যেতে যেতে পথে পথে

ছাত্রপুত্রকন্যা পাখিপড়া কেউ পড়ে না

আপডেট : ১১ জানুয়ারি ২০১৩, ২০:২৮
:আপনার পরিচয় কী? শ্রমজীবনের পরিচয়? :শ্রমজীবনের পরিচয় যদি বলেন, আমি বলি, সবার আগে সবার পরে এবং সবার ওপরে যারা মানুষ এবং যারা মানবসন্তানপদবাচ্য হয়ে বেঁচে থাকতে চান, তারা সবাই শ্রমিক। আমিও সেই সারিতে, আমিও সেই সরণিতে, আমিও আমার মাপে আমার সোপানে আমার বীক্ষণে একজন শ্রমিক। তবে, যে শ্রম থেকে আমার তণ্ডুলকণা আসে, তেমন তিনটি উল্লেখযোগ্য শ্রমজীবন আছে আমার। পুষ্টিকর্মী, চিনিশ্রমিক ও সমাজকর্মী। এই পরিচয় আমার সর্বশেষ তিনটি শ্রমজীবনের পরিচয়। :তার আগের শ্রমজীবনগুলোর কথা কি আপনার মনে আছে? :আছে। আমার স্মৃতিশক্তি খুব মজবুত নয়। তবু আমার শ্রমজীবনের কোন ধাপের কথাই আমি ভুলিনি। শুরুতে ছিলাম আমি শিক্ষাশ্রমিক। পরে, পুষ্টিকর্মীর ধাপটি ছোঁয়ার আগে আমি ছিলাম তথ্যশ্রমিক, শিক্ষাশ্রমিক, স্বাস্থ্যশ্রমিক, রেলশ্রমিক, সড়কশ্রমিক পূর্তশ্রমিক, বাণিজ্যশ্রমিক, সেতুশ্রমিক এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান শ্রমিক। :নিজেকে আপনি শ্রমিক বলুন আর যা কিছু মানুন, আপনাকে আজ আমি অনেক প্রশ্ন করবো। প্রশ্নে প্রশ্নে থকথকিয়ে দেবো আপনাকে। :প্রশ্নের জবাব আমি ভালো দিতে পারি না। তবু বলুন, কোন কোন বিষয়ে প্রশ্ন করে আপনি আমাকে বিপদে ফেলতে চান। :আমি আপনার আনন্দের কথা শুনবো, বেদনার কথা শুনবো, ক্রোধের কথা শুনবো, স্বপ্নের কথা শুনবো, সম্ভাবনার কথা শুনবো। :আমার আনন্দের কথা, বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দর ও সম্ভাবনাময় দেশে আমার জন্ম এবং এ দেশের পবিত্র হাওয়া বাতাসে আমি এখনও শ্বাস নিচ্ছি, প্রতিদিন আমি ভালোভাবে ঘুমুতে পারছি, সুস্থ অবস্থায় ঘুম থেকে উঠতে পারছি, ক্ষিধের মুখে লোহা খেয়ে লোহা হজম করতে পারছি, প্রতিদিন সকাল বিকেল দুপুর যাই পাতে পাচ্ছি, তাতেই রাজভোগ দেখছি। নিজের পরিধেয়কে সংসারের সর্বসুন্দর পোশাক মানছি। :আপনিতো শিক্ষকতাও করেন। :করি। করার চেষ্টা করি। কাজটা খুব কঠিন। :বিষয়টায়তো আপনার আগ্রহ আছে। :আছে। আগ্রহও আছে, প্রয়োজনও আছে। :শিক্ষকতার এই জীবনে এমন কোন ঘটনা যদি থাকে বলুন, যা আপনি আপনার শিক্ষার্থীদের বলে আনন্দ পান। বার বার বলতে চান। :আমি বলতে চাই, রবীন্দ্র পক্ষপুটে আশ্রয় নিয়েই বলতে চাই—মানুষ প্রথমবার জন্মগ্রহণ করে নিজের জন্য, পরে মানুষের জন্য। আমি তাদের মানুষের জন্য বার বার জন্মগ্রহণ করতে বলি—নব নব আলোকে, নব নব বোধিতে, জীর্ণ জীর্ণ আঁঁটি সব কেটে কেটে। আমি তাদের সেই কথাটিই মনে করিয়ে দিই—‘পশুপক্ষী সহজেই পশুপক্ষী, তরুলতা সহজেই তরুলতা, মানুষ, অনেক চেষ্টার পরে সে মানুষ।’ বলি, সংসারে মানুষই একমাত্র প্রাণী, যাকে তার নামের প্রতি সুবিচার করার জন্য আবার জন্মগ্রহণ করতে হয়। বার বার জন্মগ্রহণ করতে হয়। তাই আমরা অনুবর্তী প্রজন্মের সদস্যদের মাথায় হাত দিয়ে বলি-বাবা তুই মানুষ হ, মা তুই মানুষ হ, ভাই তুই মানুষ হ, বোন তুই মানুষ হ। এদের আমি মানুষ পথে ও মানব হওয়ার পথে ডাকি, কারণ ব্যবস্থাপত্রের ইতিহাস হাতে তুলে দিয়ে ও মৌলবাদের দীক্ষা ও কুশিক্ষা মাথায় ঢুকিয়ে একটি প্রজন্মকে হতভাগ্য করে তোলা ও জাতীয় জীবনের অগ্রগতির ধারা থেকে বিলুপ্ত করে দেয়া হয়েছে। :তাহলে আপনি বলতে চাচ্ছেন, এসব হওয়ার কথা ছিল না, কিন্তু হয়ে গেছে। :হ্যাঁ আমি তাই বলতে চাচ্ছি। আমি এসব কথা আমার বর্তমান বয়সের আদ্ধেক ধরে বলে চলছি, বলছি ও বলতে থাকবো। চিত্কারে’ চিত্কারে গলা ফাটিয়ে। এক সময় মনে হতো, এই চিত্কার আমাকে ‘মরতে দম তক’ করতে হবে। এখন দেখছি, তার প্রয়োজন হবে না। আমাদের ছাত্রদের আমাদের পুত্রদের আমাদের কন্যাদের এবং আমাদের ভ্রাতা ও ভগিনীদের অত সহজেই আর ধৌতমস্তিষ্ক করা যাচ্ছে না। তারা নষ্ট ও ভ্রষ্ট লোকেদের উক্তির কার্যকারণ সম্পর্ক বোঝে। :এমন কেন হচ্ছে বলে আপনি মনে করেন? :খুব পুরনো কারণ। খুব সিম্পল কারণ। কিছু মানুষকে আপনি অনেক দিনের জন্য অথবা অনেক মানুষকে আপনি কিছুদিনের জন্য বোকা বানিয়ে রাখতে পারেন। কিন্তু, সব মানুষকে আপনি অনেক দিনের জন্য বোকা বানিয়ে রাখতে পারবেন না। তারা অসত্যের প্রাকার ফুঁড়ে বেরিয়ে আসবে এবং সত্যকে ঢুঁড়ে নেবে। নেবে এবং নেবেই নেবে। লেখক : শ্রমজীবী সাহিত্যিক

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন