সাংবাদিক ও রাজনীতিক নির্মল সেন

আপডেট : ০৯ জানুয়ারি ২০১৩, ২০:৫৮
কোটালীপাড়া হিন্দু অধ্যুষিত এলাকা। ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে, হিন্দু-মুসলমানদের মধ্যে কোন দাঙ্গা হয়নি, তবুও ঘর-বাড়ি ও সহায়-সম্পদ পানির দামে বিক্রি করে অনেকেই পাড়ি জমালেন কলকাতা। অনেকে রাতের অন্ধকারে সীমান্ত পাড়ি দিলেন। সেন, গাঙ্গুলি ও বন্দ্যোপাধ্যায়রাও বসে থাকলেন না। তারাও ধনী সাহাদের সাথে ঠাঁই নিলেন পশ্চিমবঙ্গে। কোটালীপাড়ার দীঘির পাড়ের লাবণ্যপ্রভা সেন স্বামীর হাত ধরে চলে গেলেন কলকাতার আসানসোলে। স্বামী সুরেন্দ্রনাথ সেন ৪৭-র দেশবিভক্তি চাননি, কিন্তু সবাই যে যায় ...। লাবণ্যপ্রভা স্বামীর সাথে চলে গেলেন ঠিকই, কিন্তু তার কিশোর ছেলেটি কিন্তু যেতে রাজি হলো না। মা-বাবার বাড়ি ছাড়ার পর সেই কিশোর ছেলেটি চলে এলো বরিশালের পিসিমার বাড়ি কলসাকাঠিতে। ৪৭ থেকে ১৯৭২ সাল, সুদীর্ঘ ২৫ বছর। এই ২৫ বছরে ঐ কিশোর ছেলেটির জীবনে নানা ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু তার জন্মদাত্রী মাকে কোনদিন দেখা হয়নি। পাসপোর্ট দেয়নি পাকিস্তান কর্তৃপক্ষ। তাদের কাছে তিনি তখন সন্দেহজনক ব্যক্তি। একাত্তরে দ্বি-জাতিতত্ত্বের পাকিস্তান ভাঙলো, তখন ঐ ছেলেটি দেশের নামজাদা সাহসী সাংবাদিক ও রাজনীতিক। ১৯৭২ সালের ৩ জানুয়ারি ২৫ বছর পর লাবণ্যপ্রভা সেনের বুকে ফিরে গেলেন ছেলেটি। এ যেন নির্মলেন্দু গুণের ‘হুলিয়া’ কবিতার মতো। সেদিন ছেলেটিকে কাছে পেয়ে লাবণ্যপ্রভা সেন দেশ ভাঙার দুঃখ ভুলে গিয়েছিলেন। এই লাবণ্যপ্রভা সেন হলেন প্রখ্যাত সাংবাদিক ও রাজনীতিক নির্মল সেনের মা। নির্মল সেনের বড় পরিচয় সাংবাদিক হলেও শৈশব-কৈশোর থেকেই ছিলেন রাজনীতি সচেতন। সাংবাদিকতার পাশাপাশি তিনি প্রত্যক্ষভাবে সাধারণ মানুষের রাজনীতি করেছেন, দল গঠন করেছেন এবং নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। সারাজীবন কৃষক-শ্রমিক মেহনতি মানুষের অধিকার আদায়ে আন্দোলন করেছেন। তার রাজনৈতিক সংগঠনটির নাম শ্রমিক কৃষক সমাজবাদী দল। প্রথম জীবনে তিনি ছিলেন বিপ্লবী সমাজতান্ত্রিক দলের সদস্য। এক সময় বামপন্থি প্রগতিশীল দলগুলোর মোর্চা গঠনে ভূমিকা রাখেন। ‘তার দলের ভেতরে ও বাইরে সবার কাছে তিনি রাজনীতি ও সাংবাদিকতা— উভয় ক্ষেত্রে তার নৈতিক মূল্যবোধের জন্য সমভাবে নন্দিত ও প্রশংসিত।’ রাজনীতির পাশাপাশি তিনি সাংবাদিকতার পেশা বেছে নিয়েছিলেন আদর্শগত কারণে। পরম নিষ্ঠার সঙ্গে সে দায়িত্ব পালন করেছেন। অসাধুতা কখনো তার কলমকে স্পর্শ করতে পারেনি। নীতি ও আদর্শ থেকে তিনি কখনো বিচ্যুত হননি। সারাজীবন ছিলেন অন্যায়-অবিচার ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে এবং সাহসিক ও নির্ভীক। ‘অনিকেত’ এই ছদ্মনামে দৈনিক বাংলায় কলাম লিখে খ্যাতি অর্জন করেন। তার একটি কলাম ‘স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি চাই’ বিপুল জনপ্রিয়তা লাভ করেছিলো। ১৯৭০ খ্রিস্টাব্দে দক্ষিণবঙ্গে গোর্কিতে স্বজনহারাদের নিয়ে প্রতিদিনের লেখাগুলো ঐ সময় মানুষের হূদয়ে ভিষণভাবে দাগ কাটে এবং সাধারণ পাঠকের কাছে সুপরিচিত হয়ে ওঠেন। সংবাদ জগতের প্রতিটি মানুষের কাছে ছিলেন তিনি ‘নির্মলদা’। নির্মল সেন গোপালগঞ্জ জেলার কোটালীপাড়া উপজেলাধীন দীঘির পাড় গ্রামে ১৯৩০ সালের ৩ আগস্ট জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম সুরেন্দ্রনাথ সেন ও মায়ের নাম লাবণ্যপ্রভা সেন। তারা ছিলেন ব্রাহ্মণ গোত্রীয়। নির্মল সেন শৈশব-কৈশোরে লেখাপড়া করেন টুঙ্গিপাড়ায় শেখদের প্রতিষ্ঠিত জিটি স্কুলে। পরে বরিশালের (বাকেরগঞ্জ) কলসকাঠি বিএন একাডেমী থেকে প্রবেশিকা, ব্রজমোহন কলেজ থেকে আই এ ও বিএ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে প্রাইভেট পরীক্ষা দিয়ে এম.এ ডিগ্রী লাভ করেন। বরিশালে পড়াশোনার সময় তার সাংবাদিকতায় হাতেখড়ি। দলীয় সাপ্তাহিক কলকাতা থেকে প্রকাশিত গণবার্তায় খবর প্রেরণ করে যাত্রা শুরু। ১৯৫৯ সালে দৈনিক ইত্তেফাকে চাকরি গ্রহণ। ১৯৬৩ সালে দৈনিক জেহাদে যোগদান। পরে আওয়ামী লীগ নেতা হাবিবুর রহমানের সাপ্তাহিক সোনার বাংলায় যোগদান। পত্রিকাটির প্রথম ও প্রধান সম্পাদক ছিলেন আব্দুল গাফফার চৌধুরী। পরে ১৯৬৪ সালে দৈনিক পাকিস্তান বের হলে সিফট ইন-চার্জ হিসেবে যোগদান করেন। পত্রিকাটি বন্ধ হবার পূর্ব পর্যন্ত তিনি ঐ পত্রিকার সহকারী সম্পাদক ছিলেন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে নির্মল সেনের ছিল সু-সম্পর্ক। বঙ্গবন্ধু তাকে সেন মশাই বলে সম্বোধন করতেন। জনগণের প্রতি প্রগাঢ় ভালোবাসা এবং সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতিই মানুষের মুক্তি—এই আদর্শকে জীবনচর্যায় যুক্ত রেখেছেন নির্মল সেন। কৃষক-শ্রমিক মেহনতি মানুষের প্রতি ছিল তার অসীম দরদ। বাংলাদেশ তথা মাতৃভূমিকে তিনি প্রাণ দিয়ে ভালোবাসতেন। জন্মদাত্রী কলকাতা চলে গেলেও তিনি মাতৃভূমির টানে থেকে গেছেন। মাতৃভূমিকে তিনি মা ভাবতেন। তিনি ছিলেন সত্ মানুষ। তার আদর্শ প্রজন্মকে পথ দেখাবে এবং তিনি আমাদের কাছে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন। বিশিষ্ট সাংবাদিক ও রাজনীতিক নির্মল সেন ৮ জানুয়ারি ২০১৩ তারিখে পরলোকগমন করেন।  লেখক : সাংবাদিক

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন