শিক্ষক নিয়োগ প্রশ্নে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সুপারিশ

আপডেট : ১৩ জানুয়ারি ২০১৩, ২১:২৫
রাষ্ট্রপতির বরাবরে প্রেরিত বার্ষিক প্রতিবেদনে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে বর্তমান নিয়মে পরিবর্তন আনিবার সুপারিশ করিয়াছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলি জনগণের টাকায় পরিচালিত হয় বিধায় এইগুলির সর্বোচ্চমান রক্ষায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সর্বোচ্চ দৃষ্টিদানের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। শিক্ষক নিয়োগে নূতন নিয়ম প্রস্তাবনার মাধ্যমে কমিশন সেই গুরুত্ব পালন করিয়া সচেতন মহলের ধন্যবাদপ্রাপ্ত হইয়াছেন। বর্তমানে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে শিক্ষক পদে নিয়োগদানের ক্ষেত্রে শিক্ষাজীবনের পরীক্ষার, বিশেষত সম্মান ও মাস্টার্স পরীক্ষার ফলাফলই প্রধান বিবেচ্য। স্কুল-কলেজ পরীক্ষার ফল, নিয়োগ বোর্ড আয়োজিত মৌখিক পরীক্ষাও যে কিছুটা গুরুত্ব পায় না তাহা নহে। তবে কমিশন এইটুকুকে যথেষ্ট মনে করিতেছে না। কমিশন মনে করিতেছে, শিক্ষক নিয়োগে লিখিত ও মৌখিক উভয় ধরনের পরীক্ষা থাকা উচিত; ইহাছাড়াও প্রার্থীর শ্রেণীকক্ষে পাঠদানের দক্ষতা আছে কিনা তাহাও সরাসরি যাচাই করিয়া লওয়া উচিত। একবিংশ শতাব্দীর এই বিশ্বে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলি হইতে ডিগ্রিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীরা স্বাভাবিকভাবেই দেশ-বিদেশে তীব্র প্রতিযোগিতার মধ্যে পড়িতেছে। এমতাবস্থায় মেধা নির্মাণের কারিগরদের নিয়োগের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ মান নিশ্চিত করিবার ক্ষেত্রে শূন্য-শৈথিল্য প্রদর্শনই কাঙ্ক্ষিত। এইভাবে দেখিলে মঞ্জুরি কমিশনের সুপারিশটি অনতিবিলম্বে বাস্তবায়িত হওয়াই বাঞ্ছনীয়। তবে স্মরণে রাখিতে হইবে যে, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে নূতন নিয়ম প্রচলনই প্রধান বিষয় নহে। একান্ত কাঙ্ক্ষিত ফললাভ করিতে চাহিলে শিক্ষক নিয়োগের নূতন নূতন নিয়মাবলী চালুর পূর্বে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলিকে অর্থনৈতিক দৈন্যাবস্থা হইতে বাহির করিয়া আনিবার দায়িত্বটি পালন করিতে হইবে রাষ্ট্রকেই। কিন্তু আমরা যেন বুঝিয়াও বুঝিতেছি না। নানাবিধ অনুত্পাদনশীল খাতে বরাদ্দের তেমন কোন অভাব দেখা যায় না। কিন্তু সাধারণ উচ্চশিক্ষা খাতের কথা আসিলেই অর্থের অভাবের কথা শুনিতে হয়! অনেকে আবার ছাত্র-ছাত্রীদের বেতন বাড়াইয়া বিশ্ববিদ্যালয়গুলিকে খরচ নির্বাহ করিবার উপদেশ দিয়া থাকেন। অন্যান্য যুক্তি বাদ দিলেও একটু চিন্তা করিলেই দেখা যাইবে যে, ছাত্র-ছাত্রীদের উপরে বেতনের ছুরি যত বৃহত্ করিয়াই চালানো হউক না কেন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলিকে বিশ্বমঞ্চে পাল্লা দেওয়ার উপযোগী করিয়া তুলিবার ক্ষেত্রে তাহা হইবে মরুবক্ষে শিশিরবিন্দুবত্। আমাদের বক্তব্য এই যে, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগের ব্যাপারটিকে সর্বোচ্চ মানসম্মত করিবার জন্য, সকল সন্দেহের ঊর্ধ্বে রাখিবার জন্য কমিশনের সুপারিশকে সর্বোচ্চ গুরুত্বের সহিত বিবেচনা করা হউক। একই সাথে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মাত্রাতে বিনিয়োগের মাধ্যমে সর্বোচ্চ মাত্রায় লাভবান হইবার ব্যাপারটি বাস্তবায়ন করিবার পদক্ষেপ অনতিবিলম্বে শুরু হউক। তাহা না হইলে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে নিয়মের পর নিয়ম চালু করিয়াও আসল কাজ হইবে না। কেননা শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে মান যাচাই যতখানি গুরুত্বপূর্ণ, ঠিক ততখানি গুরুত্বপূর্ণ হইতেছে সেরা মেধাগুলিকে ধরিয়া রাখিবার নিমিত্তে আলাদা বেতন কাঠামো, মানোন্নয়নের নিমিত্তে নবীন শিক্ষকদের উচ্চতর প্রশিক্ষণের সুবিধাদি, যথাযথ অঙ্কের গবেষণা ভাতা বরাদ্দের মতো বিষয়াদি। এখন অবধি কিছু ব্যতিক্রম বাদে বাংলাদেশে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে শ্রেণীকক্ষের সেরা শিক্ষার্থীরা সাধারণত নিজ নিজ বিভাগে শিক্ষক পদে নিযুক্তিলাভের স্বপ্ন দেখিয়া থাকে। কিন্তু বাজার অর্থনীতির এই যুগে এইহেন স্বপ্ন পোষণের ধারা আর কতদিন অব্যাহত থাকিবে তাহা নিশ্চিত করিয়া বলা যায় না। এমতাবস্থাতে সকল ধরনের যাচাইয়ের মধ্য দিয়া আসা উচ্চ মেধার অধিকারী তরুণ-তরুণীদের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ধরিয়া রাখাটাই হইবে সামনের দিনের বড় চ্যালেঞ্জ। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন তথা সরকার কতটা জনমুখী উপায়ে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে তাহাই হইবে দেখিবার বিষয়।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন