স্মরণ

নওয়াব সলিমুল্লাহ :এ জাতির আত্মা

আপডেট : ১৫ জানুয়ারি ২০১৩, ২০:৫৩
জাতীয় স্বার্থে সর্বস্বত্যাগী মহান নেতা নওয়াব স্যার খাজা সলিমুল্লাহ বাহাদুরের আজ ১৬ জানুয়ারি, বুধবার ৯৮তম মৃত্যুবার্ষিকী, ১৮৭১ সালের ৭ই জুন পুরনো ঢাকার আহসান মঞ্জিলে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। বাংলার ১০০ বছর পূর্বের ইতিহাস যদি আমরা স্মরণ করি, জানার চেষ্টা করি, তবে অবশ্যই নওয়াবের মহত্ত্ব আমরা উপলব্ধি করতে সক্ষম হব। এ জাতির ত্রাণকর্তা হিসেবে তিনি আবির্ভূত হন। জীবদ্দশায় তিনি নিজের সর্বস্ব বিলিয়ে দিয়ে বঞ্চিত, দিশেহারা, নেতৃত্বহীন বাংলার মুসলমানদেরকে একই পতাকাতলে ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন। ঐ সময়কালে উপমহাদেশের মুসলমানদের অবস্থা ছিল অত্যন্ত শোচনীয়। তিনি হতাশার সমুদ্রে একটি মনোরম ও নির্ভরযোগ্য দ্বীপ গড়েন। সে দ্বীপকে কেন্দ্র করে আজকের স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের অস্তিত্ব সম্ভব হয়েছে। বিশেষভাবে বাংলাদেশের মুসলমানদের জন্য তিনি সর্বোত্কৃষ্ট আদর্শ পুরুষ। তার চর্চিত আদর্শ ছিল প্রথমে নিজে সত্যিকারের জ্ঞানী হও এবং নেতৃত্বের উপযুক্ত মুসলমানদের একই প্লাটফর্মে ঐক্যবদ্ধ কর। সঠিক নেতৃত্বের মাধ্যমে জাতির ১৭৫৭ পূর্ব হূতগৌরব পুনরুদ্ধার কর এবং শান্তিপূর্ণ ও অহিংস পন্থায় লক্ষ্য অর্জন কর। জাতির যদি আত্মা কল্পনা করা যায় তবে নওয়াব সলিমুল্লাহই এ জাতির আত্মা। তিনি আমাদেরকে মুসলিম জাতীয়তাবোধে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন বলেই আমরা ১৯৪৭ সালে ভারতের অংশ না হয়ে পাকিস্তানের অংশ হয়েছিলাম এবং ১৯৭১ সালে পাকিস্তান থেকে বেরিয়ে স্বাধীন হয়েছিলাম। স্বতন্ত্র চেতনায় উদ্বুদ্ধ না হলে আমাদের অস্তিত্ব থাকত না। পূর্ব বাংলার বঞ্চিত, অবহেলিত মানুষদের অধিকার আদায়ের কথা ভেবেই ১৯০৫ সালে নওয়াব সলিমুল্লাহ ব্রিটিশ সরকারের বঙ্গভঙ্গ নীতিকে সমর্থন করেছিলেন। ১৯০৫ সালে বঙ্গদেশ ভাগ করে দুটি প্রদেশ হয় এবং ঢাকা পূর্ব বাংলা ও আসাম প্রদেশের রাজধানী হয়েছিল। ১৯০৬ সালে তার খরচে ঢাকায় সর্বভারতীয় মুসলিম নেতৃবৃন্দকে একত্রিত করে ৩০ ডিসেম্বর নিখিল ভারত মুসলিম লীগ গঠন করেন। কিন্তু কংগ্রেসী নেতৃবৃন্দ ও হিন্দু বুদ্ধিজীবীগণ নওয়াব সলিমুল্লাহর এ প্রচেষ্টাকে বানচাল করতে উঠেপড়ে লাগেন। নতুন প্রদেশে মুসলমানদের উচ্চ শিক্ষার জন্য নওয়াব সলিমুল্লাহ ব্রিটিশ সরকারের নিকট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য চাপ দিতে থাকেন। ব্রিটিশ সরকার বাধ্য হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কথা ঘোষণা করে। নওয়াব সলিমুল্লাহ সেটা বাস্তবায়নে যথাসাধ্য চেষ্টা চালাতে থাকেন। অন্যদিকে কংগ্রেস নেতৃবৃন্দ ও হিন্দু বুদ্ধিজীবীরা এর তীব্র বিরোধিতা শুরু করেন। তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে বাংলা ভাষার ক্ষতি হবে, সরকারের অর্থ অপচয় হয়ে জনগণের দুর্দশা বাড়বে ইত্যাদি ধুয়া তুলে এর বিরোধিতা করেন। তাদের বিরোধিতার কারণে যদি সেদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা না হতো তাহলে বাংলাদেশের ইতিহাস বদলে যেতো। দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, এ বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনে সেদিন অনেকেই এর প্রচণ্ড বিরোধিতা করেছিলেন এবং ‘মক্কা বিশ্ববিদ্যালয়’ বলে কটাক্ষ করেছিল। মুসলিমশূন্য ভারতের যারা নেতৃত্ব দিতে চেয়েছিলেন তাদেরকে আজ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কর্তৃক কারণে-অকারণে যেভাবে পূজা করা হয় তা অত্যন্ত কষ্টকর ও বেদনাদায়ক। অথচ নওয়াব সলিমুল্লাহ যিনি জীবন দিয়ে প্রতিষ্ঠানটি গড়েছিলেন তিনি সেখানে প্রায় অনুপস্থিত। বর্তমানে বাংলাদেশে যেসব আলিয়া মাদ্রাসা রয়েছে, সেগুলো মূলত নওয়াব সলিমুল্লাহর অনুসৃত নীতিরই পরিমার্জিত রূপ। ১৮৯৯ সালে যখন হিন্দু মহাসভায় মুসলিমশূন্য ভারতের প্রস্তাব গ্রহণ করা হয় পৃথক জাতিসত্তার প্লাটফর্ম হিসেবে। অত:পর নওয়াব স্যার সলিমুল্লাহ নিখিল ভারত মুসলিম লীগ গঠন করে এতদাঞ্চলের মুসলমানদেরকে মুক্তি দিয়েছিলেন। নওয়াব সলিমুল্লাহ মুসলমানদের হারানো গৌরবকে পুন:প্রতিষ্ঠার শুভ সূচনা করে জাতির ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন। লেখক :গবেষক, সংগঠক, চেয়ারম্যান, ঐতিহ্য ফাউন্ডেশন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন