বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধের দুঃসংবাদ কাম্য নহে

আপডেট : ১১ জানুয়ারি ২০১৩, ২০:২৯
অবেশেষে রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হইয়াছে। উপাচার্যের অপসারণের দাবিতে গত এক সপ্তাহ ধরিয়াই ক্যাম্পাসের পরিস্থিতি উত্তপ্ত হইয়া উঠিয়াছিল। সর্বশেষ অঘটন হইল, বৃহস্পতিবার সকালে আন্দোলনরত শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের উপর বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের ব্যানারে বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস উপলক্ষে আয়োজিত একটি সভা হইতে হামলা চালানো হয়। তাহারা আন্দোলনরত শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের অবস্থান-ধর্মঘট বানচাল করিতে ব্যানার ছিনাইয়া লইয়া সমাবেশে ব্যবহূত মাইক, ব্যাটারি ও এপ্লিফায়ার ভাঙচুর এবং কয়েকজন শিক্ষককে লাঞ্ছিত করে। ছাত্র-ক্যাডার ও শিক্ষকদের মধ্যে ধস্তাধস্তিকালে মাইকের ব্যাটারি হইতে অ্যাসিড ছিটকাইয়া আন্দোলনরত দুই শিক্ষকের চোখের আশপাশের কিছু অংশ ঝলসাইয়াও যায়। বর্তমানে তাহারা রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিত্সাধীন। আন্দোলনকারীরা অভিযোগ করিতেছেন যে, ছাত্রলীগের নাম লইয়া হামলাকারীরা হাতবোমা বিস্ফোরণের পাশাপাশি অ্যাসিডও ছুঁড়িয়াছে। ইহার প্রতিবাদ জানাইতে তাহারা অনশনে বসিলে সন্ধ্যায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সকল প্রকার মিছিল, সমাবেশ, ধর্মঘট, মানববন্ধন এবং অনশন কর্মসূচির উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। উক্ত ঘৃতাহুতিতে আন্দোলন আরও জোরদার হইয়া উঠিলে অতঃপর রাত্রে একাডেমিক কাউন্সিলের সভা ডাকিয়া অনির্দিষ্টকালের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়টি বন্ধের সিদ্ধান্ত ঘোষিত হয়। নূতন এই বিশ্ববিদ্যালয়টিতে এখনও শিক্ষা কার্যক্রম পুরাদমে চলিতেই শুরু করে নাই। শিক্ষক, কর্মচারি ইত্যাদি জনবলের অভাব, গ্রন্থাগার, ছাত্রাবাস, গবেষণাগার, পাঠদানের ভবন ও কক্ষ, পরিবহন ইত্যাদি অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এমনিতেই শিক্ষার পরিবেশ বিঘ্নিত করিতেছে। আর অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং পদ সৃষ্টি ও নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে ভাগবাটোয়ারা লইয়াই বারবার সংঘাতের পরিবেশ সৃষ্টি হইতেছে। মাত্র চার বত্সরেই নানা অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ উঠিয়াছে এবং বিশ্ববিদ্যালয়টি ক্রমাগত সংবাদ শিরোনাম হইয়া চলিয়াছে। এইসব অনিয়ম-দুর্নীতির সুষ্ঠু তদন্ত, স্বজনপ্রীতিসহ নানা সমস্যা সমাধান এবং উপাচার্যের পদত্যাগের দাবিতে গত শনিবার হইতে ‘সচেতন শিক্ষক সমাজ’ ব্যানারে উপাচার্যের কার্যালয়ের সম্মুখে মঞ্চ করিয়া কর্মসূচি চালাইতেছিল শিক্ষকদের একাংশ; ‘সম্মিলিত ছাত্রসমাজ’ ব্যানারে শিক্ষার্থীরাও তাহাদের সঙ্গে যোগ দিয়াছিল। ফলে, বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল কার্যক্রম কার্যত অচল হইয়াই পড়িয়াছিল। আর আন্দোলনকারীদের কর্মসূচি বানচাল করিতে গত বৃহস্পতিবার বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস উপলক্ষ করিয়া উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে উপাচার্যের সমর্থকেরা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগ ব্যানার ব্যবহার করিয়া একই স্থানে মঞ্চ বানাইয়া অনুষ্ঠান শুরু করে এবং আন্দোলনকারীদের উপর হামলা চালায়। এই হামলাই পরিস্থিতির অবনতি ঘটিবার প্রত্যক্ষ কারণ হইয়া দাঁড়ায়। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আরেকটু সহনশীল হইলে হয়তো অনির্দিষ্টকালের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করিবার মতো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়ানো যাইতো। এই জানুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহেই ভাইস চ্যান্সেলরের ‘স্বৈরাচারী’ আচরণের প্রতিবাদে বিক্ষোভরত ছাত্রদের আন্দোলনের মুখে চট্টগ্রাম বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এক সপ্তাহের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হইয়াছে। আর দ্বিতীয় সপ্তাহ না-গড়াইতেই উত্তরাঞ্চলের উচ্চশিক্ষার্থীদের জন্য প্রতিষ্ঠিত দ্বিতীয় স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়টি অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হইল। বিগত বত্সরের প্রায় পুরাটা সময় জুড়িয়া স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে অস্থিতিশীলতা বিরাজ করিয়াছে এবং শিক্ষা ও গবেষণার পরিবেশ বিঘ্নিত হইয়াছে। ক্ষমতার ও স্বার্থের ভাগবাটোয়া লইয়াই মূলত শিক্ষকদের বিভিন্ন দল এবং ক্যাম্পাসের নিয়ন্ত্রণ ধরিয়া রাখিতে সরকারি দলের ছাত্র সংগঠনের বিভিন্ন উপদল নিজেদের মধ্যে কিংবা অন্যান্য ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে সংঘাতে লিপ্ত হইয়া অস্থিতিশীলতা তৈরি করিয়াছে। নূতন বত্সরের শুরুটাও হইল সেই দুঃখজনক ধারাবাহিকতায়। জনগণের অর্থে পরিচালিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে জ্ঞানচর্চার প্রতিকূল পরিবেশ কাহারও কাম্য হইতে পারে না। প্রধানমন্ত্রী দেশব্যাপী ২৬ হাজার প্রথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণের ঘোষণা দিয়াছেন মাত্র দুই দিন আগে। শিক্ষাক্ষেত্রে বিপ্লব ঘটাইবার মতো এইরূপ সুসংবাদের পাশে বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করিয়া দেওয়ার মতো দুঃসংবাদ আমরা আর দেখিতে চাহি না।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন