বাংলাদেশের মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় সক্ষমতা আনতে হবে

আপডেট : ১১ জানুয়ারি ২০১৩, ১৯:৪৩
মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের চাহিদা পূরণের নিমিত্তে শুরু হয় দ্রব্য বিনিময় প্রথা অর্থাত্ কেনা-বেচা, যা অর্থনীতির ভাষায় লেনদেন। লেনদেন শুরুর সাথে সাথে প্রয়োজন দেখা দেয় দ্রব্য বিনিময়ের মাধ্যমের। দ্রব্যের বিনিময়ে দ্রব্য দিয়ে শুরু হয়ে বর্তমানে “অর্থাত্” সে জায়গায় স্থির। লেনদেনের পরিধির বিস্তৃতি ঘটায় লেনদেন এখন বিশ্বব্যাপী। লেনদেনের সংখ্যা এবং পরিধি বৃদ্ধি পাওয়ায় অর্থকে নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে, সৃষ্টি হয়েছে বিশেষায়িত ব্যাংক, যাকে একটি দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলা হয়। অর্থাত্ প্রত্যেক দেশে অর্থ ব্যবস্থাপনার জন্য সৃষ্টি হয়েছে একটি করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বাংলাদেশে যা “বাংলাদেশ ব্যাংক”। মানবতার উন্নয়নের সাথে সাথে সমাজ ব্যবস্থায় দেখা দিচ্ছে বহু্বিধ সমস্যা; তার সাথে যোগ হয়েছে রাজনৈতিক অস্থিরতা, বিশেষ করে আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে ক্ষমতারোহণের খেলা। ক্ষমতার সাথে অর্থের সম্পর্ক এবং অর্থের প্রধান উত্স হচ্ছে ব্যবসা অর্থাত্ লেনদেন। অর্থাত্ রাজনীতি অর্থনীতির উপর প্রত্যক্ষভাবে নির্ভরশীল। উন্নয়নশীল দেশে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার চাহিদা যে কোন কিছুকে হার মানায়, যেখানে ক্ষেত্রবিশেষে মানবতাও লোপ পায়। আভ্যন্তরীণ অর্থ বাজার নিয়ন্ত্রণের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক ছয় মাসভিত্তিক পলিসি নিয়ে থাকে, যা “মনিটরি পলিসি স্টেটমেন্ট” নামে অভিহিত। অর্থবছর (এফওয়াই) ২০১২-১৩-এর জুলাই-ডিসেম্বর স্টেটমেন্টকে “এফওয়াই-১৩” নামে বলা হয়েছে। উক্ত পলিসির উদ্দেশ্য উল্লেখ করা হয়েছে (১) দেশের মুদ্রাস্ফীতিকে সহনশীল পর্যায়ে রাখা এবং (২) সরকারের উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় সহায়ক ভূমিকা পালন করা। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কাজ ৮০০ মার্কিন ডলারের কম পার ক্যাপিটা জাতীয় আয়ের একটি দেশের অথনৈতিক উন্নয়নে সরকারের সহায়ক হিসাবে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা। দেশের অর্থ বাজার নিয়ন্ত্রণের জন্য বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনেকগুলো কাজের মধ্যে একটি কাজ হচ্ছে মানি লন্ডারিং নিয়ন্ত্রণ। বাংলাদেশের প্রায় ১৬ কোটি মানুষের এক- তৃতীয়াংশ মানুষ তার প্রয়োজনীয় খাদ্য ক্রয়ে অক্ষম, প্রায় অর্ধেক মানুষ অশিক্ষিত, যার একটি বড় অংশ বেকার। বার্ষিক জিডিপি বৃদ্ধির নাম হতে হবে বেকারের কর্মসংস্থান। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের কার্যক্রম দেখে মনে হয় না এদেশে কোন বেকার আছে, অর্থনীতির জন্য কোন সহায়ক সংস্থার প্রয়োজন আছে। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বেশ কয়টি দুঃখজনক ঘটনা ঘটেছে অল্প কয়দিনের মধ্যে। নাম উল্লেখ করার প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। তবে শেয়ার মার্কেট কেলেংকারির কথা উল্লেখ না করলেই নয়। কারণ এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল পঁচিশ লক্ষ ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী এবং তাদের উপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নির্ভরশীল প্রায় এক কোটি মানুষ । আমাদের দৃষ্টিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের দায়িত্বহীনতা ছিল একটি বড় কারণ। একই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ ব্যাংক আরও একটি পদক্ষেপ নিয়েছে, যা প্রশ্নবিদ্ধ। শেয়ার মার্কেটে বিনিয়োগ লোকসান সমন্বয়ের জন্য ইতিপূর্বে শতভাগ সমন্বয়ের নির্দেশ ছিল। অবস্থা বিবেচনায় অনেক ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী বেশি ক্ষতির ভয়ে হয়ত তার শেয়ার অল্প ক্ষতিতে বিক্রি করে দিয়েছিল। কিন্তু একটি ব্যাংক বছরের শেষ কর্মদিবসে বাংলাদেশ ব্যাংক সে নির্দেশ পরিবর্তন করে সংশোধনী দিয়েছে শত ভাগের পরিবর্তে ২০% সংরক্ষণের জন্য। অবশ্য সংশোধনীর দায়-দায়িত্ব দরখাস্তকারীর উপর অর্পণ করেছে। এভাবে সময়-অসময়ে সার্কুলারের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের ফলে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অনেকের মতে এমনিভাবে সমাজে রক্তক্ষরণের দায় বাংলাদেশ ব্যাংকের উপর বর্তানোর সুযোগ বর্তমান। বর্তমান বিশ্বে মানি লন্ডারিং একটি সমস্যা। আমাদের মতো গরিব দেশেও। তবে এই সমস্যা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য এখনও এত মহাপ্রকট আকার ধারণ করেনি, যার জন্য দেশে-বিদেশে সভা- সমাবেশ বা রোডশো-এর মতো কাজ করে সময় এবং অর্থের অপচয় করতে হবে। আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষ এখনও ব্যক্তি পর্যায়ে তিন ডিজিটের অংক ব্যবহার করে বৈদেশিক লেনদেনে। আমি অবশ্যই শতভাগ নিয়মের পক্ষে। কয়েকটি দেশ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা দিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণে সরকারি পর্যায়ের সংশ্লিষ্টতার মাত্রা নিয়ে মতামত উল্লেখ করতে চাই। আমাদের জানামতে বিশ্বের সকল দেশেই মানি লন্ডারিং আইন প্রচলিত। তবে সিংগাপুর, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, ভারত এবং সৌদি আরবে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবসা দেখে আমার কোন অবস্থায়ই মনে হয়নি যে, সে দেশে মানি লন্ডারিং আইন নিয়ে সরকার এত উদ্বিগ্ন বা বিচলিত। আমাদের দেশে ৫,০০০ মার্কিন ডলার পর্যন্ত ক্যাশ লেনদেন করা যায় বা হচ্ছে। এখন প্রশ্ন, দিনের শেষে পাঁচ হাজার করে একাধিক লেনদেনের শেষে ডলারের যে পরিমাণ দাঁড়াবে তা নিয়ন্ত্রণের আইন কতটুকু কার্যকরী? আমাদের দেশের কথা বাদ দিলেও সিংগাপুরসহ বিশ্বের অনেক দেশ আছে যাদের বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনে দৈনিক ক্যাশ ডলারের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য। মনে হয় না ঐসব দেশ আমাদের বাংলাদেশ ব্যাংকের মতো রোড শো করে থাকে। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক একটি সার্কুলারে “Stock market-related institutions should carry out an independent audit to evaluate the effectiveness of the steps taken for checking money laundering and terror financing.” এভাবে দেশের সকল ইনস্টিটিউটকে জড়িয়ে আমাদের মতো গরিব দেশে মানি লন্ডারিং আইন বাস্তবায়নের পদক্ষেপ কী শুভ ফল বয়ে আনবে? রাষ্ট্রের সকল ব্যক্তি, সংস্থা আলাদা আলাদাভাবে নিজের স্বার্থে পদক্ষেপ নিতে পারে বা নেয়ার চেষ্টা করতে পারে। রাষ্ট্রের কাজ সবার কাজের সমন্বয়ের মাধ্যমে জাতীয় উন্নয়নমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করা। বাংলাদেশ সরকারের কর্মকাণ্ড দেখে মনে হয় বৈদেশিক মুদ্রায় ঋণের বড় বেশি প্রয়োজন। Capital Market Development- এর নামে Asian Development Bank থেকে ঋণ নিচ্ছে ৩০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যার অর্ধেক ইতিমধ্যে ছাড় হয়েছে ১৫টি এ্যাকশান প্ল্যানের আওতায়। সম্প্রতি আমাদের অর্থমন্ত্রী সাংবাদিকদের সাথে এক আলোচনায় উল্লেখ করেন যে, “Donors have agreed on the planned limit of exposure of banks to the capital market and our gradual adjustment scheme to be implemented in a span of three years.”। উক্ত মন্তব্য থেকে এ্যাকশান প্ল্যান বা Asian Development Bank-এর মতো ঋণদাতার গুরুত্ব এবং সরকারের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে ধারণা করা খুবই সহজ। সরকার আবার মাঝে-মধ্যে বলে থাকেন দেশের অর্থনীতিতে ক্যাপিটাল মার্কেটের কোন ভূমিকা নেই। আমাদের সকল কর্মকাণ্ড হতে হবে বাংলাদেশের অর্থনীতির স্বার্থে। চিন্তা করতে হবে দেশীয় সমস্যা সমাধানের জন্য। এই বিশ্বায়নের যুগে সময় নষ্ট মানে আত্মহত্যা। আমাদের ১৬ কোটি মানুষের দেশ, জাতীয় সম্পদ বলতে মানবসম্পদই প্রধান, যার অধিকাংশ গরিব এবং অশিক্ষিত। মানবতার সেবায় বাংলাদেশের মানুষকে শিক্ষিত করার পদক্ষেপ গ্রহণের দায়িত্ব সরকারের। সময়ে- অসময়ে প্রয়োজনের তাগিদে অপ্রাসঙ্গিক পদক্ষেপ গ্রহণে সময়ক্ষেপণ হবে মাত্র, উন্নয়নের দ্বারপ্রান্তেও পৌঁছা যাবে না। তর্কের খাতিরে যুক্তি দিয়ে বলা যাবে উন্নতির, জিডিপি বৃদ্ধির। জনগণের মঙ্গলের কাজের কাজ থেকে যাবে আলোচনায়। এভাবে আর কত সময় নষ্ট হবে বাংলাদেশের? বাংলাদেশের সার্বিক অর্থনৈতিক উন্নতি আমাদের সবার কাজ। যার যার অবস্থান থেকে যদি আমরা সবাই শতভাগ দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে পারি তাহলে দেশের অধিকাংশ মানুষকে শিক্ষিত করে সাহায্যের হাতকে কর্মীর হাতে পরিণত করতে বেশি সময় লাগবে না। মনে রাখতে হবে রক্ত দিয়ে দেশকে স্বাধীন করেছি সাহায্য চাওয়ার জন্য নয়, সাহায্য করার জন্য।  লেখক : এফসিএ akc¦bol-online.com