এ অসুস্থ প্রতিযোগিতা বন্ধ করা প্রয়োজন

আপডেট : ১২ জানুয়ারি ২০১৩, ২১:৩৬
গত ২৭শে ডিসেম্বর প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী ও ইবতেদায়ি শিক্ষা সমাপনী এবং জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি) ও জুনিয়র দাখিল সার্টিফিকেট (জেডিসি) পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হলো। প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী পরীক্ষার্থীদের মধ্যে ছেলে ছিল ১১ লাখ ২৫ হাজার ৮৩৪ জন আর মেয়ে ছিল ১৩ লাখ ৫৫ হাজার ২৮৫ জন। অর্থাত্ ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের সংখ্যা ছিল ২০.৩৮ শতাংশ বেশি। এ পরীক্ষায় উত্তীর্ণের মধ্যে ছেলে ছিল ৪৫.৪৬ শতাংশ আর মেয়ে ছিল ৫৪.৫৪ শতাংশ। ফলে ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের এ হারও ১৯.৯৭ শতাংশ বেশি। জেএসসি ও জেডিসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী পরীক্ষার্থীদের মধ্যেও ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের সংখ্যা অনেকটাই বেশি। অভিভাবকগণের মাঝে সচেতনতা বৃদ্ধি পাওয়ায় আগের তুলনায় মেয়েদের সংখ্যা বিদ্যালয়ে বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু তাই বলে ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের সংখ্যা এতো বেশি হয়ে যাবে ? ভুটানের জন্য হলে এ পরিসংখ্যান মেনে নেয়া যেত। সেখানে মেয়েদের সংখ্যা ছেলেদের তুলনায় অনেক বেশি। বাংলাদেশে তো পুরুষের সংখ্যাটাই বরং মহিলাদের চেয়ে সামান্য বেশি। ২০১১ সালের আদমশুমারির তথ্য অনুযায়ী দেশে ৫০.০১ শতাংশ পুরুষ আর ৪৯.৯৯ শতাংশ মহিলা। তাহলে পাবলিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী পরীক্ষার্থীদের মধ্যে মেয়েদের সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বেশি হওয়ার কারণ কী ? কোন কারণে মেয়েদের সংখ্যা কিছুটা বেশি হতে পারে। কিন্তু পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী মেয়েদের সংখ্যার শতকরা হারের এই অস্বাভাবিক বৃদ্ধি প্রমাণ করে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করার আগেই মেয়েদের তুলনায় ছেলেদের ঝরে পড়ার হার অনেক বেশি নতুবা অনেক ছেলেরা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দরজায় পা রাখে না। তাতে তো বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষার মূল উদ্দেশ্যটাই ব্যাহত হয়। ২০০৯ সাল থেকে শুরু হওয়া প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষায় পাসের হার কেবলই ঊর্ধ্বমুখী। ২০০৯, ২০১০, ২০১১ ও ২০১২ সালে উক্ত পরীক্ষায় পাসের হার যথাক্রমে ৮৮.৮৪ শতাংশ, ৯২.৩৪ শতাংশ, ৯৭.২৬ শতাংশ ও ৯৭.৩৫ শতাংশ। বরিশাল বিভাগে সর্বশেষ পাসের হার (৯৯.১৯ শতাংশ) অবাক করার মতো। পাসের হারের এ ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা বজায় থাকলে অচিরেই তা শতভাগে উন্নীত হবে। তারপর হয়তো জিপিএ-৫ প্রাপ্তির হার শতভাগে না হোক তার কাছাকাছি নেয়ার প্রচেষ্টা শুরু হবে। ইতোমধ্যে জিপিএ-৫ প্রাপ্তির হার অনেকটাই এগিয়ে গেছে। ২০১২ সালের প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষায় জিপিএ-৫ প্রাপ্তদের সংখ্যা ২০১১ সালের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। শুধু প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষায় নয়, সকল পাবলিক পরীক্ষায় পাসের হার ও জিপিএ-৫প্রাপ্তদের সংখ্যা অতি দ্রুত বাড়ছে কিন্তু মোটেই বাড়ছে না শিক্ষার গুণগত মান। গ্রেডিং পদ্ধতিতে এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল সর্বপ্রথম দেয়া হয় ২০০৩ সালে। সে বছর এইচএসসি পরীক্ষায় পাসের হার ছিল ৩৮.৪৩ শতাংশ, জিপিএ-৫ পেয়েছিল মাত্র ২০জন— বর্তমান এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলের সাথে যার কোন তুলনাই হয় না। কম সময়ে পরীক্ষার রেজাল্ট দেয়ার ব্যবস্থা করায় মাসখানেক সময় বেঁচে যায়। কিন্তু পরীক্ষকদের পক্ষে সঠিকভাবে উত্তরপত্র মূল্যায়ন সম্ভব হয় না। অবশ্য সঠিকভাবে উত্তরপত্র মূল্যায়নের বিষয়টি এখন আর গুরুত্বপূর্ণ কিছু নয়। যাচ্ছেতাইভাবে খাতা দেখা হচ্ছে। বোর্ডগুলো নম্বর বাড়িয়ে দেয়ার পক্ষে। পাসের হার নিয়ে বোর্ডগুলোর মাঝে প্রতিযোগিতা চলছে। যে প্রতিযোগিতা ছাত্র-ছাত্রী বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে থাকার কথা সে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত শিক্ষাবোর্ডগুলো। মূল্যায়নের জন্য উত্তরপত্র প্রদানের সময় প্রদত্ত পরীক্ষকদের প্রতি শিক্ষাবোর্ডের লিখিত নির্দেশাবলিতে যাই থাকুক না কেন মৌখিক নির্দেশাবলী পাসের হার বৃদ্ধির সহায়ক। বোর্ডের এসব নির্দেশাবলী পরীক্ষকদের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হচ্ছে এবং পাস করার যোগ্য নয় এমন অনেকে পাস করে যাচ্ছে। বোর্ডের নির্দেশ অনুযায়ী উদারভাবে খাতা দেখায় জিপিএ-৫ পাওয়ার যোগ্য নয় এমন অনেকে জিপিএ-৫ পেয়ে যাচ্ছে। ফলে প্রকৃত মেধাবী ছাত্র কিংবা প্রকৃতপক্ষেই জিপিএ-৫ পাওয়ার যোগ্য এমন ছাত্র-ছাত্রীদের সনাক্ত করা যাচ্ছে না। যেহেতু কোন পাবলিক পরীক্ষায় প্রাপ্ত জিপিএ-এর ভিত্তিতে পরবর্তী শ্রেণিতে ভর্তি করা হয় এবং আগামিতে সরকারি ও বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজেও এ পদ্ধতি কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে তাই পাবলিক পরীক্ষার ফলাফলকে প্রকৃত মেধা যাচাইয়ের মাধ্যম হিসেবে গড়ে তোলা প্রয়োজন। অন্য কোন কারণে বিশেষত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ফলাফল ভাল দেখানোটা কোনভাবেই সমীচীন হবে না। লেখক : শিক্ষক, জগন্নাথপুর ডিগ্রি কলেজ, জগন্নাথপুর, সুনামগঞ্জ। email:[email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন