দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় প্রচুর পরিমাণ স্বর্ণ সুইস ব্যাংকে জমা ছিল। এ কারণে ব্যাংকটি সিদ্ধান্ত নেয় তাদের নিজস্ব শোধনাগার তৈরির জন্য। আর এই শোধনাগার থেকেই তৈরি হচ্ছে স্বর্ণের বার।
গত বছর ২৬০০ টনের বেশি কাঁচা সোনা সুইজারল্যান্ডে আমদানি করা হয়, যার মূল্য ১০ হাজার ৩ কোটি ডলার।
বিশ্বের বৃহত্তম চারটি স্বর্ণ শোধনাগারই এখানে অবস্থিত। এর মধ্যে তিনটি দক্ষিণাঞ্চলীয় টিসিনো এলাকায় এবং বাকিটা উত্তরাঞ্চলে অবস্থিত।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি সুইজারল্যান্ডকে অর্থনৈতিক দিক থেকে আরো সমৃদ্ধশালী করে তুলেছে সেদেশের স্বর্ণ শোধনাগার ব্যবসা। দেশটিতে এখন স্বর্ণ শোধন এবং এর মাধ্যমে স্বর্ণের বার তৈরি করা বেশ লাভজনক শিল্পে পরিণত হয়েছে। বিশ্বের বৃহত্তম চারটি স্বর্ণ শোধনাগারই এখানে অবস্থিত। এর মধ্যে তিনটি দক্ষিণাঞ্চলীয় টিসিনো এলাকায় এবং বাকিটা উত্তরাঞ্চলে অবস্থিত। বিশ্বের দুই- তৃতীয়াংশ স্বর্ণই আজ এখানে পরিশোধিত হয়। ইতিহাসের পরিক্রমায় এভাবেই চলে আসছে তাদের স্বর্ণ শোধনাগারের ব্যবসা। এ জন্য সুইজারল্যান্ডের এই স্বর্ণ শোধনাগারকে বলা হয় অর্থ উপার্জনের আরেক সুইস ব্যাংক। মানুষ যেমন সুইস ব্যাংকে টাকা জমা রেখে নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারে তেমনি এ খাতে বিনিয়োগ করে লাভ করা যায় নিশ্চিত মুনাফা।
সুইস ব্যাংকের মালিকানায় রয়েছে কয়েকটি শোধনাগার। এর মাধ্যমে তারা রমরমা ব্যবসা করে যাচ্ছে। অর্থ উপদেষ্টা রবার্ট গ্রেসির বক্তব্যে সেরকম তথ্যই ফুটে উঠেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় প্রচুর পরিমাণে স্বর্ণ সুইস ব্যাংকে জমা ছিল। এ কারণে ব্যাংক তাদের নিজস্ব শোধনাগার তৈরির সিদ্ধান্ত নেয়। আর এই শোধনাগার থেকে তারা স্বর্ণের বার তৈরি করছে। কিন্তু এই শোধনাগার আজ আর ব্যাংক পর্যন্ত সীমাবদ্ধ নেই। সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে তা ব্যক্তি মালিকানায়ও চলে গেছে। গত বছর ২৬০০ টনের বেশি কাঁচা সোনা সুইজারল্যান্ডে আমদানি করা হয়, যার মূল্য ১০ হাজার ৩ কোটি ডলার।
দেশটির পাম্প গোল্ড রিফাইনারি তেমনই একটি আধুনিক শোধনাগার। এখানে গলিত আকরিক দ্বারা বানানো হয় স্বর্ণের বার, যার এক একটির ওজন সাড়ে ১২ কেজি। বর্তমানে সেখানে এক আউন্স স্বর্ণের দাম ১৭০০ ডলার। দৈনিক কী পরিমাণে স্বর্ণের বার তৈরি হচ্ছে-এ প্রশ্নের জবাবে অ্যালবার্তো কানডিয়ানি নামে এক ব্যক্তি অনেকটা হাস্যোজ্জ্বল মুখে বলেন, এটা বলা আমার জন্য সত্যিই কষ্টকর। তবে প্রতিদিন অনেক স্বর্ণের বার উত্পাদন হচ্ছে। তাই এর মজুদও গড়ে উঠেছে বেশ। তিনি বলেন, এ খাতে বিনিয়োগ বেশ লাভজনক। তাই আমার মতো অনেককেই উচিত সম্ভাবনাময় এ খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো। আমি মনে করি, এক্ষেত্রে স্বর্ণের জাদুকরী শক্তি রয়েছে। যদিও বিশ্বে এখনও অর্থনৈতিক মন্দা বিরাজ করছে, তারপরও আমি বলছি এ খাতে বিনিয়োগ নির্দ্বিধায় লাভজনক। আর এ কারণেই স্বর্ণের বাজার বেশ চড়া। তাই এ খাতে বিনিয়োগে আসাটা মনে হয় মঙ্গলজনক।
মেহদি বারহোর্ডার পাম্প গোল্ড রিফাইনারির কর্ণধার মেহদি বারহোর্ডার বলেন, ২০০৮ সালে আর্থিক মন্দার সময়ও স্বর্ণের বাজার মূল ধারায় ছিল। তবে বর্তমানে ব্যাংকিং ব্যবস্থার উপর সাধারণ মানুষ আর নিশ্চিতভাবে আস্থা রাখতে পারছে না। কিংবা তাদের আস্থার সংকটে পড়েছে ব্যাংক ব্যবস্থা। তারা মনে করছেন ব্যাংকিং সিস্টেম আর অক্ষত থাকছে না। এ কারণে তারা বেশি পরিমাণে স্বর্ণ শোধনাগার ব্যবসার দিকে ঝুঁকে পড়ছেন এবং স্বর্ণের বার এবং স্বর্ণের মুদ্রার দিকে আগ্রহ বাড়াচ্ছেন। তাই দিনে দিনে এখাতে অভ্যন্তরীণ পর্যায়েও তাদের চাহিদা বাড়ছে। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আরো বলেন, এ পেশাটাকে ধরে নেয়া যেতে পারে অদূর ভবিষ্যতে যেভাবে বীমা সুবিধার মাধমে মানুষ তার আর্থিক মুনাফা পায়, এখানেও ঠিক তেমনটি হয়েছে।
অর্থ উপদেষ্টা রবার্তো গ্রেসি বলেছেন, আমরা এতে সবাই একমত হতে পারি যে,অনিশ্চিত সময়ের পথ পরিক্রমায় স্বর্ণ ব্যবসা হতে পারে আমাদের সময়ের মূল্যবান হাতিয়ার। তিনি বলেন, বিশ্বে আর্থিক মন্দা চললেও স্বর্ণের বাজারে সে অর্থে প্রভাব পড়েনি। কেননা এ খাতে দাম পাগলা ঘোড়ার মতো শুধু বেড়েই চলেছে। তাই অন্যান্য খাতের তুলনায় এ খাতে ঝুঁকির হিসাবটা খুবই কম। তিনি আরো বলেন, স্বর্ণ হচ্ছে এক ধরনের বিনিয়োগ। একজন একে কিনে রেখে দিলে লোকসানের অর্থ গুণতে হয় না। বরং তাকে লাভের অংশই পুরো পকেটে ভরে নিতে পারে।
এছাড়া বিভিন্ন সংকটে যেমন: যুদ্ধবিগ্রহ, দুর্যোগ ইত্যাদি সময়ে এর তুলনা মেলাই দায়। এটি হয়ে উঠে তখন অর্থ সংকট মেটানোর দুর্দান্ত হাতিয়ার। স্বর্ণের বাজার ক্রমেই হু হু করে বেড়ে চলেছে। নিরাপদ বিনিয়োগ হিসাবে এর চেয়ে উত্কৃষ্ট আর কিছু হতে পারে না। একে ধারণাগত নয় বরং একে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসাবে ভাবা উচিত। তিনি বলেন, অংকের হিসাবের মতো এটা পরিষ্কার যে, বর্তমান সময়ে নগদ টাকা কোনক্রমেই নিরাপদ নয়। মুদ্রাস্ফীতির যাঁতাকলে অর্থের মান কমে যেতে পারে কিন্তু স্বর্ণের বাজারে বিনিয়োগে সেই ঝুঁকি নেই বললেই চলে।
তবে সব প্রশংসা এখানে কাম্য হলেও প্রশ্ন উঠেছে এর উত্স এবং শ্রমিকদের মর্যাদা নিয়ে। অভিযোগ রয়েছে, এখানকার শ্রমিকরা তাদের প্রকৃত মর্যাদা কিংবা মজুরি পান না। তাছাড়া রয়েছে দেদারছে ‘কালো টাকা’র লেনদেন। তবে অভিযোগের তীর যেদিকেই থাকুক না কেন, বিষয়টি যেহেতু দেশটির অভ্যন্তরীণ ব্যাপার, তাই এর বিচারের ভার সেদেশের উপরেই ছেড়ে দেয়া যাক।
ইভা স্কামাসমান নামে এক ব্যক্তি বলেন, স্বর্ণ শোধনাগারের এই ব্যবসা নিঃসন্দেহে একটি ভালো ব্যবসা। আরো অনেক লোককে এতে সম্পৃক্ত হওয়া উচিত। তিনি বলেন, এক্ষেত্রে সুইজারল্যান্ডকে আরো বেশি উম্মুক্ত নীতি গ্রহণ করতে হবে যাতে করে এটি একটি স্বচ্ছ কাঠামোর উপর দাঁড়াতে পারে। কেননা এখানে স্বর্ণ ব্যবসা একটা অস্বচ্ছ ভিতের উপর দাঁড়িয়ে আছে। এক্ষেত্রে এ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত সবাইকে জবাবদিহিতার প্রতিষ্ঠান এলবিএমএ এর ছাতাতলে আসতে হবে।
স্কামাসমান আরো বলেন, সুইস বাণিজ্য পরিসংখ্যান সংস্থা কখনোই বলবে না এ স্বর্ণের উত্স কোথায়। কেননা এ বিষয়টিতে তারা কঠোর গোপনীয়তা রক্ষা করে। কিন্তু স্বর্ণের এই উত্স এবং এর গন্তব্য কোথায় তা জানার অধিকার নিশ্চয়ই সকলের আছে। যা হোক, বিশ্বে স্বর্ণের বাজারে দাম যেভাবে বাড়ছে,তাতে অনেকেই ব্যাংকে টাকা গচ্ছিত রাখার চেয়ে স্বর্ণ ক্রয়ের দিকেই বেশি আগ্রহী হচ্ছে।
