[ আলোকপাত ]

মহাজোটের চার বছর :অর্জন-বিসর্জনের খেরো খাতা

আপডেট : ১১ জানুয়ারি ২০১৩, ১৯:৪২
মহাজোট সরকারের চার বছরের অর্জন-বিসর্জন নিয়ে হরেক রকমের কথাবার্তা চলছে বাংলাদেশে। সাধারণভাবে যা দেখা যায় তা হচ্ছে অর্জনের আংকিক হিসাব। বস্তু যোগ বস্তুতে উন্নতির পরিমাপ। অবকাঠামোর ক্ষেত্রে এটি অনেক সময়েই সত্য। যাপিত জীবনের ক্ষেত্রেও সত্য হতে পারে। ভোগী সমাজে আংকিক হিসাবই একমাত্র হিসাব। বাজার অর্থনীতি বিশ্বব্যাপী একটি পরিমাপ দণ্ড তৈরি করে দিয়েছে। যা বোধজগতের দৃষ্টিভঙ্গিও পাল্টে দিয়েছে। উন্নয়ন হয়েছে কি হয়নি তা বোঝানোর জন্যে এক সময়ে মাথাপিছু আয়ের হিসেব দেয়া-নেয়া হয়েছে। কিন্তু মাথাপিছু আয় যে কত বড় প্রতারণার হিসেব তা মানুষ এখন বুঝে গেছে। এখন সবাই মিলে ঠিক করেছে মাথাপিছু আয়ের হিসেব থাকবে, তবে মানব উন্নয়ন সূচককে গুরুত্ব দিতে হবে। অনেক পরে মানুষেরা বুঝবে মানব উন্নয়ন সূচক ও উত্কৃষ্ট মাত্রার প্রতারণা। প্রকৃত উন্নয়ন তখনই সংঘটিত হবে যখন মানুষের মনুষত্বের স্বাভাবিক বিকাশ উন্নত স্তরে পৌঁছাবে। এই হিসেবটার কোন পরিমাপ দণ্ড নেই। কেউ করেনি। সম্ভবত স্বল্প সময়ের মধ্যে তা হবেও না। সাধারণভাবে বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক ভাবসাব ভাল। মহামন্দায় দিন কাটাচ্ছে বিশ্ব। বিশ্বব্যাপী ত্রাহি মধুসূদন অবস্থা। কোন দেশ আর্তনাদ গোপন রেখেছে। আর কোন দেশের আর্তনাদ খাঁচাছাড়া হয়ে গেছে। ধনী দেশগুলোও দেউলিয়াত্ব ঠেকাতে পরস্পরের পিঠ চুলকিয়েছে। এখনও তাদের চুলকুনি মেটেনি। নষ্টামি কমেনি। বিশ্বব্যাপী যুদ্ধাস্ত্র বেচে তারা আর্থিক জগত্ বাঁচাচ্ছে। এই রকম করুণ কঠিন সময়ে বাংলাদেশ মুখ থুবড়ে পড়েনি। মহামন্দার প্রথম দিকে আশংকা করা গিয়েছিল, গরীব দেশগুলোতে বিশেষ করে বাংলাদেশে দুর্ভিক্ষ লাগবে। আফ্রিকার কোন কোন দেশে দুর্ভিক্ষ ঠিকই লেগেছে। কিন্তু বাংলাদেশে দুর্ভিক্ষ লাগেনি। ভয় পাওয়া গিয়েছিল তৈরি পোশাক শিল্পে মড়ক লাগবে। ধাক্কা ঠিকই লেগেছে। কিন্তু তৈরি পোশাক শিল্প মরেনি। যতদূর আশা করা হয়েছিল ততদূর না হলেও এ খাতে উপার্জন খুব একটা কম হয়নি। বাংলাদেশ ব্যাংক মাঝে-মাঝেই রিজার্ভের কথা বলে বাহবা নেয়। এটিও মিথ্যে নয়। সবচেয়ে বড় কথা কৃষিতে বিপর্যয় নেমে আসেনি। কৃষি বাংলাদেশকে ভয় না দেখিয়ে স্বপ্ন দেখাচ্ছে। আগামীতে হয়ত কৃষিতে আরো অনেক শুভ চমক আসবে। শিক্ষাখাতে উন্নয়ন চোখে পড়ার মত। পরিসংখ্যান ত তাই বলে। কিন্তু শিক্ষানীতির আধুনিকায়ন এখনও বাকী। সংবিধান বিরোধী নানামুখী বিকৃত শিক্ষা এখনও চালু আছে। এ বিষয়ে কঠোর হতে সরকার ভয় পাচ্ছে। তা বেশ বোঝা যায়। নতুন একটি শিল্প মুক্ত দিগন্তের হাতছানি দিচ্ছে। জাহাজ শিল্প যে এত সাহসিকতা দেখাবে তা দশ বারো বছর আগেও ভাবা যায়নি। প্রমোদ বিষয়ক শিল্পে পয়সা ব্যয় না করে জাহাজ শিল্পে বিনিয়োগ বাড়ালে সরকারের আরো সুনাম হবে। হাতিরঝিল যেমন উপহার হয়েছে তেমনি একটি জাহাজ জাতির জন্যে একটি উপহার হিসেবে গণ্য হতে পারে। জাহাজ তো নৌকারই প্রতিরূপ। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোট সরকারের বড় অর্জন দুর্ভিক্ষ ঠেকিয়ে দেয়া। আর বড় বদনাম পদ্মাসেতু। ব্যাংক কেলেঙ্কারির টাকা-পয়সা হয়ত উদ্ধার করা যাবে এবং চোর ছ্যাচ্চোরদেরকেও হয়ত সাজা দেয়া যাবে। কিন্তু পদ্মাসেতুর কলঙ্ক সহজে মোছা যাবে না। পদ্মাসেতুতে যে ষড়যন্ত্র হয়েছে তাতে উন্নত বিশ্বের লোকজনও জড়িত। পদ্মাসেতুতে টাকা না দেয়ার ফন্দি ফিকির করেছে বিশ্বব্যাংক। যাদেরকে চোর সাজানো হয়েছে, তারা মরে গেলেও দুর্নীতি সহজে মরবে না। যদি কল্পনা করা যায় যে, ভবিষ্যতে পদ্মাসেতুতে বিশ্বব্যাংক টাকা দিয়েছে তবে এটাও ধরে নিতে হবে যে ঐ ক্ষেত্রেও উচ্চ মাত্রার কোন না কোন দুর্নীতি সংঘটিত হতে পারে, আবার নাও হতে পারে। বিশ্বব্যাংক যে নিয়মে টাকা দেয় তাতে মধ্যস্বত্ব ভোগীরা দুর্নীতির মাধ্যমে কামাই করার সুযোগ পায়। তবে আমার মনে হয় সহজে বিশ্বব্যাংকের টাকা আসবে না। পদ্মাসেতুর ঋণ পাওয়া না গেলেও ব্যালান্স অব পেমেন্টের ঋণ পাওয়া গেছে। পত্র-পত্রিকাতে এটি খুব বেশি প্রচারিত হয়নি। এই ঋণের ক্ষতিকর দিক যে কত ক্ষতিকারক তা কাউকে বলা হয়নি, বিশ্বের ইতিহাসের বিস্ময় হয়ে থাকবে এই ব্যালান্স অব পেমেন্টের ঋণ। যা হবার তা হয়েছে। এই ভুল যেন বার বার না হয় সেদিকে খেয়াল রাখলেই চলবে। বেখেয়ালে বড় ভুল হলে জাতির সাথে বেইমানী করা হবে। পদ্মাসেতুর ঋণ নেয়ার দরকার নেই। সেতুই করার দরকার নেই। তার পরিবর্তে মনোরম সুশোভিত ঘাট বানিয়ে অসংখ্য ছোট বড় মাঝারি ফেরি চলাচল করিয়ে যানবাহনের গতিশীলতা বাড়িয়ে দেয়া যেতে পারে। যদি ঐ সব ফেরি বাংলাদেশে তৈরি করা যায় তবে আরো ভাল হয়। তাছাড়া দক্ষিণ বঙ্গের সাথে যোগাযোগ বাড়ানোর জন্যে ছোট ছোট জাহাজ সমুদ্র থেকে বুড়িগঙ্গা পর্যন্ত যাতায়াত করাতে পারলেও সেতুর প্রয়োজনীয়তা থাকবে না। দেশীয় অর্থায়নে ঘাট ও ফেরির ব্যবস্থা করা খুবই সম্ভব। গোয়ালন্দে রেল লাইন তো আছেই। এদিকে একটা রেল সেতু করলেই হয়। রেল সেতু এত মজবুত হয় যে তার ওপর দিয়ে ফ্লাইওভার মার্কা হালকা গাড়ির সেতু বানানো যায়। ফেরির ব্যবস্থা অব্যাহত থাকবে। এভাবে ঋণ ভরসা অনেকখানি কমানো যায়। অর্জন বিসর্জনের হিসেবে শেখ হাসিনার অর্জনের পাল্লাই ভারী আবার কিছু ক্ষেত্রে বিসর্জনের পাল্লাই ভারী। কিন্তু রাজনৈতিক পরিস্থিতি ভাল যাচ্ছে না। অনেকটা বুদ্ধির ভুলেই এই পরিস্থিতির মধ্যে পড়তে হলো। যথাসময়ে নির্বাচন দিতে পারলে পরিস্থিতির উদ্ভব হতো না। কিন্তু তা করা হয়নি। যা হয়নি তা নিয়ে মায়াকান্না করে লাভ নেই। এই পরিস্থিতিতেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ও স্বপক্ষে আনার চেষ্টা করতেই হবে। মহাজোটের ভাবমূর্তি মারাত্মক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। হলমার্ক কেলেঙ্কারি যেমন, বিশ্বজিত্ হত্যা তেমন। মন্ত্রীদের দুর্নীতি এর সাথে যোগ হয়েছে। এত কিছুর পরও মহাজোটের বিশাল অর্জন আছে। যা ঠিকমত কাজে লাগাতে পারলে সামনের নির্বাচনে উতরে যাওয়া যাবে। তা হচ্ছে যুদ্ধাপরাধীর বিচার। অভাব তো বাংলাদেশে আছেই। তার ওপরে কারোর কারোর স্বভাবও খারাপ। নতুন প্রজন্মের কাছে এটি গা সওয়া হয়ে গেছে। কিন্তু তারা উদ্দিপিত হয়েছে একটি বিশেষ কারণে। যুদ্ধাপরাধীর বিচার তাদের মনোজগতে মারাত্মক প্রভাব বিস্তার করেছে। এযাবত্কাল, তারা মুক্তিযুদ্ধের বিকৃত এবং মিথ্যে ইতিহাস পড়ে এসেছে। মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর-পরই বঙ্গবন্ধুর হত্যার বিচারের একটা ফলাফল পাওয়া গেছে। সাথে তারা দেখছে যুদ্ধাপরাধীর বিচার। তারা আশায় আছে— অদূর ভবিষ্যতে একটা রায় পাওয়া যাবে। এই আশার পেছনে আছে বিশিষ্ট চেতনা। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, সেকুলারিজমের চেতনা। আশ্চর্য ফল ফলেছে, তরুণ-প্রজন্মের চেতনায়। যারা দ্বিধান্বিত ছিল, তাদের দ্বিধার নিরসন হয়েছে। সৃষ্টিশীল স্রোতের মত ঐ ‘চৈতন্য’ একজন থেকে অন্যজনে প্রবাহিত হচ্ছে। সত্যি বলতে কি, মুক্তিযুদ্ধের এবং সেকুলারিজমের নবচেতনার সৃষ্টিই মহাজোট সরকারের বিশেষ সাফল্য। তা ঐ যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কাজ শুরু না করলে সৃষ্টি হত না। সকল নাম বদনাম ছাপিয়ে উঠেছে জাতীয় মুক্তির চেতনা। এখন নতুন প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর অবদান অনুভব করতে শুরু করেছে। তারা অন্তর্ঘাতীদের সম্পর্কেও বুঝতে শুরু করেছে। সাধারণভাবে উন্নয়ন কিংবা অগ্রগতিকে যেভাবে দেখা হয়, চেতনার প্রাগ্রসারতাকে সেভাবে দেখা হয় না। দেখার সুযোগও নেই। বিভিন্ন পরিমাপে বিভিন্ন রকম ফলাফল আসে এ ধরনের চৈতন্য পরিমাপের। বিস্তার কতখানি হয়েছে তা মনে হয় আওয়ামী লীগ মেপে দেখেনি। তবে এর সুফল ঠিকই ভোগ করছে। বিশাল তরুণ প্রজন্ম সমর্থন দিয়ে এবং পুরানো বৈরীদেরকে চাপের মধ্যে রেখে তারা আওয়ামী লীগকে বড় রকমের উপকার করেছে। যদিও এই তরুণ প্রজন্মের সবাই আওয়ামী সমর্থক নয়। যুদ্ধাপরাধীর বিচার নিয়ে নিয়মিত প্রকাশিত হয়েছে নানান কিসিমের মতামত। পক্ষে কিংবা বিপক্ষে