সাধারণ অর্থে ভারতীয় এবং ব্রিটিশ বংশোদ্ভূত মিশ্র জনগোষ্ঠীকে অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান জনগোষ্ঠী বলা হয়। এই অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান প্রত্যয় সর্বপ্রথম ব্যবহার করেন ওয়ারেন হেস্টিংস আঠারো শতকে। তখন ভারতে বসবাসকারী ব্রিটিশ নাগরিক এবং তাদের ভারতে জন্মগ্রহণকারী সন্তানদের বলা হতো অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান।
অক্সফোর্ড ডিকশনারির সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, বংশভাবে ভারত এবং ব্রিটেনের মিশ্র জাতি হলো অ্যাংলো-ইন্ডিয়ানরা। একদিকে তারা ভারতীয় বংশোদ্ভূত; কিন্তু ব্রিটেনে জন্ম অথবা বাস। অন্যদিকে ঐতিহাসিকভাবে ব্রিটেন বংশোদ্ভূত কিংবা ব্রিটেনেই জন্ম অথবা দীর্ঘদিন ধরে ভারতে বাস করেছেন বা করছেন। আধুনিক ধারনায় অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান বলতে ভারতীয় বংশোদ্ভূত একটি স্বতন্ত্র এবং সংখ্যালঘু সমপ্রদায়কে বোঝায়, যাদের নিজস্ব ভাষা ইংরেজি।
ভারতীয় সংবিধান ৩৬৬(২)-এর মতে, অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান হলো যেসব ব্যক্তির পিতা বা তার যে কোনো পূর্বপুরুষ ইউরোপিয়ান বংশোদ্ভূত বা ছিল; কিন্তু যার বসবাস ভারতবর্ষে এবং পিতৃগতভাবে এই এলাকায় জন্মগ্রহণ করে বাস করছে এবং সেখানে ক্ষণস্থায়ীভাবে বাস করছে না।
উনিশ শতকের প্রথম দশক পর্যন্ত ভারতে ব্রিটিশ নাগরিকরা বর্ণ বিভেদ করতেন। শুধুমাত্র সাদা রংয়ের ও উচ্চ শ্রেণীর ব্যক্তিরাই অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান শ্রেণীভুক্ত হতে পারতেন। এদের ‘ইস্ট ইন্ডিয়ান’ও বলা হতো আর খুব ধনীদের বলা হতো ‘নবাব’। আর যাদের গায়ের রং একটু কালো ও দরিদ্র শ্রেণীর তাদের অভিহিত করা হতো ইউরেশিয়ান হিসাবে। ইংরেজি সাহিত্যে তাদেরই অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান বলা হয়, যারা (ব্রিটিশ নাগরিক) দীর্ঘদিন ধরে ভারতে বসবাস করছেন। তবে অ্যাংলো- ইন্ডিয়ান কারা ও কীভাবে তাদের উত্পত্তি জানতে আরো তিনশ বছর পেছন ফিরতে হবে।
কালের পরিক্রমায় এখন তারা সংখ্যালঘু সমপ্রদায় হিসেবে সারা বিশ্বে পরিচিত। যারা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে কানাডা, নিউজিল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া ও ভারতে বসবাস করছে। সারা বিশ্বে অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান জনগোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় পাঁচ লাখ। আর শুধু ভারতেই আছে দেড় লাখ। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশদের কাছ থেকে ভারতের স্বাধীনতা লাভের সময় তিন লাখ অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান ভারতে বাস করতো। অনেক ব্রিটিশ তার ভারতীয় স্ত্রী ও সন্তানদের দেশে নিয়ে যান। ভারতে ব্রিটিশ রাজের আমলে অনুষ্ঠিত জরিপে কখনোই নির্ভুল সংখ্যাটা আসেনি। কেননা সর্বত্রই ব্যাপকভাবে একটা রীতি দেখা গেছে যে, বিভিন্ন কারণে অনেকেই নিজেকে অ্যাংলো-ইন্ডিয়ানের বদলে ব্রিটিশ বলে আখ্যায়িত করতেন। কারণ তারা মনে করতেন নিজেরা ব্রিটিশ বংশোদ্ভূত ও তাদের আচার-আচরণ ব্রিটিশ ঢংয়ের। অন্যদিকে ভারতীয়রা তাদের কখনোই ভারতীয় বলে মনে করতেন না। ভারতীয়রা সংকর জাত অ্যাংলো-ইন্ডিয়ানদের ‘বর্ণ সংকর’রূপে অবজ্ঞা করতেন এবং তাদের সঙ্গে সামাজিক সম্পর্ক স্থাপন করতেন না।
অনেকে সেসব মিশ্র ব্যক্তিকে অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান বলেন, যাদের বাবার দিক থেকে ব্রিটিশ রক্ত পেয়েছেন ও মায়ের দিক থেকে পেয়েছেন ভারতীয় রক্ত। প্রকৃতপক্ষে এই গোষ্ঠীর পরিচয় নিহিত আছে আজ থেকে ৩০০ বছর আগে উপমহাদেশে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলের মধ্যে। উনিশ শতকের মধ্যভাগের আগ পর্যন্ত ব্রিটিশ সামরিক ও বেসামরিক কর্মকতা, ব্যবসায়ী ও ভাগ্যান্ব্বেষী অভিযাত্রীদের খুব কমসংখ্যকই ভারতে বসবাসের জন্য তাদের পরিবার-পরিজনকে সঙ্গে নিয়ে আসতেন। আঠারো শতকে ভারতীয় উপমহাদেশে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি প্রথমে বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে আসে। পরে তারা শাসনকর্তা বনে যায়। তখন ব্রিটিশ কর্মকর্তা ও সৈনিকরা ভারতীয় নারীদের বিয়ে করতেন কিংবা তাদের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করতেন। এ ধরনের বিয়ে ও সন্তান জন্মদানে কোম্পানি উত্সাহ দিত এবং পুরস্কৃত করতো। দুর্বল যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে ব্রিটিশ নারীরা তখন এখানে আসতে চাইতেন না। ১৯ শতকের মধ্যভাগের আগ পর্যন্ত ৪০ হাজার ব্রিটিশ সৈন্য ও মাত্র দুই হাজার ব্রিটিশ অফিসার ছিলেন পুরো ভারতবর্ষে। উনিশ শতকের মধ্যভাগের প্রথমদিকে সুয়েজ খাল নির্মিত হওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি হয়। ব্রিটিশ কর্মকর্তা ও সেনাদের স্ত্রী ও সন্তানেরা দলে দলে আসতে থাকেন ভারতে। ব্রিটিশ নারীরা এখানে আসার পর ভারতীয় নারীদের বিয়ে ও তাদের সন্তানদের বিষয়টিকে তারা ভালোভাবে নেননি। অবজ্ঞার চোখে দেখা হতো তাদের। কমতে থাকে ভারতে অবস্থানরত ব্রিটিশ কর্মকর্তা ও সৈন্যদের ভারতীয় নারীদের বিয়ে করার হার। ১৮৫৭ সালে ভারতে সিপাহী বিদ্রোহের ঘটনার পর এ ধরনের বিয়েকে আরো বেশি ঘৃণার চোখে দেখা হতো। কারণ অধিকাংশ অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান সে সময় বাবার দেশের পক্ষেই অবস্থান নেন। এ ধরনের বিয়ে বন্ধে পরবর্তীতে ভিন্ন বর্ণের বিয়েবিরোধী কয়েকটি আইন পাস হয়। আরো অবহেলার শিকার হয় অ্যাংলো-ইন্ডিয়ানরা যুক্তরাজ্য ও ভারতে।
এই অবহেলা আর ঘৃণার দেয়ালের এক পাশে বাস করে প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম ধরে অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান বংশোদ্ভূতরা নিজেদের গোষ্ঠীর মধ্যে বিয়ে করে নিজেরাই একটি সমপ্রদায় গড়ে তুলে। বিকাশ ঘটে একটি নিজস্ব সংস্কৃতির। অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান রান্নারীতি, খাবার-দাবার, পোশাক-আশাক, ভাষা ও ধর্ম সব কিছুই স্থানীয় বাসিন্দাদের থেকে পুরোপুরি স্বতন্ত্রভাবে গড়ে উঠে। ইংরেজি ভাষা ও সংস্কৃতিকে ফোকাস করে তারা গড়ে তুলে একটি নতুন স্কুল ব্যবস্থা। বড়দিন ও যীশুর জন্মদিনের মতো খ্রিস্টধর্মীয় উত্সব এবং নিজেরা নিজেদের মতো করে উত্সব পালনে প্রতিষ্ঠা করে আলাদা সামাজিক ক্লাব ও সংস্থা। সময়ের হাত ধরে কিছু বিশেষ চাকরিতে যেমন শুল্ক ও ভ্যাট দফতর, ডাক ও টেলিগ্রাফ, বন বিভাগ, রেলওয়ে ও শিক্ষকতায় নিয়োগ দেয়া হতো তাদের। হয়ে উঠে তাদের মাতৃভাষা ইংরেজি, ধর্ম খ্রিস্টান। ভারত স্বাধীনতার পর সারা ভারতের মুম্বাই, মাদ্রাজ, কলকাতা, আগ্রা, কোচিন, লক্ষৌ এবং ব্যাঙ্গালোর জুড়ে বসবাস করতে থাকে। পরে তারা ছড়িয়ে পড়ে মিয়ানমার, শ্রীলঙ্কা, ইউরোপ থেকে তাদের পিতৃপুরুষদের ভূমি যুক্তরাজ্যে।
সমপ্রতি বিবিসি অ্যাংলো-ইন্ডিয়ানদের নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ওই প্রতিবেদনে উঠে এসেছে অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান বিশেষজ্ঞ ক্রিস গ্রিফিথসের কথা। তিনি বলেন, ‘আমার মা ছিলেন কলকাতার কাছে জমশেদপুর থেকে উঠে আসা মানুষ। আর বাবা ছিলেন যুক্তরাজ্যের ওয়েলসের বাসিন্দা। তবে আমরা সহোদররা সাদা চামড়া ও নীল রঙা চোখ নিয়ে জন্মেছি। বিশ্বজুড়েই অ্যাংলো-ইন্ডিয়ানরা বিলুপ্তির মতো যে বড় সমস্যার সম্মুখীন, আমরা তারই প্রমাণ।’ গ্রিফিথস বলেন, ব্রিটেন ও কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোতে এই গোষ্ঠীর লোকেরা তাদের ‘ভারতীয় কৃষ্টি’ হারাচ্ছে। অন্যদিকে, ভারতে তারা হারাচ্ছে ইংরেজ কৃষ্টি। আবার অধিকাংশ অ্যাংলো-ইন্ডিয়ানই যতটা না ভারতীয় কৃষ্টির অধিকারী, তারচেয়ে বেশি ইংরেজ কৃষ্টির। তারা ব্রিটিশদের অনুকরণে পোশাক পরে, ইংরেজি ভাষায় কথা বলে, খ্রিস্ট ধর্মকর্ম মেনে চলে। খাবার-দাবারেও তাদের পছন্দ ভারতীয়দের থেকে আলাদা।
গত কয়েক দশকে অ্যাংলো-ইন্ডিয়ানের সংজ্ঞাই পাল্টে গেছে। বর্তমান সময়ে যে কোন মিশ্র ব্রিটিশ-ভারতীয় বংশ পরিচয়কেই অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান বলা হচ্ছে। বিশ শতকের প্রথম দশকের আগে এই সংকর সমপ্রদায়ের সামাজিক পরিচয়ের জন্য কোন আইনগত অভিধা ছিল না। তারা বর্ণ সংকর, অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান, ইউরেশিয়ান, ইন্দো-ব্রিটেন ইত্যাদি নামে পরিচিত হতো। ১৯১১ সালের আগেকার আদমশুমারিতে তাদের ইউরেশিয়ান হিসেবে গণ্য করা হতো। ওই বছরের আদমশুমারিতে লর্ড হার্ডিঞ্জ তাদের অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান সমপ্রদায়ে অন্তর্ভুক্ত করেন। তখন ইউরেশিয়ান বলতে কেবল সংকর সমপ্রদায়কেই নয়, ইউরোপীয়, মধ্য এশীয় এবং এশিয়ার অন্য মিশ্র নাগরিকদেরও বোঝাত। ১৯১১ সালের আদমশুমারিতে প্রথম ভারতীয় মাতা ও ব্রিটিশ পিতার সন্তান এবং যে কোনো অবস্থায় ভারতে বসবাসরত সকল ইউরোপীয়কে অ্যাংলো-ইন্ডিয়ানরূপে চিহ্নিত করা হয়।
১৯২১ সালে অ্যাংলো-ইন্ডিয়ানরা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উভয় দিক দিয়ে ছিল অত্যন্ত প্রভাবশালী। ২৫০ সদস্যের আইন পরিষদে (১৯১৯ সালের ভারত শাসন আইনের আওতায়) ২৫ জন অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান সদস্যের উপস্থিতি থেকেই এই সমপ্রদায়ের প্রভাব অনুধাবন করা যায়। এমনকি ১৯৩৫ সালের সংবিধানে তাদের জন্য আইনসভার ৪টি আসন সংরক্ষিত ছিল।
ভারতের সংবিধান অ্যাংলো-ইন্ডিয়ানদের ধর্মীয় স্বাধীনতা ও স্কুল প্রতিষ্ঠার অধিকার দিয়েছে। চাকরির ক্ষেত্রেও ভারতের কোন ধরনের বৈষম্যের খবর পাওয়া যায়নি। সেই প্রাচীনকাল থেকেই ভারতে সামরিক বাহিনীতে অ্যাংলো-ইন্ডিয়ানরা অনবদ্য অবদান রেখে আসছে। সেই ধারা এখনও অব্যাহত আছে। মরিস বার্কার হলেন ভারতের আংলো-ইন্ডিয়ান সমপ্রদায় থেকে উঠে আসা প্রথম এয়ার ভাইস মার্শাল। এরপরে আরো সাতজন অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান ওই পদে যান। অন্যান্য শীর্ষ সামরিক পদেও তারা সুপ্রতিষ্ঠিত। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ নেয়ায় ভারতীয় এয়ার মার্শাল ম্যালকম উলেনের নাম ইতিহাস স্মরণ রাখবে। এছাড়া খেলাধুলা, প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও তাদের ব্যাপক অবদান আছে।
অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান সমপ্রদায় ভারতের একমাত্র সমপ্রদায় যাদের ভারতের পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ লোকসভায় দুইজন মনোনীত প্রতিনিধি রয়েছেন। অল ইন্ডিয়া অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশনের প্রথম ও আজীবন সভাপতি ফ্রাংক এনথনির মাধ্যমে নেহরু এই সুবিধা দেন। অন্ধ্র প্রদেশ, তামিলনাড়ু. বিহার ,কর্ণাটক, কেরালা এবং কলকাতায় রাজ্য প্রতিনিধি সভায় অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান প্রতিনিধি নিয়োগের বিধান আছে।
