জন্মেছিলেন তিনি ফরিদপুরের গোপালগঞ্জে। আর এ কারণেই ২০০০ সালের মে মাসে ওই সময়ের আওয়ামী লীগ সরকার তাকে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের (সিইসি) দায়িত্ব দিলে বিএনপি তীব্র বিরোধিতা করে। বিশেষত তার বাড়ি গোপালগঞ্জে বলে সহজেই তাকে আওয়ামী লীগ বানিয়ে দেন। তার অধীনে নির্বাচনেও যাবে না বলে ঘোষণা দেয় বিএনপি। এমনকি হরতাল পর্যন্ত দেওয়া হয়। এরপরের ইতিহাস সবাই জানেন। ২০০১ সালে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ওই নির্বাচন কমিশনের অধীনেই যোগ দেয় বিএনপি। শুধু তাই নয়, গোপালগঞ্জে জন্ম নেয়া ওই মানুষটির নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত নির্বাচনেই জয়ী হয় বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট। হেরে যায় আওয়ামী লীগ। সেই সঙ্গে রাতারাতি পরিস্থিতি পরিবর্তিত হয়ে যায়। আওয়ামী লীগই এবার তাদের করা নির্বাচন কমিশন নিয়েই প্রশ্ন তোলে। পরিস্থিতি এমনই যে, শেষ পর্যন্ত ওই আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নিয়োগ দেয়া ওই কমিশনের বিরুদ্ধেই অবস্থান নেয় আওয়ামী লীগ।
শেষ পর্যন্ত গত শনিবার তার মৃত্যুর পর প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর কিংবা আওয়ামী লীগ কার্যালয় থেকে কোন শোকবার্তা দেখা যায়নি। তবে নিয়োগের সময় আওয়ামী লীগ বলে তার বিরুদ্ধে অনাস্থা আনলেও এখন তাকেই নিরপেক্ষ সিইসি অভিহিত করে শোক প্রকাশ করেছে বিএনপি। আলোচিত আর সফল এ মানুষটির নাম এম এ সাঈদ। শনিবার সকাল পৌনে সাতটায় চলে গেছেন না ফেরার দেশে। রাজধানীর গুলশানের নিজ বাড়িতে ৭৬ বছর বয়সে মারা গেছেন সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার এম এ সাঈদ। ২০০০ সালের মে থেকে ২০০৫ সালের মে মাস পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশের সিইসির দায়িত্ব পালন করেন। এর আগে দীর্ঘ কর্মময় জীবনে তিনি স্বরাষ্ট্র, শিক্ষা, কৃষি, মত্স্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিবের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ওয়াশিংটনে বিশ্বব্যাংকের পরিচালক এবং সিকিউরিটি এক্সচেঞ্জ কমিশনের চেয়ারম্যানেরও দায়িত্ব পালন করেন।
নির্বাচন কমিশনে যোগ দেয়ার পর পেশাগত কারণে ঘনিষ্ঠভাবে তাকে পুরো ৫ বছর মেয়াদই কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছিল। নির্বাচন কমিশনে রাজনৈতিক দলের নিবন্ধনসহ নির্বাচনী সংস্কারের বিভিন্ন কাজ তার সময়েই শুরু হয়েছিল। যদিও তার আগের সিইসি আবু হেনা এসব কাজের প্রাক প্রস্তুতি পর্ব রেখে গিয়েছিলেন। কোন সমস্যা হলে এম এ সাঈদ কথা বলে নিতেন আবু হেনার সঙ্গে। নির্বাচনী আইনসহ বিভিন্ন কাজ-কর্ম মোটামুটি মুখস্ত ছিল আবু হেনার। নির্বাচন কমিশনে শেষ দিকের দিনগুলো ভাল যায়নি এম এ সাঈদের। বিশেষ করে কমিশন সচিবালয়ের একাধিক উচ্চপদস্থ আমলা তার বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। কারণ ছিল একটাই অনৈতিকভাবে কোন তদবির কিংবা সুপারিশই গ্রহণ করতে চাইতেন না। মানবিক গুণসম্পন্ন দৃঢ় চরিত্রের একজন মানুষ হিসেবে শেষ পর্যন্ত আপস করেননি তিনি।
তাকে নিয়ে অনেক ঘটনার মধ্যে একটি ছোট ঘটনার কথা উল্লেখ না করলেই নয়। ২০০৫ সালের শুরুর দিকের ঘটনা। ওই সময়কার বিএনপি সরকারের একজন প্রভাবশালী মন্ত্রী সুপারিশ করলেন তার এ আত্মীয়কে (নন ক্যাডার পদ) বদলি করে গাজীপুরে আনতে। মন্ত্রীর কথা অনুসারে ওই সময়ে কমিশন সচিবালয়ের একজন শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তা তার আত্মীয়কে বদলি করে গাজীপুরে পাঠালেন। আর গাজীপুরে কর্মরত চারমাস বয়সী শিশুর মাকে বদলি করে দিলেন অন্যত্র। বিষয়টি এম এ সাঈদের নজরে আসার পর তিনি মানবিক কারণে হলেও এ আদেশ বাতিল করার নির্দেশ দেন। কিন্তু সিইসির সে নির্দেশ কার্যকর তো হচ্ছিল না, উল্টো ওই নারী কর্মকর্তাকে স্ট্যান্ড রিলিজ করার নির্দেশ দেয়া হয়। এখবর শুনে ক্ষিপ্ত হয়ে সিইসি সাঈদ সংশ্লিষ্ট ওই কর্মকর্তাকে ডেকে বলেন, ‘আপনি মন্ত্রীর চাকরি করেন, তাই নিজের সচিবালয়ের সম্মানও রাখতে পারেন না।’ এরপর তিনি নিজে ওই বদলি আদেশ বাতিল করে লিখে দেন, তাকে না জানিয়ে এ ব্যাপারে কোন কিছু করা যাবে না। যত চাপই আসুক না কেন? এরপর ওই যাত্রায় সেই বদলি আদেশ রহিত হয়।
স্বচ্ছ ও অবাধভাবে নির্বাচন করতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ছিলেন তিনি। নির্বাচনে কোন ধরনের কারচুপি মানতে রাজি ছিলেন না তিনি। আর এজন্য তিনি সবসময় গণমাধ্যমকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করতেন। বলতেন, শক্তিশালী গণমাধ্যম ছাড়া সুষুম এবং অবাধ নির্বাচন করার সম্ভব নয়। সে কারণে সব নির্বাচনে তিনি সাংবাদিকদের বেশি বেশি সরেজমিন যেতে উত্সাহিত করতেন।
২০০২ সালে এক উপ-নির্বাচনের ভোট গ্রহণ দেখতে সিইসির সঙ্গে আমরা পাঁচ সাংবাদিক ফরিদপুরে যাই। সকালে হেলিকপ্টারে উঠেই সিইসি সাংবাদিকদের বললেন, ‘আপনারাই কিন্তু কমিশনের চোখ। আপনারা খোঁজ নেবেন, ভোট ঠিকমত হচ্ছে কিনা? অফিসারদের চেয়ে আপনাদের উপরই কিন্তু আমার আস্থা বেশি।’
প্রথম কেন্দ্রে গিয়েই তিনি ভোট কেন্দ্রের ভেতর এক তরুণকে ধরে ক্ষিপ্তভাবে বাইরে চলেন আসেন। তার সন্দেহ ছেলেটি ভোটার কিনা? ছেলেটি নিজেই এক পর্যায়ে স্বীকার করে সে জাল ভোট দিতে এসেছিল। ক্ষুব্ধ সিইসি এত কম বয়সে জাল ভোট দেয়ায় তাকে ভর্ত্সনা করে ভোট শেষ না হওয়া পর্যন্ত আটকে রাখতে পুলিশকে নির্দেশ দিলেন। এসময় সিইসির সফরসঙ্গী কমিশনের একজন কর্মকর্তা ওই তরুণকে ছেড়ে দেয়ার সুপারিশ করলেন। ক্ষুব্ধ সিইসি ওই তরুণকে তো ছাড়লেনই না ওই কর্মকর্তাকে দিনভর ওই কেন্দ্রের দায়িত্ব দিয়ে চলে গেলেন। এরপর ওই নির্বাচনে আর জাল ভোটের খবর পাওয়া যায়নি। এই ছিলেন এম এ সাঈদ। ১৯৩৭ সালে গোপালগঞ্জে জীবনযাত্রা শুরু করে গত শনিবার শেষ করলেন ঢাকার গুলশানে। তাকে নিয়ে দলীয় রাজনীতি হলেও আসলে তিনি ছিলেন এসবের ঊর্ধ্বে। তাই তার নিয়োগ নিয়ে হরতাল করা কিংবা তার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ না করা— এসবে কিছুই যায় আসে না তার। শেষ অভিবাদন এম এ সাঈদ।
লেখক :সাংবাদিক
[email protected]
