‘ভেবেছিনু মনে যা হবার তারি শেষে/যাত্রা আমার বুঝি থেমে গেছে এসে।’ বাংলাদেশের গণতন্ত্রের অবয়বের দিকে তাকালে কবি গুরুর গীতাঞ্জলীর এই পুংক্তিদ্বয় মনে পড়ে। গত বাইশ বছর যাবত্ প্রতিটি নির্বাচনের অল্প কিছুদিন পরেই গণতন্ত্রায়ণের প্রাথমিক ধাপ এই নির্বাচন নিয়ে অস্থিরতা তৈরি হয়। গণতন্ত্রের পুনরুত্থানের (১৯৯০) পর প্রতিটি সরকার এমন কলাকৌশল করেন যার ফলে প্রতিটি সরকারের আমলের বিরোধী রাজনৈতিক গোষ্ঠীসহ বাংলাদেশের সাধারণ নাগরিকদের মনে পরবর্তী নির্বাচন সুষ্ঠু না হওয়ার ব্যাপারে সন্দেহ দানা বাঁধে। অনেক সময় মনে হয়, সরকারের যা পরিকল্পনা তাতে এটাই হয়তো শেষ গণতান্ত্রিক সরকার হবে। নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তনের পথ বাংলাদেশে হয়তো রুদ্ধ হয়ে যাবে। ২০০৮ সালে নির্বাচন হলো। মনে মনে ভয় জেগেছিল নির্বাচনকে নিজস্ব পরিকল্পনামত অনুষ্ঠান করার জন্য আওয়ামী লীগ সরকার আবার কী ফন্দি-ফিকির আঁটে। খুব বেশিদিন অতিবাহিত হয়নি আওয়ামী লীগ ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচন নিজের পরিকল্পনামাফিক করার জন্য সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সংবিধানকেই কাটা-ছেঁড়া করে ফেলেছে। ১৯৯১ নির্বাচনে বিজয়ী বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ লড়াই করেছে ১৯৯৬ সালের সুষ্ঠু নির্বাচনকে রক্ষা করার জন্য। ১৯৯৬ সালে নির্বাচনে বিজয়ী আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে বিএনপি লড়াই করবে এই নির্বাচনকে রক্ষার জন্যই। একইভাবে লড়াই হয়েছে ২০০১ সালের পরে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে বিচারপতিদের বয়স বৃদ্ধি করে সংবিধানকে কাটা-ছেঁড়া করে সুষ্ঠু নির্বাচনকে রুদ্ধ করার কূটকৌশলের বিরুদ্ধে। এখন স্বয়ং সংবিধান ও বিচারিক রায়ই দাঁড়িয়ে গেছে জনগণের অতি প্রত্যাশিত সুষ্ঠু নির্বাচনের বিরুদ্ধে। ২০১৪ সালে হয়তো গণতন্ত্রের মৃত্যু হবে সংবিধান রক্ষার জন্য। তাই বারবার মনে হয় গণতন্ত্রের যাত্রা বুঝি থেমে গেছে এসে।
মৃত্যুর পরে জীবন আছে কিনা, এই নিয়ে আস্তিক ও নাস্তিকদের মধ্যে তর্ক আছে। কিন্তু গণতন্ত্রের পরে আর কোনো জীবন আছে কিনা এ নিয়ে ক’জনাই প্রশ্ন ছোঁড়ে? অবশ্য এ প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছেন আমাদের আমজনতার লেখিকা অরুন্ধতী রায়। গত ক’দিন ধরে গণতন্ত্রের উপর অরুন্ধতী রায়ের ‘লিসেনিং টু গ্রাসহুপারস’ পড়ছিলাম। এই গ্রন্থের শুরুতেই লেখক দু’টি প্রশ্ন উত্থাপন করেছিলেন। একটি ছিল গণতন্ত্রের পরে কি কোন জীবন আছে? অন্যটি ছিল যদি থাকে সেটা কেমন হবে? লেখিকার বক্তব্য ছিল এই প্রশ্নগুলোর উত্তর নির্ভর করবে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার শাসনকার্যের চরিত্রের উপর। গণতন্ত্রের অনেক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও আমাদের সামনে এখন যা কিছু আছে তন্মধ্যে এই গণহতান্ত্রিক ব্যবস্থাই সমৃদ্ধ। বাংলাদেশের জনগণের দুর্ভাগ্য যে, এদেশের রাজনৈতিক এলিট ও বুদ্ধিজীবীরা প্রতি পাঁচ বছর পরপর গণতন্ত্রে সীমাবদ্ধতাগুলো দূর করে একে সমৃদ্ধ করার পরিবর্তে এরা মগ্ন থাকে গণতন্ত্রের পথ তথা নির্বাচনকে কীভাবে কণ্টাকীর্ণ করা যায় তার বন্দোবস্ত করতে। এর ফলে গত ২২ বছরে চারটি (প্রধানত) সরকারের আমলে সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়েছে ঐ নির্বাচনকে সুষ্ঠু করার জন্য। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে আমরা ভেবে থাকতে পারি আগামী ২০১৯ সালের আগে আবার আমাদের রাজনৈতিক দল ও বুদ্ধিজীবীদের সংলাপে বসতে হবে এই নির্বাচনকে সুষ্ঠু করার জন্য। তাই মনে প্রশ্ন জাগে সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য এই ‘সংলাপ সংলাপ খেলা’ আর কতদিন চলবে? আমাদের গভীরভাবে ভাবতে হবে কেন দশক দশক ধরে এই নির্বাচনকেন্দ্রিক ‘সংলাপ সংলাপ খেলা’? এই প্রশ্নের গভীরে না গিয়ে প্রতি পাঁচ বছর অন্তর অন্তর সংলাপে বসলে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব হতে পারে, পূর্ণাঙ্গ গণতন্ত্রায়ণ সম্ভব নয়। তাই গণতন্ত্রায়ণের একটি পর্যায় (নির্বাচন) নয়, সার্বিক গণতন্ত্রায়ণ নিয়ে সংলাপ প্রয়োজন, যেখানে দু’টি রাজনৈতিক দলের মধ্যেই শুধু আলোচনা হবে না। আলোচনা হতে হবে সুবিধাভোগী কতিপয় এলিটের সাথে সুবিধাবঞ্চিত আমজনতার। আর এর জন্য প্রয়োজন পূর্ণাঙ্গ সামাজিক আন্দোলন। অন্যথায় দেশি-বিদেশি কোনো গণ্যমান্য ব্যক্তির ড্রইংরুমে অথবা রাষ্ট্রীয় কোনো পবিত্র স্থানে প্রধান দু’টি রাজনৈতিক দলের মহাসচিব ও সাধারণ সম্পাদকের মধ্যে আলোচনা হবে। হয়তো নির্বাচনও সুষ্ঠু হবে, মানুষ ভোট দিতে যাবে, নতুন সরকার প্রতিষ্ঠিত হবে; কিন্তু পূর্ণাঙ্গ গণতন্ত্রায়ণ হবে না। যে গণতন্ত্রায়ণের ফলে গণতন্ত্রের রাজপথে বিশ্বজিতের মৃত্যু হবে না বা পুলিশের হাতকড়া পরা অবস্থায় কোনো নাগরিকের লাশ পড়ে থাকবে না।
শিল্প বিপ্লবের হাত ধরে আধুনিক যুগের গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু। তাই পুঁজির বিকাশ ও তার শক্তিমত্তার উপর গণতন্ত্রের বিকাশ ও বিস্তার নির্ভরশীল। এজন্য আধুনিক গণতন্ত্র বৃটেন থেকে শুরু হয়ে পশ্চিম ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ড পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। বাংলাদেশেও ইতিমধ্যে এক ধরনের পুঁজির বিকাশ হয়েছে। সুশীল সমাজও কার্যকর আছে। কিন্তু গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য সামাজিক দ্বন্দ্বগুলোর নিরসন প্রয়োজন। ক্ষুদ্র এলিট গোষ্ঠীর হাত থেকে রাষ্ট্রের মুক্তি প্রয়োজন, সেই শর্তগুলো বাংলাদেশে অনুপস্থিত। তাছাড়া, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য যে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা আবশ্যক সে বিষয়েও আমাদের মাথাব্যথা নেই। সংলাপ হতে হবে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য, প্রয়োজনীয় সকল শর্ত ও সুযোগ নিশ্চিত করার জন্য। আমাদের কারোরই সেদিকে কোনো দৃষ্টি নেই।
বৃটেনে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে শ্রেণীস্বার্থের দু’টি ভিন্ন আপোষরফা থেকে। শ্রেণীস্বার্থের একটি আপোষরফা হলো অভিজাত ও বুর্জোয়াদের মধ্যে যা সিভিল ওয়ারকে নেতৃত্ব দেয় এবং রিপাবলিক প্রতিষ্ঠা করে। দ্বিতীয়টি ছিল বুর্জোয়া ও শ্রমিক শ্রেণীর মধ্যে। এর ফলে এক পর্যায়ে ‘এক ব্যক্তি এক ভোট’ নীতি প্রতিষ্ঠিত হয়। তাছাড়া, শ্রমিক ইউনিয়নগুলোর সামাজিক ও রাজনৈতিক দাবির প্রেক্ষিতে বৃটেন একটি কল্যাণমূলক রাষ্ট্রে পরিণত হয়। এর ফলে বৃটেন সামাজিক ও অর্থনৈতিক পুনঃবণ্টনের ইনস্ট্রুমেন্ট হিসেবেও কাজ করে। এ প্রক্রিয়ায় কিন্তু বাংলাদেশে উঠতি বুর্জোয়াদের সাথে শ্রমিক শ্রেণীর কোনো আপোষরফা নেই। শ্রমিকগণ অর্থনৈতিক ও সামাজিক সম্পদ পুনঃবণ্টনের বিষয়ে অংশগ্রহণ করতে পারে না। তাছাড়া, শ্রমিক ইউনিয়নগুলো প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলের লেজুড়বৃত্তি করায় সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংস্কারের জন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী এলিটদেরকে বাধ্য করতেও পারছে না। বাংলাদেশে শ্রমিকদের স্ট্যান্ডার্ড মজুরি নেই, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা নেই। নেই সাধারণ আবাসন ব্যবস্থা। তারা ভোট দিয়ে পরোক্ষ গণতন্ত্রে অংশগ্রহণ করে। কিন্তু প্রতিনিধিরা কেউই শ্রমিকদের স্বার্থের ব্যাপারে মনোযোগী নয়। এভাবে রাষ্ট্র আমজনতার নিকট অপরিচিতই থেকে যাচ্ছে। সংলাপ প্রয়োজন এ বিষয়েও।