাকাণ্ডে। ঢাকা মহানগরের ৫৬ নং ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম মজুমদার কীভাবে নিহত হলেন, কারা তাকে হত্যা করলো— এসব প্রশ্ন ব্যাপকভাবে সব মহলেই আলোচিত হচ্ছে। এমন বর্বরতার বিরুদ্ধে ঘৃণা ও ধিক্কার জানাচ্ছেন সবাই। নিহতের আত্মীয়-স্বজন তথা পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, র্যাবের পরিচয় দিয়েই কালো পোশাক পরিহিত সশস্ত্র ব্যক্তিরা তাকে তার শৈলকুপার আনন্দ নগরের শ্বশুরবাড়ি থেকে ধরে নিয়ে যাওয়ার কয়েক ঘণ্টা পরই তার মৃতদেহ পাওয়া যায়। তারা র্যাবের নামাঙ্কিত গাড়িও ব্যবহার করেছে। তার হাতকড়ায় ‘পুলিশ’ খোদাই করা আছে। র্যাব বলেছে, তারা এ ব্যাপারে কিছুই জানে না। পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে ‘পুলিশ’ খোদাই করা হ্যান্ডকাপ নাকি বাজারে কিনতে পাওয়া যায়। কী মারাত্মক কথা। এটা জেনেও পুলিশ কোনো ব্যবস্থা নেয় না? কারা ‘পুলিশ’ লেখা হাতকড়া বাজারে বিক্রি করে, কী তাদের উদ্দেশ্য— সেটা জানা কি পুলিশের দায়িত্ব নয়? যদি সব জেনেও পুলিশ প্রশাসন চোখ বুজে থাকে তাহলে কী দায়িত্বে অবহেলা করা হয়নি? রফিকুল হত্যার জন্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দায়ী করে বিএনপি নেতা তরিকুল ইসলাম বলেছেন, সরকার পরিকল্পিতভাবেই তাকে খুন করেছে। এই অভিযোগ বিএনপি নেতা করতেই পারেন। তার অভিযোগ ভিত্তিহীন প্রমাণ করার দায়িত্ব আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর। কারণ রফিকুল ইসলাম তো আর আত্মহত্যা করেননি। কেউ না কেউ তাকে মেরে ফেলেছে। নিজ দলের মধ্যে বিরোধের কারণে, মার্কেট নিয়ে ব্যবসায়িক দ্বন্দ্বে তিনি হত্যার শিকার হয়েছেন নাকি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ তাকে হত্যা করেছে, তা খুঁজে বের করার দায়িত্ব আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর। র্যাব-পুলিশ এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত নয়— এটুকু বলেই তারা দায়িত্ব এড়াতে পারে না। র্যাব যদি তাকে ডেকে না-ও নিয়ে থাকে তাহলে কারা তাকে ডেকে নিয়ে গেল এবং তাকে হত্যা করে মৃতদেহ ফেলে পালালো তা খুঁজে বের করার দায়িত্ব তো তাদেরই। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তথা সরকার কোনোভাবেই এই হত্যাকাণ্ডের দায় এড়াতে পারবে না, অস্বীকার করতে পারবে না। অপহরণ, গুম, খুন ইত্যাদি দেশে অহরহই ঘটে চলছে। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডও কমছে না। এসব নিয়ে উদ্বেগের শেষ নেই। দেশ এবং দেশের বাইরেও এ নিয়ে সরকারকে বিভিন্ন মহলের তীব্র সমালোচনার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। অথচ আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধ করার সুস্পষ্ট অঙ্গীকার ছিল। গুম ও খুনের সঙ্গে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও নতুন নয়। র্যাব-পুলিশের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ উঠলে তারা যত দ্রুততার সঙ্গে তা অস্বীকার করে, তত দ্রুত অভিযোগ খণ্ডানোর জন্য বিশ্বাসযোগ্য তথ্য-প্রমাণ হাজির করতে পারে না। ফলে তারা অস্বীকার করলেও মানুষের সন্দেহ দূর হয় না। ক্রসফায়ার, বন্দুকযুদ্ধ নিয়ে যে সব কাহিনী প্রচার করা হয়, তাও মানুষ বিশ্বাস করে না। রহস্য তৈরি করা নয়, রহস্য ভেদ করাই আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কাজ। কিন্তু আমাদের দেশে দেখি তার উল্টোটা। বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী গুম হওয়ার রহস্য আজও উন্মোচিত হয়নি। আজও পাওয়া যায়নি বিএনপি নেতা চৌধুরী আলমের খোঁজ। এভাবে একের পর এক জীবন্ত মানুষ ভেনিশ হয়ে যাওয়ায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে। সরকার বিব্রত হচ্ছে। অপরাধ যেই করুক তাকে শনাক্ত করা, ধরা, আইনের কাছে সোপর্দ করার দায়িত্ব যাদের তারা কোনো অজুহাতেই দায় এড়াতে পারবে না। রফিকুল ইসলাম মজুমদার কীভাবে নিহত হয়েছেন, কারা তাকে হত্যা করেছে তা দ্রুত খুঁজে বের করতে হবে। তিনি যদি অপরাধীও হয়ে থাকেন, তাহলেও বিচার না করে তাকে মেরে ফেলার অধিকার কারো নেই। তার ঘাতকদের ধরতে হবে, শাস্তি দিতে হবে। যদি এটা করা না যায় তাহলে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সরকার অভিযুক্ত হতেই থাকবে। অপহরণ, গুম, খুন ইত্যাদি দিয়ে রাজনীতি না করে এগুলো বন্ধ করার জন্য কঠোর মনোভাব গ্রহণের বিকল্প নেই। একজন দাগী অপরাধীরও বিনা বিচারে মৃত্যু কাম্য নয়। এটা আইনের শাসনের পরিপন্থি। সরকারকে দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালন— এই নীতির পক্ষে দৃঢ়ভাবে দাঁড়াতেই হবে। ++লেখক :সাংবাদিক ও কলামিস্ট [email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন