কারগিল যুদ্ধের ছায়া!

আপডেট : ১৩ জানুয়ারি ২০১৩, ২০:২৫
দক্ষিণ এশিয়ার দুই পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র ভারত এবং পাকিস্তানের মধ্যে আবারো উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। গত ৬ জানুয়ারি থেকে গতকাল পর্যন্ত কাশ্মীরে ভারত শাসিত জম্মু ও কাশ্মীর সীমান্তের নিয়ন্ত্রণ রেখায় (লাইন অব কন্ট্রোল) দুই দেশের ৪ জন সৈন্য নিহত হয়েছে। সীমান্তের উত্তেজনা আঘাত এনেছে দুই দেশের কূটনীতি এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে। যদিও দুই দেশই দাবি করছে, এ ঘটনায় তাদের মধ্যে শান্তি প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হবে না। তবে ভারতীয় বিশ্লেষকরা দাবি করছেন, বর্তমান পরিস্থিতি ঠিক ১৯৯৯ সালের কারগিল যুদ্ধের কথাই মনে করিয়ে দিচ্ছে। তবে দুই দেশের গণমাধ্যম এবং বিশিষ্টজনেরা এই উত্তেজনা যেন যুদ্ধের দিকে না যায় সেই বিষয়টিতে গুরুত্ব দিচ্ছে। ভারতীয় উপ-মহাদেশের উত্তর-পশ্চিমের একটি অঞ্চল কাশ্মীর। এর অধিকার নিয়ে দীর্ঘ ৬০ বছর ধরে দুই দেশের মধ্যে দ্বন্দ্ব চলছে। ভারত শাসিত রাজ্য জম্মু ও কাশ্মীর (এর বিভাগসমূহ হলো: কাশ্মীর উপত্যকা, জম্মু এবং লাদাখ), পাকিস্তান শাসিত গিলগিট-বালতিস্তান এবং আজাদ কাশ্মীর প্রদেশ এবং চীন-শাসিত আকসাই চীন এবং ট্রান্স-কারাকোরাম ট্রাক্ট অঞ্চলসমূহ নিয়ে পুরো কাশ্মীর গঠিত। ঘটনা যেভাবে শুরু: ঘটনার সূত্রপাত গত ৬ জানুয়ারি। পাকিস্তান অভিযোগ করে, ভারতীয় সেনারা জম্মু ও কাশ্মীর সীমান্তের নিয়ন্ত্রণরেখা অতিক্রম করে এক পাকিস্তানি সেনাকে হত্যা এবং একজনকে আহত করে। ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা অস্বীকার করে ভারত। এরপর ৮ জানুয়ারি অভিযোগ আনে ভারত। দেশটির সরকার দাবি করে, ওইদিন বেলা সাড়ে ১১টায় জম্মু-কাশ্মীরের পুঞ্চ জেলার মেন্ধর সেক্টরে পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর বর্ডার অ্যাকশন টিমের সঙ্গে ভারতীয় সেনাদের লড়াইয়ে দুই ভারতীয় সেনার মৃত্যু হয়। পাকসেনারা নিহত একজনের মাথা কেটে নিয়ে চলে যায় বলে দাবি ভারতের সেনাবাহিনীর। তবে পাকিস্তানের পক্ষ থেকে এ সব অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে। এ ঘটনায় ৯ জানুয়ারি ভারতে নিযুক্ত পাকিস্তানের হাইকমিশনার সালমান বশিরকে তলব করে প্রতিবাদ জানায় দেশটি। এটি অমানবিক এবং উস্কানিমূলক উল্লেখ করে ভারত। পাকিস্তান জাতিসংঘের মাধ্যমে ঘটনা তদন্তের দাবি জানায়। তবে ভারত এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে। পাকিস্তানও ভারতের হাইকমিশনারকে তলব করে। শুক্রবারও দুই দেশের মধ্যে সীমান্তের নিয়ন্ত্রণ রেখায় দুই পক্ষের মধ্যে গোলাগুলি হয়। পাকিস্তানের পত্রিকা ডন জানায়, একজন বৃদ্ধ মহিলা ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীর থেকে কঠোর নিরাপত্তা বলয় অতিক্রম করে পাকিস্তানে তার ছেলেমেয়েদের সঙ্গে সাক্ষাত্ করতে যায়। এছাড়া ভারত নিয়ন্ত্রণ রেখার কাছে একটি বাংকার নির্মাণকে কেন্দ্র করে এ ঘটনার সূত্রপাত হয়। তবে এখন পর্যন্ত এর সত্যতা পাওয়া যায়নি। জম্মু ও কাশ্মীর সীমান্ত রেখায় বর্তমানের হানাহানির ঘটনায় কারগিলের ছায়া দেখছেন ভারতের সামরিক বিশেষজ্ঞরা। সেই সময় দ্বি-পাক্ষিক সম্পর্ককে মজবুত করতে লাহোর বাসযাত্রার পরেই বেধেছিল কারগিল যুদ্ধ। এবারও সেরকমই ঘটছে। ২৬/১১-এ মুম্বাইয়ে জঙ্গি হামলার পর দুই দেশের সম্পর্ক থমকে গিয়েছিল। থিম্পুর সার্ক সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নেন। সার্ক সম্মেলনের পর ভারত-পাক সম্পর্কের শীতলতা কাটাতে একাধিক কূটনৈতিক পদক্ষেপ নেয়া হয়। ভারতে এসে ভিসা সহজীকরণ চুক্তি করে যান পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রেহমান মালিক। দীর্ঘ নয় বছর পর গত বছরের ডিসেম্বরে ভারতের মাটিতে খেলতে আসে পাকিস্তানের ক্রিকেট দল। এ সময় পশ্চিমবঙ্গ সরকারের আতিথেয়তায় মুগ্ধ হয়ে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীকে একটি কোরআন শরীফ উপহার হিসেবে পাঠিয়েছে পাকিস্তান। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশদের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভের পর কাশ্মীর নিয়ে এ পর্যন্ত তিনটি যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে দুই দেশ। পরমাণু শক্তিধর দেশ দুইটি ২০০৩ সাল থেকে অস্ত্রবিরতি চুক্তি মেনে চলছে। গত মাসে পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের কর্মকর্তারা জানান, সীমান্তে ভারতীয় সেনা সদস্যদের গুলিতে একজন নিহত ও তিনজন আহত হন। ভারতের সেনা কর্মকর্তারা পাল্টা দাবি করেছেন, ২০১২ সালে ৭৫টি ঘটনায় তাদের আট সেনা সদস্য নিহত হয়েছেন। উভয় দেশই কাশ্মীরকে তাদের অংশ বলে দাবি করে আসছে। এ পর্যন্ত প্রায় ৪৭ হাজার লোক প্রাণ হারালেও সাম্প্রতিক সময়ে সেই তত্পরতা অনেকাংশে কমে এসেছে। ভারতের পুঞ্চ সেক্টরের এবং পাকিস্তানের রাওয়ালাকত সেক্টরের মধ্যের বাস সার্ভিস বন্ধ। পাকিস্তান সীমান্ত বাণিজ্য বন্ধ করে দিয়েছে। ভারত এর সত্যতা স্বীকার করেছে। পাকিস্তানি প্রভাবশালী পত্রিকা ‘দ্য নিউজ ইন্টারন্যাশনাল’ নিয়ন্ত্রণ রেখায় (লাইন অব কন্ট্রোল) সাম্প্রতিক হামলার ঘটনাকে ‘বিতর্কিত’ হিসেবে উল্লেখ করেছে। পত্রিকাটি ‘লাইন অফ ফায়ার’ (গোলাগুলির সীমানা) শীর্ষক সম্পাদকীয়তে উল্লেখ করেছে, এই ধরনের গুরুতর ঘটনার মাধ্যমে দুই দেশকে গভীর বিভেদের মধ্যে নিয়ে যাওয়াকে প্রশ্রয় দেয়া যায় না। জাতির আরেকটি যুদ্ধের প্রয়োজন নেই বা জনগণ চায় না। ভারতের সাবেক নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, যখন বাণিজ্য ও ক্রিকেটের মাধ্যমে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক বৃদ্ধির চেষ্টা করা হচ্ছে তখন এ ধরনের আঘাত অবশ্যই পররাষ্ট্র সম্পর্কের জন্য বড় আঘাত। গত বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিনা রব্বানি খার সাম্প্রতিক সীমান্তবর্তী অস্থিরতা প্রতিবেশী দুই দেশের মধ্যকার আলোচনায় প্রভাব ফেলবে না। জঙ্গিদের সুযোগ: দুই দেশের উত্তেজনার সুযোগ নেয় জঙ্গিরা। জম্মু ও কাশ্মীরে জঙ্গি পাঠিয়ে ভারতে শরীয়াহ ভিত্তিক শাসন চালুর লক্ষ্যে যুদ্ধ নামার ঘোষণা দিয়েছে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি)। এক ভিডিও বার্তায় ওয়ালি-উর-রহমান বলেন, পাকিস্তানে যেমন আমরা শরীয়াহ ভিত্তিক শাসন ব্যবস্থার জন্য সক্রিয় সংগ্রাম চালাচ্ছি, তেমনই কাশ্মীরেও চালিয়ে যাব। একই ভাবে আমরা ভারতেও শরীয়তি ব্যবস্থা কায়েম করব। ভারতের সংবাদ মাধ্যম অভিযোগ করে, ২৬/১১ হামলার মূল নায়ক হাফিজ সাইদ পাক-ভারত সীমান্তে ভারত বিরোধী তত্পরতাকে উস্কে দিচ্ছেন। তবে এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সাইদ। ২০০২ সালে আমেরিকার জনগণকে লেখা এক চিঠিতে লাদেন বলেছিলেন, তিনি আমেরিকার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন। কারণ আমেরিকা কাশ্মীরে ভারতেকে সমর্থন দিচ্ছে। ২০০২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ডোনাল্ড রামসফেল্ড বলেছিলেন, কাশ্মীরে আল কায়েদা গোষ্ঠী সক্রিয়। ২০০৬ সালে আল কায়েদা তাদের একটি উইং ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে চালু করে। ২০১০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী অভিযোগ করে আল কায়েদা পারমাণবিক ক্ষমতাধর দুইটি দেশের মধ্যে যুদ্ধ বাধানোর চেষ্টা করছে। ১৯৮৭ সালে নির্বাচনের পর ১৯৮৯ সালে কাশ্মীরে জঙ্গিদের উত্থান হয়। ভারতের দাবি, জঙ্গিরা পাকিস্তানের মদদপুষ্ট। জম্মু এবং কাশ্মীরে তিনটি জঙ্গি গোষ্ঠী সক্রিয়। এরা হলো- লস্কর ই তৈয়বা, জয়স ই- মুহম্মদ এবং হরকাতুল মুজাহিদীন। ব্রিটিশদের ভুলের খেসারত: দ্য ইকোনোমিস্ট-এ ভারত-পাকিস্তান সীমান্তকে ‘ফ্যান্টাসি’ উল্লেখ করে বলা হয়েছে, ব্রিটিশরা ভারত উপমহাদেশ ছাড়ার আগে সীমানা নিয়ে একটি বিপজ্জনক পরিস্থিতি রেখে গেছে। কেবল পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যেই সীমানা নিয়ে সমস্যা নয়, পাকিস্তান আফগানিস্তানের মধ্যে ডুরাল্ড লাইন নামের যে সীমানা রয়েছে তা মানছে না আফগানিস্তান। চীনের সঙ্গে বিরোধ রয়েছে ভারতের। এই সীমান্ত চিহ্নিতকরণে যাদের দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল তারা এ বিষয়ে অভিজ্ঞ ছিলেন না। মানবাধিকার লঙ্ঘন: আ্যাামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল অভিযোগ করেছে, ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে সেনাবাহিনী জননিরাপত্তা আইন লঙ্ঘন করছে। কোনো বিচার ছাড়াই নাগরিকদের আটক রাখছে ভারতীয় সেনাবাহিনী। কাশ্মীরের মানবাধিকার সংগঠন জানায়, গত ২০ বছরে ৪০টি কবরে ২ হাজার ১৫৬টি মৃতদেহ পাওয়া গেছে; কিন্তু কর্তৃপক্ষ এটি অস্বীকার করেছে। তাদের দাবি- এই মৃতদেহ বিদ্রোহীদের যারা ভারতের বাইরে থেকে এসেছে। কমিশন বলছে, ৫৭৪টি মৃতদেহ স্থানীয়দের যারা নিখোঁজ হয়েছিল।