আমাদের দেশে দুর্নীতি বরাবরই একটি আলোচিত বিষয়। এর প্রধানতম কারণ হলো- সমাজের প্রায় সর্বস্তরে দুর্নীতির সর্বগ্রাসী রূপ। অস্বীকার করার উপায় নেই সুশাসন এবং সঠিক জবাবদিহিতার অভাবের কারণেই সরকারি-বেসরকারি সব প্রতিষ্ঠানেই কম বেশি দুর্নীতি বিদ্যমান। তবে যে সব প্রতিষ্ঠানসমূহ সরাসরি জনগণের সেবাপ্রদানকারী সংস্থা বলে পরিচিত সে সব প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতি নিয়েই সবচেয়ে বেশি আলোচনা হয়। চলমান রাজনীতি এবং সমাজ ব্যবস্থার আলোকে আমাদের দেশ দুর্নীতিমুক্ত কল্পনা করা এখনো বহুদূর। তবে দুর্নীতির মাত্রা এবং অসহনীয় রূপ সমাজকে কতোটা কলুষিত করছে, জবাবদিহিতা কতোটা বিনষ্ট হচ্ছে, দুর্নীতির গতিপ্রকৃতি সেগুলো অবশ্যই সচেতন সমাজের জানার বিষয়। কালের প্রবাহে বাংলাদেশে দুর্নীতির রূপ বদলেছে, নানাভাবে, নানারূপে দুর্নীতি হচ্ছে। সার্বিক দুর্নীতি সেই অর্থে কমছে না। সেবাখাতসমূহে আগের তুলনায় বেশি জবাবদিহিতা এবং অবাধ তথ্য আদান-প্রদান ও জানার ক্ষেত্র তৈরি হওয়ায় সাধারণ জনগণ সেবাপ্রাপ্তির অধিকার সম্পর্কে ক্রমশ সচেতন হচ্ছে। যা দুর্নীতি কমিয়ে আনতে এক ধরনের কার্যকর ভূমিকা পালন করছে। বাংলাদেশের সেবাখাতসমূহের দুর্নীতির চিত্র প্রকাশ করে গত একযুগেরও বেশি সময় ধরে আলোচনায় রয়েছে টিআইবি তথা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ। টিআইবি দুই বছর অন্তে সেবাখাতের খানা জরিপের আলোকে দুর্নীতির একটি চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করে। গত বছরের শেষলগ্নে ২৮ ডিসেম্বর সর্বশেষ সিরডাপ মিলনায়তনে সংবাদ সম্মেলন করে সেবাখাতের দুর্নীতির খানা জরিপ রিপোর্ট তারা অনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করে। এবারের জাতীয় খানা জরিপ থেকে প্রাপ্ত তথ্যাদি বিচার বিশ্লেষণ করে টিআইবি বলেছে দেশের ৬৩.৭% সেবাগ্রহণকারী কোনো না কোনো ভাবে দুর্নীতির শিকার হচ্ছেন। তবে সেবাগ্রহণের প্রেক্ষিতে সর্বাধিক দুর্নীতিগ্রস্ত খাত হলো শ্রম অভিবাসন (৭৭%)। প্রথমবারের মত এই খাতকে সর্বাধিক দুর্নীতিগ্রস্ত খাত হিসেবে বলা হলো টিআইবি’র রিপোর্টে। এর পরেই রয়েছে আইন শৃঙ্খলারক্ষাকারী সংস্থা (৭৫.৮%), ভূমি প্রশাসন (৫৯%), বিচারিক সেবা (৫৭.০%)। খানা জরিপে বলা হয়েছে সেবা গ্রহণের সময় বাংলাদেশের ৫৩.৩% খানাকে কোনো না কোনো খাতে নিয়ম বহির্ভূতভাবে অর্থ দিতে হয়েছে যার গড় ১৩০৮৪ টাকা। তবে বলা হয়েছে ২০১০ সালের তুলনায় ২০১২ সালে স্বাস্থ্য খাত ছাড়া প্রায় প্রতিটি খাতেই দুর্নীতি ও হয়রানি কমেছে। এই খানা জরিপটি পরিচালনা করা হয়েছে ২০১২ সালের ১৫ মে থেকে ৪ জুলাই পর্যন্ত যা দেশের ৬৪টি জেলাতে পরিচালনা করা হয়।