যাই ছাপা হোক না কেন, সেখানে যুদ্ধাপরাধ, মানবতা বিরোধী অপরাধ কথাটা থাকছেই। যে সব ‘টকশো’ হয়েছে, সেখানেও পক্ষে হোক বিপক্ষে হোক, যুদ্ধাপরাধ কিংবা মানবতা বিরোধী অপরাধ কথাটা উচ্চারিত হয়েছে। এতেই সুফল ফলেছে। তরুণ প্রজন্ম উত্সাহিত হয়ে নিজ দায়িত্বে তথ্য তালাশ করেছে এবং সমৃদ্ধ হয়েছে। তারা বিচারের পরিণতি দেখতে চায়। তাই সকল দোষগুণের ঊর্ধ্বে উঠে আওয়ামী নেতৃত্বাধীন মহাজোটকেই আবার ক্ষমতায় পেতে চায়। গত চার বছরে মনে হয় এই চৈতন্যের বিকাশই আওয়ামী লীগের শ্রেষ্ঠ অর্জন। তবে সন্দেহ হয়, আওয়ামী লীগ এই অর্জনকে কাজে লাগাতে পারবে কিনা? বরাবরের মত এবারও আওয়ামী লীগ তার অর্জনের ফসল ঘরে তুলতে নাও পারে। গতবারে শেখ হাসিনার অর্জন ছিল প্রণিধানযোগ্য। কৃষিক্ষেত্রে সাফল্য ছিল ঐতিহাসিক। বাংলাদেশ হওয়ার পর থেকেই অভাব তাড়া করে ফিরছিল জাতিকে, সাধারণ মানুষকে। অভাব এমন লাগাতার ছিল যে, শ্রেণীপাপীরা আকাল, মঙ্গা, দুর্ভিক্ষকে স্বাভাবিক হিসেবে প্রচার করে তাদের শ্রেণীশোষণের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর থেকে পাপীতাপীরা প্রচার করেই চলছিল যত কষ্ট সবই আওয়ামী লীগের জন্য। কিন্তু সেই অর্জনের সুফল আওয়ামী লীগ ঘরে তুলতে পারেনি। এবারও তাই হতে পারে। জনগণ তাদের গদিছাড়া করছে না, ভেবে যদি তারা লাগাম ছেড়ে দেয়, কথার ও দুষ্টুদের তবে এবারের অর্জনকেও সময়মত হারাতে পারে। এই চার বছরে কোন দুর্ভিক্ষের ঘটনা ঘটেনি। আকাল নেই ,মঙ্গা আসেনি। আর এজন্য সবাই শেখ হাসিনাকে ধন্য ধন্য করছে। নিন্দুকের মুখে ছাই দিয়ে তিনি সাধারণ মানুষের কাছাকাছি যেতে পারছেন অনায়াসে। এটিও খুব বড় মাপের অর্জন। এই দুটি অর্জনই ঐতিহাসিক। আগামী প্রজন্ম যখন ইতিহাস লিখবে তখন তাদেরকে শেখ হাসিনার সোনালী সময়ের কথা লিখতে হবে। তবে দুর্ভাবনা একটাই। আওয়ামী লীগ তার অর্জনের ফসল ঘরে তুলতে পারবে কি-না? না কি বরাবরের মত এবারও আত্মপ্রশোদে নিমগ্ন থাকবে, আর লাগাম ছেড়ে দুষ্টু চক্রের পার্টির অভ্যন্তরের কিংবা বাইরের? ভয় হয় আওয়ামী নেতৃত্বাধীন মহাজোট সম্প্রসারিত না হয়ে বিলীন হয়ে যাবে। মহাজোট না থাকলে আওয়ামী লীগের একার পক্ষে লড়াই করে জেতা কি সম্ভব হবে? তার ওপরে তথাকথিত সুশীল সমাজ কাছাখুলে নেমে পড়েছে মাঠে। কাদের ইন্ধনে যে তারা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির বিরোধিতা করছে তা বোঝা যায় না। এত কিছুর পরও আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিক ক্ষমতা হাতে রাখতে হবে, নইলে কারো ঘাড়েই মাথা থাকবে না। কামনা করি, আমার আশংকা যেন সত্যি না হয়। লেখক : শিক্ষক, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন