বাহরাইনের রাজধানী মানামায় সংঘটিত এক অগ্নিকাণ্ডে মর্মান্তিকভাবে নিহত হইয়াছেন ১৩ জন প্রবাসী শ্রমিক। আহত হইয়াছেন আরও দুইজন। গত শুক্রবার বিকালে মানামার মুখারকা এলাকার তিনতলা একটি ভবনে এই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড সংঘটিত হয়। নিহত ১৩ জনের মধ্যে ১১ জনের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গিয়াছে। তাহাদের প্রায় সকলেই চট্টগ্রাম, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চাঁদপুর ও নোয়াখালীর দরিদ্র পরিবারের সন্তান। জীবিকার সন্ধানে শেষ সম্বলটুকু বিক্রি কিংবা ধারকর্জ করিয়া পরিবার-পরিজন ফেলিয়া তাহারা প্রবাসে পাড়ি জমাইয়াছিলেন। স্বপ্ন দেখিয়াছিলেন অভাব-জর্জরিত চিরদুঃখী পরিবারের ভাগ্য পরিবর্তনের। শুধু এই আশায় প্রবাস-জীবনের সকল দুঃখ-কষ্টকে মাথা পাতিয়া নিয়াছিলেন। কিন্তু সর্বগ্রাসী আগুন শুধু তাহাদের জীবনই কাড়িয়া নেয় নাই, একই সাথে চুরমার করিয়া দিয়াছে হতভাগ্য পরিবারগুলির স্বপ্নও। অনেকে হারাইয়াছেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্যকে। তদুপরি আছে অপরিশোধিত ঋণের বিশাল বোঝা। সব মিলাইয়া, তাহাদের সামনে এখন শুধুই অন্ধকার। স্বজনহারানোর শোককেও ছাপাইয়া উঠিয়াছে এক অন্তহীন অনিশ্চয়তা। সর্বব্যাপী এই অনিশ্চয়তাই যেন বাংলাদেশের বিশাল দরিদ্র জনগোষ্ঠীর নিয়তি হইয়া দাঁড়াইয়াছে। অপ্রিয় হইলেও এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করিবার উপায় নাই।
পাশাপাশি, ইহাও অনস্বীকার্য যে নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনে উন্মুখ ও কর্মচঞ্চল এই মানুষগুলিই উপর্যুপরি অর্থনৈতিক মন্দার মধ্যেও আমাদের অর্থনীতিকে সচল রাখিয়াছে। কাজের সন্ধানে বিদেশে পাড়ি জমাইতে গিয়া নিয়ত প্রতারিত হইতেছে। মরিতেছে উত্তাল সমুদ্রের পানিতে ডুবিয়া কিংবা দুর্গম কোনো মরুভূমিতে পথ হারাইয়া। কিন্তু সকল বাধাবিপত্তি অগ্রাহ্য করিয়া তাহারা ছড়াইয়া পড়িতেছে বিশ্বব্যাপী। লক্ষ লক্ষ মানুষ এখন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কর্মরত। তাহাদের প্রেরিত বিপুল পরিমাণ অর্থ শুধু যে নিজ নিজ পরিবারের ভাগ্যবদল করিতেছে তাহাই নহে, একই সাথে জাতীয় অর্থনীতিতেও সঞ্চার করিয়াছে বিশাল প্রাণপ্রবাহ। আমাদের অর্থনীতির অন্যতম বৃহত্তম খাত তৈরি পোশাক শিল্পের চিত্রও ভিন্ন নহে। এইখাতে কর্মরত শ্রমিকের সংখ্যাও দিন দিন বাড়িয়া চলিয়াছে। নামমাত্র মজুরি, অস্বাস্থ্যকর ও অনিরাপদ পরিবেশ এবং একের পর এক দুর্ঘটনা তাহাদের নিত্যসঙ্গী। মাত্র কিছুদিন আগেই সাভারের একটি পোশাক কারখানায় অসহায়ভাবে আগুনে পুড়িয়া মরিয়াছে শতাধিক শ্রমিক। তাহা সত্ত্বেও তীব্র প্রতিযোগিতাময় এই বিশ্বে আমাদের পোশাক শিল্প যে নিরন্তর সাফল্য অর্জন করিয়া চলিয়াছে তাহার মূলে রহিয়াছে এইসব শ্রমজীবী মানুষের বিপুল অবদান। মানামাতে যাহা ঘটিয়া গিয়াছে সেই ধরনের দুর্ঘটনা হয়তো আমরা রুখিতে পারিব না, তবে আর একটু আন্তরিক হইলেই স্বউদ্যোগে কর্মসংস্থান ও জীবনমান উন্নয়নে উন্মুখ এই মানুষগুলির দুর্দশা-দুর্ভোগের মাত্রা যে কিছুটা হইলেও লাঘব করিতে পারি তাহাতে সন্দেহ নাই।
আশার বিষয় হইল, মানামার অগ্নিকাণ্ডে নিহত শ্রমিকদের বিষয়টিকে সরকার খুবই গুরুত্বের সাথে দেখিতেছে। ইতোমধ্যে নিহতদের পরিবারপ্রতি দুই লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণের ঘোষণা দেওয়া হইয়াছে। আমরা জানি যে এই ক্ষতি কোনোভাবেই পূরণ হইবার নহে। তবু আর্থিক ক্ষতিপূরণের বিষয়টি অত্যন্ত জরুরি বলিয়া আমরা মনে করি। পাশাপাশি, এইসব পরিবারের কর্মক্ষম সদস্যদের কর্মসংস্থানসহ আনুষঙ্গিক অন্যান্য সহায়তার বিষয়টিও গুরুত্বের সাথে বিবেচনায় রাখা দরকার। মর্মান্তিক এই দুর্ঘটনায় আমরা শোকাহত। নিহতদের শোকাভিভূত স্বজনদের প্রতি আমরা গভীর সমবেদনা জানাই।
