পাকিস্তানে বোমা হামলা

আপডেট : ১২ জানুয়ারি ২০১৩, ২১:৩৫
সন্ত্রাস পাকিস্তানের যেন পিছু ছাড়িতেছে না। তাহারা এখনও বোমার সঙ্গে বসবাস করিতেছেন। সেখানকার অবস্থার কোন উন্নতি দেখা যাইতেছে না। যেমন গত বৃহস্পতিবার পাকিস্তানের দুইটি শহরে পৃথক পৃথক বোমা হামলায় সর্বশেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত দেড় শতাধিক মানুষ নিহত হইয়াছেন। আহত হইয়াছেন দুই শতাধিক। বিরোধপূর্ণ প্রদেশ বেলুচিস্তানের রাজধানী কোয়েটার একটি সকার ক্লাবে বোমা বিস্ফোরিত হইলে ব্যাপক হতাহতের ঘটনা ঘটে। তাহাদের অধিকাংশই হাজরা শিয়া সম্প্রদায়। তাহার ১০ মিনিট পর ক্লাবের বাহিরে গাড়ি বোমা হামলায় অনেক পুলিশ, গণমাধ্যম ও উদ্ধারকর্মী হতাহত হন। অন্যদিকে এই শহরেরই বাচা খান চক এলাকায় আরেকটি বোমা হামলায় নিহত হন আরও অনেকে। ইহাছাড়া বহুল আলোচিত সোয়াতের মিংগোরা শহরের উপকণ্ঠে একটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের বাহিরে এক বিস্ফোরণের ঘটনায় অন্তত ২১ জন নিহত হন। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রভাবশালী ও পরমাণু শক্তিধর দেশ পাকিস্তান গত এক দশক ধরিয়াই গভীর সংকটে নিপতিত। একুশ শতকের প্রারম্ভে ২০০১ সালে আমেরিকার টুইন টাওয়ারে সন্ত্রাসী হামলার পর ইরাক ও আফগানিস্তানের ন্যায় পাকিস্তানেরও কপাল পোড়ে। আফগানিস্তানে বহুজাতিক বাহিনীর আক্রমণের পর সোভিয়েত বিরোধী লড়াইয়ে আমেরিকার এক সময়ের পরম মিত্র তালেবানদের অনেকে পালাইয়া পাকিস্তানের সোয়াত প্রদেশের পার্বত্যাঞ্চলে আশ্রয় গ্রহণ করে। সেই প্রেক্ষিতেই এই অঞ্চলে শুরু হয় আমেরিকার ড্রোন বিমান হামলা। ইহাতে শুধু লড়াইকারী তালেবানরাই নিহত হইতেছে না, অনেক বেসামরিক লোকজনেরও প্রাণাতিপাত ঘটিতেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সহিত মৈত্রিতার বন্ধনে আবদ্ধের কারণে পাকিস্তান সরকারও তালেবানদের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযানে নামে। এক সময় সেনাবাহিনীর অভিযানে সোয়াতের গ্রামের পর গ্রাম লোকশূন্য হইয়া পড়ে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে উদ্বাস্তু সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করে। অন্যদিকে আঞ্চলিক রাজনীতির কৌশলগত কারণে আফগানিস্তানের অনেক ঘটনাবলীর সহিত পাকিস্তান, ভারত ও ইরানসহ বিভিন্ন দেশ জড়িত বলিয়া অভিযোগ রহিয়াছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হইতেছে এক সুদীর্ঘ লড়াইয়ে অবতীর্ণ তাহারা। বেলুচিস্তানে বিচ্ছিন্নতাবাদীরা যথেষ্ট সক্রিয়। বেলুচিস্তানের অবস্থা শেষপর্যন্ত বাংলাদেশের ন্যায় হইতে পারে এবং তাহারা পাকিস্তান হইতে বিচ্ছিন্ন হইয়া ভারত, ইরান প্রভৃতি দেশের সাহায্যে স্বাধীনতা লাভ করিতে পারে এমন ভবিষ্যদ্বাণীও কেহ কেহ করিতেছেন। বলাবাহুল্য, এই আশংকাও কাজ করিয়া যাইতেছে সাধারণ পাকিস্তানিদের মধ্যে। দীর্ঘমেয়াদি সামরিক ও স্বৈরশাসনের হয়তো ইহাই পরিণাম। তাহারা এখন ঘরে-বাহিরে উভয় দিক হইতে বিপদের সম্মুখীন। তাই কাশ্মির সীমান্তে ভারত-পাকিস্তানের সৈন্য নিহত হওয়ার উপর্যুপরি ঘটনার পরই বেলুচিস্তানের শিয়ারা আক্রমণের শিকার হইয়াছেন। এই দুই ঘটনার মধ্যে কোন যোগসূত্র থাকিলেও থাকিতে পারে। যুদ্ধ-বিগ্রহ, বিবাদ-বিসম্বাদ, অন্তর্দ্বন্দ্ব-কোন্দল যে কারণেই মানুষের অস্বাভাবিক মৃত্যু হউক না কেন, তাহা খুবই দুঃখজনক। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাতিসংঘ গঠন ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের অগ্রযাত্রার মাধ্যমে ধারণা করা হইয়াছিল যে, এইবার পৃথিবীতে শান্তির বাতাবরণ বহিবে। কিন্তু নিরাপত্তা পরিষদের অগণতান্ত্রিক আচরণ ও মনোভাব-মনবৃত্তির কারণে প্রকৃত শান্তি আসিতেছে না। সহবস্থান তৈরি হইতেছে না এবং সকল দেশ ও জাতির প্রতি জাগ্রত হইতেছে না সঠিক শ্রদ্ধাবোধ। উদীয়মান শক্তিগুলিও ভুল শিক্ষা নিয়া অগ্রসর হইতেছে বলিয়া প্রতীয়মান হয়। এমতাবস্থায় পাকিস্তানসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে প্রতিদিন সংঘাত-সংঘর্ষে যে হারে নিরাপরাধ মানুষের প্রাণ যাইতেছে, তাহাতে গভীর শোক প্রকাশ ছাড়া আমাদের আর কি-ইবা করার আছে। পাকিস্তানের সাম্প্রতিক এই ঘটনায় আমরা শোকাহত।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন