প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ সব সময়ই গুরুত্বপূর্ণ। গুরুত্বপূর্ণ এজন্য যে, তিনি এই জাতির সরকার প্রধান। একটি দেশের হাজারো সমস্যা থাকে। মানুষ সমস্যা থেকে মুক্তি চায়। প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে থাকবে জনগণের সেই আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিধ্বনি। থাকবে আশ্বাস, বিশ্বাস এবং ভবিষ্যত্। প্রধানমন্ত্রীর গত সপ্তাহের ভাষণ নিয়ে জনসাধারণের কথোপকথন, আলাপচারিতা, আলোচনা এবং সমালোচনাকে তিন শ্রেণীতে ভাগ করা যায়: প্রশংসাসূচক, নিন্দাসূচক এবং ভীতিসূচক।
ভালো হোক আর মন্দ হোক নিজের ঘোলকে ভালোই বলতে হবে। আওয়ামী লীগের কর্মীরা স্বাভাবিকভাবেই প্রশংসা করছেন। বিরোধীপক্ষ এতে কোন ভালোই দেখছেন না। এর বাইরে যারা আছেন তারা তৃতীয় মতের। হয়তোবা ডান, হয়তোবা বাম অথবা নিরপেক্ষ অথবা নিরেট মূর্খ। তবে এদের অধিকাংশই মুখ খুলতে নারাজ। কারণ ভীতির মধ্যে আছে তারা। তারা বলছে দেয়ালেরও কান আছে। সরকারি গোয়েন্দা বাহিনীর লোকেরা কিলবিল করছে। তারচেয়েও ভয়ঙ্কর ক্ষমতাসীন লোকেরা। তারা বিরূপ কোন মন্তব্য শুনতে রাজি নয়। সত্যিই কি তাই? উত্তর পাওয়া যাবে জেফারশনের উক্তিতে : “when government fears the people, there is democracy, when people fears the government there is tyranny.” কোনটি সত্য, কোনটি মিথ্যা মীমাংসার দায়ভার জনগণের” এটা হলো ভাষণ বিষয়ক সাধারণ প্রতিক্রিয়া। এবার মূল ভাষণ বা বিষয়বস্তুতে আশা যাক।
প্রধানমন্ত্রীর ভাষণকে স্রেফ তিনটি শব্দে ব্যাখ্যা করা যায়: স্মরণ, অর্জন এবং বর্জন। স্মরণ এজন্য যে, তিনি প্রথামাফিক গতানুগতিকভাবে তার পিতার প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন করে বক্তব্য শুরু করেছেন। তিনি স্বাধীনতার শহীদানদেরও স্মরণ করেছেন। এর পরের দীর্ঘ অংশ জুড়ে সঙ্গতভাবেই বিগত চার বছরে তার সরকারের অর্জনসমূহ ব্যাখ্যা করেছেন। এর পরের অংশ বর্জন এজন্য যে, তিনি তার বিরোধী শক্তিকে বর্জন করতে বলেছেন। যথারীতি মেঠো বক্তৃতায় যা সবসময় বলে থাকেন তাই বলেছেন।
তার মানে কি এই যে, তার বক্তৃতায় সারবত্তা কিছুই নাই? অবশ্যই আছে।
বক্তৃতার ইতিবাচক দিক: সংঘাতের পথ পরিহারের আহ্বান, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের ঘোষণা, বাংলাদেশ উত্থাপিত এবং জাতিসংঘে গৃহীত উন্নয়ন মডেল-২০১২, দেশের উন্নয়নে জনগণের অংশগ্রহণ, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী, অর্পিত সম্পত্তি, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদারকরণ ইত্যাদি। একটি সরকারের সব কাজই সর্বাঙ্গীন সুন্দর হয় না, সম্ভবও নয়। তেমনি এ সরকার যা করেছে সবই ব্যর্থতার দলিল এমন মনে করার কোন কারণ নেই। শিক্ষা খাতে সরকারের অবদান উল্লেখযোগ্য। কৃষিক্ষেত্রে খাদ্যে প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণতা তাদেরই অবদান। ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার প্রয়াস সর্বত্র লক্ষণীয়। বিদ্যুতের সঙ্কট অনেকটা দূরীভূত, যদিও অনেক মূল্যের বিনিময়ে। কিন্তু সবগুলো ম্লান হয়ে যায় দুর্নীতির প্রমাণে, লালিত সন্ত্রাসে এবং নিরঙ্কুশ দলীয় মনোভাবে।
নেতিবাচক দিক: তত্ত্বাবধায়ক ইস্যু নিয়ে কোন কথা না বলা, পদ্মা সেতুর উল্লেখ না করা, ভারতীয় সীমান্ত হত্যা সম্পর্কে নীরবতা, ইউটিলিটি সার্ভিস অর্থাত্ তেল, গ্যাস তথা জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধির ব্যাখ্যা না দেয়া, নারীর প্রতি ক্রমবর্ধমান সহিংসতার কোন তোয়াক্কা না করা, শিক্ষকদের এম পি ও ভুক্তির বিষয়ে নির্বিকার মনোভাব ইত্যাদি।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের পরে যেখানেই থাকুন ড্রয়িংরুমে, দোকানে অথবা ক্লাবে অথবা অন্য কোনখানে কিছু মন্তব্য, কিছু বক্তব্য ভেসে আসা খুবই স্বাভাবিক। যেমন আমি যেখানে ছিলাম সেখানে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের পর উত্থাপিত প্রশ্ন ও মন্তব্যগুলো ছিল এরকম:
দুর্নীতির বিষয়ে কঠোর অবস্থান কখন নিলেন? আবুলরা তো এখনও বহালতবিয়তে আছে। নির্বাচনের সব অঙ্গীকার পূরণ করেছেন? বাজারে দ্রব্যমূল্যের অসহনীয় বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণের কোন পদক্ষেপ নিয়েছিলেন? বা নিচ্ছেন? তিনি বললেন, সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে স্বাধীন মত প্রকাশের স্বাধীনতা ছিল না, এখন কি আছে? একজন উদাহরণ দিল:দেয়ালে ওয়াজ মাহফিলের পোস্টার লাগাতে গিয়েছেন কয়েকজন মাদ্রাসা ছাত্র, সেখানকার বেয়াকুফ ওয়ার্ড কমিশনার সবাইকে পুলিশে ধরিয়ে দিয়েছেন। পুলিশের সাথে বাহাস করে লাভ হয় নাই। পুলিশ বলেছে, নেতার আদেশ ছাড়লে আমাদের চাকরি যাবে।
আন্তর্জাতিক অর্থ সংস্থা সরকারের প্রশংসা করেছে-বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। শ্রোতার প্রশ্ন, আই এম এফ-এর পরামর্শে জ্বালানির দাম বৃদ্ধির কারণেই কি এ প্রশংসা? পদ্মা সেতুতে বিশ্বব্যাংকের দুর্নীতি উদঘাটন প্রশংসাসূচক কিনা? প্রধানমন্ত্রী বলেছেন: দুর্নীতি দমন কমিশন স্বাধীনভাবে কাজ করছে। প্রশ্ন হলো, যে কমিশন তিন পা যেতে দুবার থামে একি স্বাধীনতার প্রমাণ? তিনি বলেছেন, বিচার বিভাগ সম্পূর্ণ স্বাধীন। শ্রোতার প্রশ্ন, সেজন্যই কি বি এন পি মহাসচিব মীর্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জামিন পাচ্ছেন না? আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান এ কোর্ট থেকে অন্য কোর্টে ঘুরছেন। আইন- শৃঙ্খলার উন্নতি হয়েছে। এমন মন্তব্যের জবাবে শ্রোতা হিসেবে উপস্থিত অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী এক নামজাদা প্রফেসর বললেন: পুলিশের হাতকড়া পরা অবস্থায় মৃত্যুবরণ এবং অপরাধীদের সপ্তাহ শেষেও খোঁজ-খবর না পাওয়া কি আইন ও শৃঙ্খলা উন্নতির উদাহরণ? শ্রোতামণ্ডলীর চেয়ে আরও কঠিন বিরোধী দলের প্রতিক্রিয়া। খবর এরকম: জাতির উদ্দেশে দেয়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাষণকে গতানুগতিক মিথ্যাচার আখ্যা দিয়ে তা প্রত্যাখ্যান করেছে বি এন পি। গত রবিবার নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও মুখপাত্র তরিকুল ইসলাম বলেন: দেশে যে রাজনৈতিক সঙ্কট তৈরি হয়েছে তা নিরসনে একটি কথাও শেখ হাসিনা বলেননি, বরং তিনি তার সরকারের অধীনেই আগামী জাতীয় নির্বাচন করার আশা আবার ব্যক্ত করেছেন। তরিকুল বলেন: এ ভাষণে ফুটে উঠেছে ক্ষমতার দম্ভ। জনগণের অধিকার, গণতন্ত্র এবং জনমতের প্রতি চরম পরিহাস।
