দুর্নীতি চীনের বড় হুমকি

আপডেট : ১৩ জানুয়ারি ২০১৩, ২০:২৫
চীনের রাজনৈতিক ব্যবস্থার রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করেছে দুর্নীতি। সাধারণ চীনা নাগরিকদের কাছে এখন তা আর অজানা নয়। গত নভেম্বরে বেইজিংয়ে কমিউনিস্ট পার্টির কংগ্রেসে উপস্থিত প্রায় ২ হাজার প্রতিনিধির সামনে প্রেসিডেন্ট হু জিনতাও’র দেয়া ভাষণে সে কথা আবারো প্রমাণ হয়। সেই ভাষণে হু জিনতাও বলেছিলেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই করা এবং রাজনৈতিক সততা তুলে ধরায় এখন তার পার্টিও সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ইস্যু। শুধু ইস্যুই নয় দুর্নীতি দমন এখন একটি বড় চ্যালেঞ্জেও পরিণত হয়েছে চীনা শাসকদের জন্য। হু তার ভাষণে এ কথায় বলে ক্ষ্যান্ত হননি বরং একটি বিষয়ও স্পষ্ট করেছেন। তা হলো সমাজতান্ত্রিক আদর্শের সরকার ব্যবস্থা দুর্নীতির কারণেই চরম হুমকিতে পড়তে পারে। পার্টির ধস নামতে পারে, এমনকি এ কারণে রাষ্ট্রের পতনও হতে পারে। চীনা প্রেসিডেন্ট দেশটির গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের আত্মসংযম দেখানোর আহবান জানিয়ে তাদের পরিবার ও অধীনস্ত কর্মীদেরকে শিক্ষা দেয়া ও দেখভালের কথা বলেন। চীনের নতুন প্রধান নেতা শি জিনপিং দুর্নীতি প্রতিরোধকে তার এক নম্বর লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করেছে। জিনতাওয়ের মতো তিনিও কয়েকটি ভাষণে বলেছেন, দুর্নীতি দেশের পতনেরও কারণ হতে পারে। গত বছরে চীনে অনেকগুলো দুর্নীতির কথা ফাঁস হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী ওয়েন জিয়াবাওয়ের বিপুল সম্পদের কথা প্রকাশ পেয়েছে। এছাড়া চংকিং পার্টি চীফ বো ঝিলায়ের পতন হয়েছে। যার স্ত্রী একজন ব্রিটিশ ব্যবসায়ী হত্যার জন্য দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। দুর্নীতির কারণে জনমনে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। বিভিন্ন মহল থেকে দুর্নীতি দমনের দাবি জোরালো হয়েছে। সাংহাইভিত্তিক চিত্রকর ঝাং বিংজিয়ানের মতো শীর্ষ পর্যায়ের শিল্পীরা দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রচারণা চালাচ্ছেন। ঝাং বিংজিয়ান তার চিত্রকর্ম দিয়ে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জনগণের মাঝে সচেতনতা ও আলোচনা তৈরির চেষ্টা করছেন। ইতিমধ্যে তার হল অব ফ্রেমে দুর্নীতির দায়ে শাস্তি পাওয়া ১শ’র বেশি ব্যক্তির চিত্রকর্ম প্রদর্শন করা হয়েছে। ঝাং বলেন, কোনো ব্যক্তি ১০ ইউয়ান নাকি ১০ লাখ ইউয়ানের দুর্নীতি করেছে সেটি বিষয় নয়। এসব চিত্রকর্মের মাধ্যমে দুর্নীতির বিরুদ্ধে মানুষের মধ্যে চিন্তার বিস্তার ঘটানোই মূল উদ্দেশ্য। এটাই শিল্পের প্রকৃত শক্তি। সম্প্রতি প্রকাশিত ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের দুর্নীতির ধারণা সূচকে ১৭৬টি দেশের মধ্যে চীনের অবস্থান ৮০তম। এ অবস্থানে থাকায় চীনের নতুন নেতৃত্বের টেবিলে বিষয়টি থাকবে বলে মনে করা হচ্ছে। বেইজিং ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির প্রফেসর হু ঝিংদৌ বলেন, এ বছরের প্রতিবেদনে চীনের অবস্থান মাঝামাঝি। রাশিয়ার মতো কিছু দেশের চেয়ে ভালো। এ অবস্থান একেবারে খারাপ তা নয়, তবে গত কয়েক বছর ধরে দুর্নীতি দমনে যেসব পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে তা যথেষ্টও নয়। ঐ তালিকায় সবচেয়ে কম দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হয়েছে ডেনমার্ক। আর সবচেয়ে বেশি দুর্নীতির দেশ হলো সোমালিয়া, উত্তর কোরিয়া, আফগানিস্তান। স্বচ্ছতা প্রসঙ্গে হু ঝিংদৌ বলেন, দুর্নীতি দমনের জন্য প্রথম যে পদক্ষেপ নিতে হবে সেটি হলো গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। গণমাধ্যম দিয়ে পর্যবেক্ষণের সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে। আগামী কয়েক বছরের মধ্যে এসব প্রক্রিয়া মানুষ দেখবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, পার্টির সেন্ট্রাল কমিটির পরবর্তী কর্মকর্তাদের উচিত হবে তাদের সম্পদের পরিমাণ জনসমক্ষে প্রকাশ করা। যদি দুর্নীতি দমনে সরকার অঙ্গীকারাবদ্ধ থাকে তবে তাদের এখনই এসব পদক্ষেপ নেয়া উচিত। গত নভেম্বরে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির কংগ্রেসে ওয়াং কিশানকে দেশটির সর্বোচ্চ দুর্নীতি দমন প্রতিষ্ঠান সেন্ট্রাল কমিশন ফর ডিসিপ্লিন ইনসপেকশন (সিসিডিআই)-এর সচিব করা হয়েছে। সিপিসি সেন্ট্রাল কমিটির পলিট ব্যুরোর স্থায়ী কমিটির সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। প্রাতিষ্ঠনিক পর্যায়ে দুর্নীতি প্রতিরোধ ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ ও শাস্তি প্রদানের জন্য তাকে বলা হয়েছে। প্রফেসর হু’র মতে ওয়াং সঠিক নির্দেশনায় এগিয়ে যাচ্ছে। তিনি দুর্নীতি দমনে অনেক কঠিন কাজ করেছেন। দুর্নীতি বিরোধী সংস্কৃতির যাত্রা শুরু করেছেন। এটি অবশ্যই একটি ভালো লক্ষণ। তবে আমরা দেখতে চাই সরকার শুধু উপর থেকে নয় বরং তৃণমূল পর্যায় থেকেই এ সমস্যা উপড়ে ফেলবে। তিনি বলেন, কোনো কিছুই অসম্ভব না। দরকার হলো সরকারের একাগ্রচিত্ততা ও প্রত্যয়। কিশান ৯০-এর দশকে গুয়াংডং ঋণ সংকট কাটিয়ে ওঠা, হেইনান প্রদেশে চোরাচালান ও দুর্নীতি রোধ, ২০০৩ সালে চীনের সার্স ভাইরাস সংকট কাটিয়ে ওঠার পেছনে বড় মুখ্য ভূমিকা পালন করেছিলেন। নতুন দায়িত্ব তার রাজনৈতিক দক্ষতার জন্য এক বড় পরীক্ষা। গ্লোবাল টাইমস সংবাদপত্রে সিংহুয়া ইউনিভার্সিটির প্রশাসক লি কিংলিংয়ের এক নিবন্ধ প্রকাশ করা হয়। এতে ব্যাংক অব চায়নার এক প্রতিবেদনের কথা উল্লেখ করা হয়। ২০০৮ সালে প্রকাশিত ৬৭ পৃষ্ঠার ঐ প্রতিবেদনে বলা হয়, ৯০ দশকের মাঝামাঝি থেকে সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রায় ১৮ হাজার দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন এবং আত্মগোপনে রয়েছেন। ধারণা করা হচ্ছে, এসব কর্মকর্তা প্রায় ৮০০ বিলিয়ন ইউয়ান (১২৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার) দুর্নীতি করে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া এবং নেদারল্যান্ডে পাঠিয়েছেন। একটি চীনা পত্রিকার তথ্য অনুসারে, গত পাঁচ বছরে পার্টির শৃঙ্খলা ভঙ্গের জন্য ৬ লাখ ৬৮ হাজার ৪০০ জনের শাস্তি হয়েছে। এছাড়া ২৪ হাজার ৬০০ জনের বেশি সন্দেহভাজনের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। কিংলিং বলেন, দুর্নীতি বিরোধী অভিযান অবশ্যই শক্তিশালী হতে হবে। কারণ এর ভয়াবহতা সম্পর্কে ক্ষমতাসীনরা ভালোভাবে অবগত। দুর্নীতি দমনে চীন সরকারের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হলো সদিচ্ছা এবং তাত্পর্যপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন। যা দীর্ঘমেয়াদে চীনের দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই করবে।