বিশ্বজুড়ে আবহাওয়ার স্বাভাবিক রূপ কতোটা বদলে যাচ্ছে, তার রূপরেখা এখনো স্পষ্ট নয় বিশেষজ্ঞদের কাছে। তবে নতুন বছরের শুরুতে একটি বিষয় বিশেষজ্ঞদের কাছে স্পষ্ট, তা হলো— বিশ্বের আবহাওয়া হয়ে উঠেছে চরমভাবাপন্ন।
সূর্য এখনো দক্ষিণ গোলার্ধে হেলে রয়েছে। তাই উত্তর গোলার্ধে শীতের আমেজ, আর দক্ষিণ গোলার্ধে গরমের। এ তো স্বাভাবিক নিয়ম। কিন্তু সেই শীত আর উষ্ণতার পারদ যদি হয় খুব নিম্ন এবং ঊর্ধ্বমুখী? দুশ্চিন্তার কথা লুকিয়ে রয়েছে এখানে। স্বাভাবিকভাবেই চরম আবহাওয়া এবং তার প্রভাবের সামপ্রতিক কিছু নমুনা ভাবিয়ে তুলছে পরিবেশবাদীদের। ২০১০ সালে রাশিয়ার বিভিন্ন শহরের তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। ২০১১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের পূর্বাঞ্চল ও কানাডার বিভিন্ন অঞ্চলে অন্যান্য বছরের তুলনায় অধিক পরিমাণ তুষারপাত হয়। যুক্তরাষ্ট্রে ঘনঘন ঘূর্ণিঝড় এবং সামপ্রতিক ঘূর্ণিঝড় স্যান্ডির তীব্রতা সামপ্রতিককালের রেকর্ডকৃত মাত্রা ছাড়িয়ে যায়। স্যান্ডির আঘাত হানার অব্যবহিত আগে মহাকাশ স্টেশনে অবস্থানরত নভোচারীরা লক্ষ্য করেছিলেন প্রশান্ত মহাসাগর থেকে শিকাগো শহর পর্যন্ত পুরো এলাকা কালো ধোঁয়ায় ছেয়ে গেছে। সঙ্গে সঙ্গে তারা বার্তা পাঠান নাসায়— ‘কী হচ্ছে পৃথিবীতে? সবাই ভালো তো?’ ২০১১ সালের ঘূর্ণিঝড় ‘আইরিন’-এর চেয়ে স্যান্ডি অনেক বেশি ক্ষতি করেছে। তার কারণ এই ঘূর্ণিঝড়ের স্থানান্তরিত হওয়ার গতি ছিল কম। ফলে অল্প জায়গায় অধিক বৃষ্টিপাতের ঘটনা ঘটে। আবহাওয়াবিদরা মনে করেন, এ ধরনের শ্লথগতির ঘূর্ণিঝড় ভবিষ্যতে আরো হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এ ধরনের ঘটনা ঘটছে বলে তাদের ধারণা।
এ বছরের কিছু আবহাওয়ার নমুনাতথ্যের দিকে তাকালে এই বিষয়টি আরো স্পষ্ট হয়। প্রথমে উত্তর গোলার্ধের আবহাওয়ার অবস্থা বিবেচনা করা যাক। চীনে এবার গত ৩০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঠাণ্ডা পড়েছে। রাশিয়ার সাইবেরিয়ার তাপমাত্রা চলে গেছে হিমাঙ্কের ৪৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে। ভয়ঙ্কর তুষারঝড় আর বৃষ্টিতে নাভিশ্বাস উঠেছে মধ্যপ্রাচ্যে। যুক্তরাজ্যে বন্যার চিত্র খুব স্বস্তির নয়।
অন্যদিকে দক্ষিণ গোলার্ধে এর ঠিক বিপরীত এবং চরম অবস্থা। ব্রাজিলের ওপর দিয়ে বয়ে চলছে অসহ্য দাবদাহ। অস্ট্রেলিয়াতেও একই অবস্থা। অস্ট্রেলিয়ার দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে গ্রীষ্মের প্রচণ্ড তাপে গত সপ্তাহে শতাধিক এলাকায় আগুন লেগেছে। এসব জায়গা থেকে কয়েক হাজার বাসিন্দাকে নিরাপদে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। তবে এখনও নিহতের কোনো খবর পাওয়া যায়নি। এ ঘটনাকে ‘সর্বোচ্চ বিপর্যয়’ ঘোষণা করে সতর্কতা জারি করেছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী জুলিয়া গিলার্ড।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে নিউ সাউথ ওয়েলস রাজ্য। এ রাজ্যের চারটি এলাকায় সতর্কতা জারি করা হয়েছে। মঙ্গলবার নিউ সাউথ ওয়েলসের শতাধিক জায়গায় আগুন লাগে। পুলিশ স্টেশন ও স্কুলসহ অনেক ভবন আগুনে পুড়ে গেছে। তাসমান পেনিনসুলার কাছাকাছি কয়েকটি এলাকায় সপ্তাহ জুড়ে দাবদাহ হয়েছে।
নিউ সাউথ ওয়েলসের ফায়ার সার্ভিস কমিশনার শেন ফিটজসিমনস সতর্ক করে এবিসি রেডিওকে জানান, এ অঞ্চলের তাপমাত্রা যে হারে বাড়ছে তাতে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ বলে ধারণা করা হচ্ছে। শুষ্ক আবহাওয়া ও দমকা হাওয়ার কারণে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি চলে যাচ্ছে।
অন্যদিকে উত্তর গোলার্ধে মধ্যপ্রাচ্যের অবস্থা এবার খুবই নাজুক। প্রবল তুষারঝড় আর বন্যায় আক্রান্ত হয়ে জনজীবন থমকে গেছে ভূমধ্যসাগরের পূর্ব পাড়ে| নজিরবিহীন ঠাণ্ডা ভেঙে দিয়েছে দুই দশকের সব রেকর্ড। তুরস্ক, লেবানন, ইসরাইল, জর্ডান ও সিরিয়া— মধ্যপ্রাচ্যের সর্বত্রই প্রকৃতির রুদ্ররূপের সামনে প্রমাদ গুনছেন সাধারণ মানুষ।
প্রকৃতির রোষের মূল্য সবচেয়ে বেশি দিতে হয়েছে সিরিয়ার নাগরিকদের। গত প্রায় দু’বছর ধরে দেশে যে গৃহযুদ্ধ চলছে তার বদৌলতে অন্তত ছয় লাখ মানুষ এখন গৃহহারা। দেশের পশ্চিম প্রান্তে ও জর্ডান এবং লেবাননে কেবলমাত্র প্লাস্টিক ও ত্রিপলের তাঁবু আশ্রয় করে লড়ছেন তারা প্রবল ঠাণ্ডার সঙ্গে। তাপমাত্রা হিমাঙ্কের ২১ ডিগ্রি সেলসিয়াস নিচে। সঙ্গে নেই গরম করার মতো কিছুই। অবশ্য ঘর বলেও আর কিছু অবশিষ্ট নেই তাদের। আশ্রয় বলতে শরণার্থী শিবির। এমন অবস্থায় পরনের শীতবস্ত্রটুকু সম্বল করে প্রকৃতির সঙ্গে অসমযুদ্ধ সিরীয় গৃহহীনদের।
সিরিয়ার উত্তর-পশ্চিমের ইদলিব অঞ্চলের অবস্থা এতটাই খারাপ হয় যে, এখানকার বাসিন্দারা আশ্রয় নেয় শতাব্দী প্রাচীন পরিত্যক্ত জনপদগুলোতে। এই এলাকার অন্যতম বিদ্রোহী নেতা ফাদি ইয়াসিন জানিয়েছেন, ‘কোনো জ্বালানি নেই, মানুষ দরজা-জানালার কাঠ পুড়িয়ে আগুন করছে। সামান্য প্লাস্টিকের চাদর রুখতে পারছে না বৃষ্টির প্রাবল্য। পরিত্যক্ত বাড়িগুলোতে ত্রিপল বা প্লাস্টিক দিয়ে আচ্ছাদন তৈরি করে কোনক্রমে টিকে আছে মানুষ।’
একা সিরিয়াই নয়, প্রবল বন্যা ও তুষারপাতে বিধ্বস্ত সংলগ্ন ইসরাইল, লেবানন, তুরস্ক ও জর্ডান। কিন্তু অবস্থা সবচেয়ে করুণ সিরীয়দেরই। প্রকৃতির তাণ্ডবও থামাতে পারেনি গৃহযুদ্ধের তীব্রতা। গত সপ্তাহে হিমাঙ্কের ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস নিচে নেমে গেছে তাপমাত্রা; কিন্তু কমেনি লড়াইয়ের উত্তাপ। রাজধানী দামেস্কসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় সমানে চলছে গোলাগুলি। তবে প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ এখন বিমান হামলা স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তাই কিছুটা স্বস্তিতে রয়েছেন বিরোধীরা।
ভূমধ্যসাগরের পূর্বপাড়ে শীতকালে তুষারপাত নতুন ঘটনা নয়; কিন্তু এ বছরের ঠাণ্ডা ভেঙে দিয়েছে সব রেকর্ড। গোদের ওপর বিষফোঁড়ার মতো এসেছে প্রবল বর্ষাও। লেবাননের বিস্তীর্ণ এলাকা এখন জলের তলায়। বহু গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা ভেসে গিয়ে দেশের অনেক জায়গাই এখন বিচ্ছিন্ন। এমনকি প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ফলে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে টেলিফোন ও ইন্টারনেট সংযোগ। গত ২০ বছরে এমন প্রবল বৃষ্টি এই অঞ্চলে কখনও হয়নি, এমনই তথ্য জানাচ্ছে ইসরাইলের আবহাওয়া দপ্তর। গত সপ্তাহে জেরুজালেম ও তার আশপাশের অঞ্চল পুরু বরফের তলায় চলে যায়।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, পৃথিবীর আবহাওয়ার পরিবর্তন, সমুদ্র স্রোতের পরিবর্তন, মেরু তুষারপাত, সাগরের বরফ গলার পরিবর্তন, ভূমিক্ষয় এবং উদ্ভিদের বিকাশ ও বিলয়ের মধ্যে যে এক বার্ষিক চক্র কাজ করছে, এর ফলে পৃথিবী বদলাতে থাকে। এই পরিবর্তন প্রক্রিয়ায় আমরা সারা বিশ্বে চরম আবহাওয়ার সম্মুখীন হই। তবে পরিসংখ্যানগত দিক থেকে লক্ষ্য করা যায়, ১৯২৩ সালের হিসেবে এবং বর্তমান হিসেবে চরম আবহাওয়ার ঘটনা ধীরে ধীরে বেড়ে চলেছে। বর্তমানে অবস্থায় তা চরমভাবাপন্নে উন্নীত হয়েছে। এ অশনি সংকেত বিশ্বের জীববৈচিত্র্য রক্ষার জন্য অতি বড় হুমকি। মানুষও তার বাইরে নয়।