২০১০ সালে যে সব সেবাখাতসমূহকে অগ্রাধিকার দিয়ে খানা জরিপ সম্পন্ন করা হয়েছিল সেগুলো হলো-আইন শৃঙ্খলারক্ষাকারী সংস্থা, ভূমি প্রশাসন, বিচারিক সেবা, স্বাস্থ্য, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান কৃষি, বিদ্যুত্, কর ও শুল্ক, শিক্ষা, ব্যাংকিং, বীমা, এনজিও এবং অন্যান্য। উল্লিখিত সেবা খাতে দুর্নীতির শিকার হওয়া খানার হার ছিল এ রকম- আইন শৃঙ্খলারক্ষাকারী সংস্থা (৭৯.৭), ভূমি প্রশাসন (৭১.০২), বিচারিক সেবা (৮৮.০), স্বাস্থ্য (৩৩.০২), স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান (৪৩.৯) কৃষি (৪৫.০৩), বিদ্যুত্ (৪৫.০৯), কর ও শুল্ক (৫১.০৩), শিক্ষা (১৫.০৩), ব্যাংকিং (১৭.০৪), বীমা (১৯.০২), এনজিও (১০.০১) এবং অন্যান্য (৩৪.০১)। এদিকে ২০১২ সালে এই সেবাখাতসমূহে দুর্নীতির হার এ রকম- আইন শৃঙ্খলারক্ষাকারী সংস্থা (৭৫.৮), ভূমি প্রশাসন (৫৯.০), বিচারিক সেবা (৫৭.১), স্বাস্থ্য (৪০.২), স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান (৩০.৯) কৃষি (২০.৪), বিদ্যুত্ (১৮.৩), কর ও শুল্ক (১৬.০৮), শিক্ষা (১৪.০৮), ব্যাংকিং (৭.১), বীমা (৬.০), এনজিও (৫.০) এবং অন্যান্য (৫৪.৯)। ২০১২ সালের সাথে ২০১০ সালের খানা জরিপের তুলনামূলক চিত্রে সেবাখাতের যে ১২টি খাতকে উল্লেখ করা হয়েছে সেখানে শ্রম অভিবাসন বিষয়টি সরাসরি তালিকাতে নেই। অর্থাত্ ২০১০ সালে যে খানা জরিপটি করা হয়েছিল সেখানে শ্রম অভিবাসন খাতটি সরাসরি অন্তর্ভুক্ত ছিল না। বলা হয়েছে সেটি অন্যান্য খাত বলে যেটি রয়েছে সেখানে অন্তর্ভুক্ত ছিল। তবে ২০১০ সালের খানা জরিপ থেকে বুঝা যায় বা ধরে নেয়া যায় সে সময় ঐ খাতটিকে ততোটা গুরুত্ব দেয়া হয়নি বলে তালিকায় অগ্রাধিকার পায়নি। অথবা পূর্বে এই সেবাখাতের সাথে সমাজের ব্যাপক জনগণের সম্পৃক্ততা রয়েছে তা বিবেচনায় আনা হয়নি। এবারের খানা জরিপে বলা হয়েছে শ্রম অভিবাসন খাত দুর্নীতি শিকার হওয়া খাতে প্রথম হয়েছে এবং ২০১০ সালে অন্তর্ভুক্ত খাতগুলোর দুর্নীতি কিছুটা হ্রাস পেয়েছে। কেন হ্রাস পেয়েছে টিআইবির পক্ষ থেকে সে বিষয়ে কিছু সামাজিক, অর্থনৈতিক কারণের কথাও বলা হয়েছে। যেমনটি বলা হয়েছে-সে সব কারণে দুর্নীতির মাত্রা কমেছে বলে অনুমান করা যায় তার মধ্যে রয়েছে জনগণের মধ্যে দুর্নীতি বিরোধী সচেতনতা বৃদ্ধি, কোনো কোনো সেবাখাতে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে সেবাগ্রহণ প্রক্রিয়া সহজতর করা, সরকারি কর্মকর্তাদের দুর্নীতি বিরোধী প্রশিক্ষণ, কিছু কিছু স্থানীয় সরকার পর্যায়ে জনপ্রতিনিধিদের দায়িত্বশীল ভূমিকা এবং সর্বোপরি নাগরিক সমাজ, এনজিও ও গণমাধ্যমে দুর্নীতিবিরোধী সক্রিয়া প্রচারণার ফলে সার্বিকভাবে জনসচেতনতা ও দুর্নীতি বিরোধী অবস্থান গ্রহণের সুযোগ।
সেবাখাতের বিবেচনায় অন্যান্য খাতকে বাদ রেখে শ্রমঅভিবাসন খাতে সর্বোচ্চ দুর্নীতি হচ্ছে-টিআইবির খানা জরিপের এই ফলাফল কতোটা সঠিক, যৌক্তিক, তথ্য নির্ভর তা জনগণই বিচার বিবেচনা করবে। তবে কোনোভাবেই আমি বলছি না যে এই খাত দুর্নীতিমুক্ত বা এই খাতে কোনো ধরনের দুর্নীতি নেই। একইভাবে টিআইবি যে সব লজিক বা অনুমানের আলোকে বলেছে যে কেন বিভিন্ন সেবা খাতে দুর্নীতি কমেছে বা হ্রাস পেয়েছে তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। সেই লজিকগুলোকেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে স্ববিরোধী বলে মনে হয়েছে। প্রথমত-যদি দুর্নীতি সার্বিকভাবে কমেই থাকে তাহলে আবার শুধুমাত্র শ্রমঅভিবাসন ক্ষেত্রে দুর্নীতি মাত্রাতিরিক্ত থাকলো এটা কি ধরনের বক্তব্য। তাহলে কী কেবল এই খাতের সাথে সম্পৃক্তরাই দুর্নীতি বিরোধী প্রচার-প্রচারণার কোনো কিছু শুনতে বা জানতে পারেননি। বরং অন্য যে কোনো খাতের তুলনায় এই সেক্টরে বা খাতে অনেক আগে থেকেই সরকারি এবং বেসরকারি উদ্যোগে ব্যাপক প্রচার প্রচারণা চালানো হচ্ছে যাতে করে অভিবাসী ইচ্ছুক কোনো মানুষ প্রতারিত না হয়। প্রতারিত হলে তারও বিচার পাওয়ার ব্যবস্থা করেছে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়। প্রতারিত ব্যক্তির অধিকার রয়েছে প্রতিকার পাওয়ার জন্যে বিএমইটির নির্দিষ্ট সেলে অভিযোগ করার। তবে এই খাতের মূল সমস্যা হলো প্রকৃত জনশক্তি ব্যবসায়ীর আড়ালে আরেকটি কথিত ব্যবসায়ী গোষ্ঠী জন্ম বা শক্তিশালী উত্থান-যারা মূলত বিভিন্ন কলা-কৌশলে এবং লোভ দেখিয়ে প্রতারণার ফাঁদে ফেলে মানুষকে প্রতারিত করছে। এই গোষ্ঠী কোনোভাবেই সরকার বা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য নয়। যেমনটি জবাবদিহি করতে বাধ্য প্রকৃত জনশক্তি ব্যবসায়ী, সরকারের কাছে যারা নিবন্ধিত। টিআইবি যে খানা জরিপ করেছে সেই জরিপে যদি সেবাগ্রহণকারীরা বলে থাকে যে তারা বিদেশ যাওয়ার জন্যে টাকা দিয়ে প্রতারিত হয়েছেন বা প্রতিশ্রুত সেবা তারা পাচ্ছে না -তাহলে তারা কাকে, কোন্ প্রতিষ্ঠানকে টাকা দিয়েছিল সেটি জানা প্রয়োজন। যদি কথিত দালাল চক্র, নামসর্বস্ব কোনো ভুয়া প্রতিষ্ঠানকে টাকা দিয়ে কেউ প্রতারিত হয় তাহলে সেটা পুরো শ্রম অভিবাসন খাতের দুর্নীতির বহিঃপ্রকাশ হতে পারে না। যদি বলা হতো উত্তরদাতারা সরকার নিবন্ধিত প্রকৃত জনশক্তি ব্যবসায়ী কর্তৃক সম্পূর্ণরূপে প্রতারিত হয়েছে তাহলে এই খাতটিকে যে ভাবে অভিযুক্ত করা হয়েছে সেটা গ্রহণযোগ্য হতে পারতো। তবে আমরা স্বীকার করি এই খাতের মূল অভিযোগটা হলো অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয়। সেটাও অবশ্য হয়েছে বিশ্ব শ্রমবাজারে বিভিন্ন ফি বৃদ্ধি, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, দূতাবাস গুলোর দায়িত্বহীনতা, ঢাকাতে জীবন ব্যয় বৃদ্ধি, অসম প্রতিযোগিতা এবং নানা মধ্যস্বত্বভোগী তৈরি হওয়াসহ বিবিধ কারণে। অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয় কমিয়ে আনতে সরকার এবং জনশক্তি ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে বিভিন্ন ধরনের প্রচেষ্টা নেয়া হয়েছে এবং এ চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
সবশেষে বলবো কমবেশি দুর্নীতি সব দেশেই হয়। কিন্তু আমাদের দেশে দুর্নীতি দমনের চেয়ে দুর্নীতি নিয়ে ঢের রাজনীতি হয় বেশি। এক পক্ষ আরেক পক্ষকে দোষারোপ করেই দায়িত্ব শেষ করেন। আর এই সুযোগে দুর্নীতিবাজরা রাজনৈতিক ছদ্মাবরণে নিরাপদ স্থানে চলে যান। বর্তমান সময়েও আমরা কম বেশি সেটি দেখতে পাচ্ছি। নইলে হঠাত্ করে এই খাতকে প্রধান দুর্নীতিগ্রস্ত খাত বলে রিপোর্ট প্রকাশ করার অর্থ কী? অথচ এই খাতটিই অর্থনীতির অন্যতম এক চালিকাশক্তি। সদ্যবিদায়ী ২০১২ সালেও বিভিন্ন দেশে বসবাসকারী বাংলাদেশিরা এক হাজার ৪০০ কোটি ডলারের বেশি প্রবাসী আয় পাঠিয়েছে। বছরভিত্তিক পরিসংখ্যনে যা রীতিমতো রেকর্ড। অতীতের সকল রেকর্ড ভঙ্গ হয়েছে এবার। ২০১১ সালের এই আয় ছিল এক হাজার ২১৬ কোটি ডলার। অর্থাত্ এক বছরে প্রবাসী আয় বেড়েছে ১৬ দশমিক ৪৫ শতাংশ। অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন এই উচ্চহার প্রবাসী আয় প্রবাহ দেশের বৈদেশিক মুদ্রার মজুতকে এক নতুন মাত্রায় নিয়ে গেছে। এক বছরের ব্যবধানে রিজার্ভ বেড়েছে ৩০০ কোটি ডলার। এদিকে নানা চড়াই-উত্রাই পেরিয়ে নতুন বারতা নিয়ে আসছে মালয়েশিয়া, লিবিয়া, ইরাক, কাতারের শ্রমবাজার। সব মিলিয়ে অভিবাসনকে ঘিরে যখন নতুন স্বপ্ন শুরু হতে যাচ্ছে তখন এই খাতকে আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্যে কালিমা লেপন নয় বরং সকলের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা জরুরি।
++ লেখক : জনশক্তি বিশ্লে¬ষক এবং চেয়ারম্যান, ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি
[email protected]