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর অ-উপনিবেশীকরণ শুরু হলে উদার গণতন্ত্রের মন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে আফ্রিকায় কতিপয় নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়। স্বাধীনতার পরপর সদ্য বিদায়ী ঔপনিবেশিক শক্তিগুলোর পরামর্শে কতিপয় এলিট এই সকল রাষ্ট্রে উদার গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার মনোযোগী হয়। অথচ গণতন্ত্র কখনোই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার চাপ বা এলিটদের সিদ্ধান্তের বিষয় নয়। ফলে এই সকল রাষ্ট্রে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো মুখ থুবড়ে পড়ে এবং পশ্চাতে কর্তৃত্ববাদী শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশেও বহুবার কর্তৃত্ববাদী শাসন এসেছে। ২০০৮ সালে গণতন্ত্র রক্ষার জন্যও কর্তত্ববাদী শাসন প্রতিষ্ঠিত করা হয়। সেলুকাস! কি বিচিত্র এই দেশ! বাংলাদেশে সংলাপ প্রয়োজন সকল রাজনৈতিক দলের মধ্যে। যে সংলাপে পরোক্ষ অংশগ্রহণ থাকবে সকল নাগরিকের। একটি সামাজিক চুক্তি হবে নাগরিকদের মধ্যে, যে চুক্তি মিডিয়াকে স্বায়ত্তশাসন দিবে। সংসদকে সত্যিকারের নীতি প্রণয়নের জায়গায় পরিণত করবে। স্বাধীন বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠা করবে। প্রতিষ্ঠিত হবে একটি চমত্কার নির্বাচন কমিশন, যে কমিশন সুষ্ঠু নির্বাচনকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিবে।
লেখাটি শেষ করছি মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান মাজিনাকে দিয়ে। ২ দিন আগে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের মাস্টার্সের ছাত্র-ছাত্রীদের উদ্দেশে ড্যান মাজিনা আমেরিকার গণতন্ত্রের মূল্যবোধের উপর একটি বক্তৃতা দেন। রাষ্ট্রদূতের ভাষায় আমেরিকার গণতন্ত্রের প্রধান মূল্যবোধ হলো সেখানে নির্বাচনে পরাজিত প্রার্থী আন্তরিকভাবেই জয়ী প্রার্থীকে অভিনন্দন জানাতে পারেন। তাদের গণতন্ত্র হলো সরকারের জবাবদিহিতা ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সহনশীলতার গণতন্ত্র। বাংলাদেশে সংলাপ হতে হবে শাসন বিভাগের প্রধানের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে। সংলাপ হতে হবে অসহনশীল রাজনীতি পরিত্যাগের প্রতিজ্ঞায়।
অনেকেই বলবেন গণতন্ত্র আমদনি- রপ্তানির বিষয় নয়। সত্যিই নয়। কিন্তু মনে রাখতে হবে গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠিত মূল্যবোধগুলো এড়িয়ে যাওয়া যাবে না। পশ্চিমা গণতন্ত্রকে গ্রহণ করার সময় যোগ-বিয়োগ করা যাবে; কিন্তু সম্পূর্ণ নতুন কিছু দিলে তা হয়তো অরুন্ধতী রায়ের গণতন্ত্রের পরের জীবন হবে; কিন্তু গণতন্ত্র হবে না। তাই সংলাপ চাই। অবশ্যই চাই। কিন্তু শুধু সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য পাঁচ বছর অন্তর অন্তর সংলাপ চাই না। সংলাপ চাই সামগ্রিক গণতন্ত্রায়ণের জন্য। যে ব্যবস্থায় নাগরিকদের ন্যূনতম আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক অধিকার ও কল্যাণ নিশ্চিত হবে। অন্যথায় রবি ঠাকুরের ‘কূজনহীন কাননভূমি’তে তোমরা ‘একলা চলোরে’। তবে রাজনীতিবিদদের বলি ‘হে একা সখা, হে প্রিয়তম/রয়েছে খোলা এ ঘর মম/সমুখ দিয়ে স্বপনসম/ যেয়ো না মোরে হেলায় ঠেলে।’
লেখক :শিক্ষক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
