ভাল বা মন্দ যে অর্থেই বিশ্লেষণ করি না কেন, ওয়ান ইলেভেনের ঘটনা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি টার্নিং পয়েন্ট। এ ধরনের আরো কয়েকটি টার্নিং পয়েন্ট আছে। যেমন- ’৭৫ পূর্ব ও পরের রাজনীতি এক নয়। আবার ’৯০ থেকে ২০০৭ ও তার পরবর্তী রাজনীতির মধ্যেও তফাত আছে। এই তফাতগুলো এখন ক্রমশ বড় দাগে স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
গত শুক্রবার পালিত হলো বহু নিন্দিত ও সমালোচিত ওয়ান ইলেভেনের ষষ্ঠ বর্ষপূর্তি। সরকারি দল বিভিন্ন আলোচনাসভার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও ১৮ দলীয় বিরোধী জোটের কালোপতাকা মিছিল ছিল লক্ষণীয়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে এ সম্পর্কে বলেন, ‘সেদিন যারা মাইনাস টু ফর্মুলা প্রবর্তন করতে চেয়েছিল, তারা এখনো সক্রিয়। মাঝে-মধ্যেই মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে চাইছে।’ তবে যারা ওয়ান ইলেভেনের লোক বলে পরিচিত বা সে সময়ে কোন না কোনভাবে ভূমিকা রেখেছেন টকশোতে তাদের বডি ল্যাংগুয়েজই বলে দেয় যে, তারা শরীরে জোস ও জোর পাচ্ছেন। অতীতে কেউ কেউ এমনও বলেছেন যে, সামনেরবার টু-টোয়েন্টি টু আসবে। এ কথা ভেবে কেউ যদি মনে করেন, এবার রাজনীতির মাঠে ক্রিকেট খেলা হবে, তাহলে ভুল হবে। এটা টি-টোয়েন্টি নয়, ডাবল ওয়ান ইলেভেন। আসবে আগের চেয়ে দ্বিগুণ শক্তি নিয়ে।
আমরা বলি কান টানলেই মাথা আসে। আর ওয়ান ইলেভেন তথা সামরিক বা সামরিক সমর্থিত সরকারের প্রসঙ্গ এলে রাজনীতিবিদদের চরিত্র হননের কথা পাড়া হবে না, তা হতে পারে না। যেহেতু মহাজোট সরকার মেয়াদের শেষ বছরে এসে পড়েছে, তাই এখনই সময়। তাই কেউ কেউ গোঁফে তেল মাখছেন বলে মনে হয়। চুলে পাক ধরলে কালার করছেন। টাইয়ের নট ঠিক করছেন আর হয়তো ভাবছেন সাদা পায়জামা-পাঞ্জাবিঅলাদের দিন শেষ। মুজিব কোট ও সাফারির জায়গা নেই। প্রধান দুই দলের সংস্কারপন্থিরাও আবার নড়েচড়ে বসছেন বলে খবর বেরুচ্ছে। ওয়ান ইলেভেনের সময় বলা হয়েছিল যে, প্রতিবেশী মিয়ানমার পারলে আমরা পারবো না কেন? আমরা কম কিসে? আহমেদ-উদ্দিনরা যুগ যুগ ক্ষমতায় থাকবেন ইত্যাদি। কিন্তু বছর না যেতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শরীরচর্চা কেন্দ্রের মাঠে আমরা এমন এক ঘটনা ঘটতে দেখলাম, যারপর মিয়ানমারের দৃষ্টান্ত তুলে ধরা বন্ধ হয়ে গেল।
কয়লা যায় না ধুলে, স্বভাব যায় না মলে। যারা ভোটে দাঁড়ালে বারবার জামানত হারাবেন, তারা রাজনীতিবিদদের দোষ ছাড়া আর কিইবা দেখবেন। বলতে গেলে এটাই তাদের বড় পুঁজি। পাকিস্তান জামানা থেকেই আমরা একই কৌশল দেখে আসছি। এক খেলা মানুষ আর দেখবে! আইয়ুব খান-ইসকান্দার মির্জার সময় থেকেই বলা হচ্ছে-পলিটিসিয়ানরা চোর। তাহলে সাধু কারা? সরকারে গেলে শেষ পর্যন্ত ক্লিন ইমেজদেরও দেখা যায় ভাবমূর্তির অভাব। কোন কোন ক্ষেত্রে শুধু ভাবই থাকে, মূর্তি থাকে না। প্রতিবারই তারা কিছুদিন চমক সৃষ্টি করেন। যেমন-ওয়ান ইলেভেনের সময় দুদকের গানটির নাচন অনেকেরই স্মরণে আছে। অল্প সময়ের ব্যবধানে দেশের জনপ্রিয় ও শীর্ষস্থানীয় রাজনীতিবিদ এবং প্রতিষ্ঠিত ও নামি-দামি ব্যবসায়ীদের গ্রেফতারে কেউ কেউ ঘোরের মধ্যে পড়ে যান। কিন্তু সেই ঘোর কাটতে সময় লাগেনি। অরাজনৈতিক ও অনির্বাচিত ব্যক্তিরা ক্ষমতায় এসে দেশের অর্থনীতির বারোটা না চব্বিশটা বাজিয়ে যান। রাতারাতি মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যায়। তৃণমূলেরও ব্যাপক সংখ্যক মানুষ জীবিকা ও রুটি-রোজগার হারিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হন।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট একটি বড় ঘটনা। এদিন স্বাধীনতার মহান নায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। এই মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের পর মাসখানেক নাটক চলল। এরপর একজন উর্দিপরা নেতার আগমন ঘটল। তিনি ইয়েস-নো ভোটের আয়োজন করলেন। তারপর দল গঠন করলেন, নির্বাচন করলেন। ১৯৮১ সালে এসে তাঁকেও হত্যা করা হলো। কী তাঁর অপরাধ ছিল? পরের বছর আরেকজন জেনারেল ক্ষমতায় এলেন। নয় বছর দেশ চালালেন। তাকে হত্যা করা হলো না বটে, তবে টেনে-হেঁচড়ে ও অপবাদ দিয়ে নামানো হলো। সেদিন কারা তাকে প্রত্যাখ্যান করলেন? আরব বসন্ত থেকে শুরু করে ইতিহাসের এমন কোন অভ্যুত্থান নেই, যেখানে নেপথ্যের শক্তি কলকাঠি না নাড়ে।
কথা হলো যারা রাজনীতিবিদদের কথায় কথায় ও উঠতে-বসতে সমালোচনা করেন, তারা ভোটে দাঁড়ালে লাল্লু-পাঞ্জুর কাছেও হেরে যান। কথায় বলে, God makes man and tailor makes gentleman. গণতন্ত্রের কথা বইয়ে আছে, একে বাস্তবে রূপ দেন ও ফুলে-ফলে সুশোভিত করেন রাজনীতিবিদরাই। তাছাড়া জনগণের মাঝ থেকে উত্থিত হন বলে শাসন করার যোগ্যতাও তারা রাখেন। অশিক্ষিত-অর্ধশিক্ষিত যারা ঠিকমত টাই-মোজা পরতে পারেন না, সেসব রাজনীতিবিদেরই শেষ পর্যন্ত দরকার হয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, ‘যাদের তুমি করেছো অপমান, অপমানে হতে হবে তাদের সমান’। যাদের গায়ে কালিমা লেপন করা হয়, দেখা যায় এক সময় সরকার থেকে শান্তিপূর্ণভাবে প্রস্থানের জন্য তাদেরই আবার হাতে-পায়ে ধরতে হয়।
রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে এসব লোকের অভিযোগ কি? তারা গমচোর, টিনচোর, শীর্ষ দুর্নীতিবাজ ইত্যাদি। তারা কোথায় দুর্নীতি করেন? আইয়ুব খানের অভিযোগ ছিল তারা দুর্নীতি করে বাড়ি বানিয়েছেন। বাড়ি বানানোর অভিযোগ এখনও করা হয়। তার সাথে যোগ হয়েছে আয়ের অসামঞ্জস্য, ইনকাম ট্যাক্স ফাঁকি বা টাকা পাচার প্রভৃতি। বাপে বাড়ি না রেখে গেলে বাড়ি তো করতেই হবে। মৌলিক অধিকার হিসেবে এক্ষেত্রে রাষ্ট্রেরও দায়িত্ব আছে। বাড়ি বা প্লট অনেকেই নেন। ইনকাম ট্যাক্স ফাঁকি অনেকেই দেন। টাকা পাচারও করেন অনেকে। কিন্তু একটা বিশেষ সময়ে সব দোষ নন্দঘোষের ন্যায় কেবল রাজনীতিবিদদের উপরেই চাপে। এর মধ্যে বিরাজনীতিকরণের উদ্দেশ্যই যে প্রধান, তাতে কোন সন্দেহ নেই।
রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে আরেকটি অভিযোগ হলো, তারা ঠিকমত সংসদে যান না। সংসদে তাদের দিক-নির্দেশনাহীন আলোচনায় কত কর্মঘণ্টা অপচয় হয় ও জাতীয়ভাবে কত টাকা গচ্চা যায় তার চুলচেরা হিসেবও করেন কেউ কেউ। যদিও সরকারি ও বিরোধী দলের অংশগ্রহণে সংসদীয় কমিটিগুলো ঠিকই সক্রিয় থাকে। উঁচু গলায় এসব কথা যারা বলেন, তাদেরই আবার কারো কারো কাজেকর্মে দায়িত্বহীনতার পরিচয় পাওয়া যায়। এমন অভিযোগও রয়েছে যে, মক্কেলদের নিকট থেকে টাকা নেয়ার পরও তারা কোর্ট-কাছারিতে যান না, মামলার সময় উপস্থিত থাকেন না। এরকম দায়িত্বহীনতা আসলে সব পেশাতেই আছে। কিন্তু একটা বিশেষ মুহূর্তে অভিযোগের অঙুলি কেবল রাজনীতিবিদদের দিকেই যায়। তাদের এভাবে হেয় করার এই অসুস্থ মানসিকতা কেন? যারা বর্তমানে ওয়ান ইলেভেনের মুখপাত্রের ন্যায় কথাবার্তা বলছেন, তাদের মনে রাখা উচিত তৃতীয় বিশ্বে মহাশক্তিধররা কাউকে একবারের জায়গায় দু’বার ব্যবহার করেন না। তাদের গোস্বার কারণে মুহূর্তের মধ্যে চাকরি চলে যায়। তখন রুমাল দিয়ে কপাল মুছতে মুছতে বেরিয়ে যাওয়া ছাড়া কোন গত্যন্তর থাকে না। তাই সীমাবদ্ধতার ব্যাপারে সকলের সচেতন থাকা দরকার।
ভারতে এত দুর্নীতি ও পার্লামেন্টে এত হট্টগোল পরিস্থিতি বিরাজ করার পরও সেখানে রাজনীতিবিদদের শাসন ছাড়া অন্যকিছু কেউ ভাবতে পারেন না। কেননা সেখানে গণতন্ত্র চর্চার ধারাবাহিকতা আছে। নির্বাচনী প্রক্রিয়া ব্যাহত করার কারও ক্ষমতা নেই। নির্বাচন কমিশনসহ গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোও শক্তিশালী। আর যারা উপর থেকে নাজিল হন, তাদের ভোটের জন্য জনগণের কাছে যেতে হয় না, কোন জবাবদিহিতাও করতে হয় না। ব্রিটেনে পাঁচশ’ বছর ধরে গণতন্ত্র বহাল আছে। তারপরও সেখানকার পার্লামেন্টে হাতাহাতি হয়। আর আমাদের এখানে কিছু হলেই গেল গেল বলে রব ওঠে। গণতন্ত্র, সুষ্ঠু নির্বাচন, আইনের শাসন, মানবাধিকার ইত্যাদি থাকলে অবশ্যই পরিস্থিতির উন্নতি হবে। কিন্তু মাথাব্যথার জন্য যারা মাথা কাটার প্রেসক্রিপশন দেন, তাদের মতো জ্ঞানপাপী দ্বিতীয়টি আর নেই। পৃথিবীর রাজনৈতিক ইতিহাসে রাজনীতিবিদদেরই স্থান আগে। হিটলার-মুসোলিনির দেশেও তাদের এতটা অপমান করা হয় বলে আমার জানা নেই।
আমাদের দুই নেত্রীর খুব বড় ডিগ্রি নেই। তারপরও মানুষ তাদেরকেই ভোট দেয়। হাসিনা-খালেদা ছাড়া আর কিছু বোঝে বলে মনে হয় না। ব্যালট পেপারে শুধু ধানের শীষ ও নৌকা খোঁজে। এমন নয় যে, এর বিকল্প নেই। লাঙ্গল, সাইকেল, দাঁড়িপাল্লা, কলসি, ছাতা কত কি আছে! অথচ তারাই অন্যদের বোঝান, আচ্ছা, নৌকা ও ধানের শীষের সাথে মিলেমিশে থাকলে ভাল হয় না? এজন্যই জোট-মহাজোট হয়। এই বাস্তবতায় কিভাবে রাজনীতিবিদদের দোষারোপ করা যায়? কিভাবে বলা যায়, আমরা দুই নেত্রীর কাছে জিম্মি? যারা উড়ে এসে জুড়ে বসতে চান তাদের এ থেকে শিক্ষা নেয়া উচিত।
রাজনীতিতে এখন এক ধরনের সংকট চলছে। কিন্তু এই সংকট কিসের? আদর্শের নয় কি? কাকে কোন জোট থেকে তাড়াতে হবে, নির্মূল করতে হবে এই হচ্ছে পয়লা টার্গেট। ফলে প্রধান দুই দলেই উদারপন্থি ও গণতন্ত্রপ্রেমীরা বিপদে আছেন। চরমপন্থিদের যন্ত্রণায় উভয় দল ক্ষমতাহীন থাকতে ভয় পাচ্ছে। আর এই সুযোগে কেউ কেউ লাফাচ্ছেন। তবে বাংলাদেশ ভেতরে ভেতরে ঠিকই বদলে যাচ্ছে। এখন পৃথিবীর এমন কোন দেশ নেই যেখানে আমরা নেই। আমাদের প্রবাসীরা উন্নত বিশ্বের ধ্যান-ধারণা নিয়ে বেড়ে উঠছেন। দেশে ফেরার পর তাদের চাল-চলন, আচার-আচরণ ও স্বপ্ন দেখার মধ্যে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। তারা বদলাতে পারলে বাংলাদেশের রাজনীতিও একদিন বদলাবে নিশ্চয়ই। এজন্য রাজনীতি ও রাজনীতিবিদদের ওপর বিশ্বাস হারানো চলে না। প্রকৃতপক্ষে রাষ্ট্র ও সমাজের হাল ধরে রাখতে জনপ্রতিনিধিদের কোন বিকল্প নেই।
লেখক : সাংবাদিক
e-mail : [email protected]