দেশের প্রচার মাধ্যমেও প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে হতাশা ফুটে উঠেছে। চ্যানেলগুলোর টকশো, পত্রিকাগুলোর সম্পাদকীয় ও অন্যান্য লেখা, নামি-দামি কলামিস্টদের কলাম-সার্বিক হতাশার কথাই প্রতিফলিত হয়েছে। প্রতীকী অর্থে প্রভাবশালী ডেইলি স্টারের মন্তব্য উল্লেখ করা যায়: “Her seeking reelection would have been convincing if she had clearly outlined her plan of action for the next one year and approached the question of smothering the thorny path to next election, thus public expectation have, by at large, gone unmet”
স্বাধীনতা যুদ্ধের অন্যরকম দিকপাল বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী লিখেছেন: “চারদিকে সমস্যাক্রান্ত একটি রাষ্ট্রের সরকার প্রধান হিসেবে তার ভাষণে যতটা জাতীয় গুরুত্ব পাওয়ার কথা, তাকে যতটা ধীরস্থির উদ্বিগ্ন থাকা দরকার, তার কিছুই লক্ষ্য করা যায়নি। সভা-সমাবেশে তিনি যে রঙে-ঢঙে কথা বলেন বরং সেদিন তারচেয়েও শক্তভাবে তার ভাষণ দিয়েছেন। বহুদিন পর তার ভাষণ শুনে আইয়ুব-ইয়াহিয়ার জাতির উদ্দেশে ভাষণের একই সুর তাল লয় কানে বাজছিল। তার ভাষণে তিনি কোন জাতীয় সমস্যা সমাধানের ইঙ্গিত করেননি”।
প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের সবচেয়ে সমালোচিত অংশ হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে আবারও ১/১১-এর আশঙ্কার কথা। অনেক পত্রিকা হেডলাইন করেছে বক্তৃতার এই অংশটি। বিভিন্ন চ্যানেলে গরম আলোচনা হচ্ছে এ বিষয়ে। আমাদের জাতীয় জীবনের ঐ কলঙ্কিত অধ্যায় নিয়ে লজ্জিত নাগরিক সাধারণ। তারা আজ আতঙ্কিত প্রধানমন্ত্রীর মুখ থেকে ঐ আশঙ্কার কথা শুনে। আমাদের প্রধানমন্ত্রী আশ্বাসবাণী শুনিয়েছিলেন আর ১/১১ আসবে না। ফাঁক-ফোকর বন্ধ করেছেন। সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে এমন সব রক্ষাকবচ রেখেছেন যাতে অসাংবিধানিকভাবে ক্ষমতা দখলের পথ চিরতরে রুদ্ধ হয়ে গেছে। ঐ শক্ত অবস্থানের পর কেমনে কিভাবে ১/১১-এর পুনরাবৃত্তি হতে পারে তা সাধারণ মানুষ বুঝতে অক্ষম। ঐ সময় জাতীয় বুদ্ধিজীবী অনেকে মন্তব্য করেছিলেন যে, আইন করে কঠোর বিধান দিয়ে সামরিক অভ্যুত্থান ঠেকানো যায় না। সামরিক অভ্যুত্থান ঠেকাতে হয় সিভিল সরকারের সুশাসন দিয়ে। গণতান্ত্রিক বিধি- ব্যবস্থা দিয়ে, অর্জিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা দিয়ে। সিভিলিয়ান সুপ্রিমেসি গায়ের জোরে হয় না। কাগজে কঠিন কথা লিখে হয় না। জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতেই এমন অসাংবিধানিক পথ চিরতরে বন্ধ করতে হবে।
++লেখক :অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
