রাষ্ট্রবিজ্ঞানীর ভাষায় “পলিটিক্স ইজ নাথিং বাট ট্রিক্স”। রাজনীতির সংজ্ঞায়ন করতে গিয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানীর ঐরূপ মন্তব্য যুগ যুগ ধরেই সঠিক হিসেবে প্রমাণিত। সরকার পরিচালনার স্বীকৃত এবং প্রতিষ্ঠিত পদ্ধতি যেমন গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, একনায়কতন্ত্র, রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার সবই সকল দেশের জন্য একই। উক্ত বিভিন্ন তন্ত্রের মূল সংজ্ঞার কোন পরিবর্তন হয় না। কোন দেশের সরকার যদি ইচ্ছে মত, খেয়াল খুশী মত কোন তন্ত্রের মৌলিক পরিবর্তন আনেন, তবে তা হবে দোষযুক্ত এবং ভুল। ভুল এর ফল তো ভুলই হয়।
বেশিরভাগ বাংলাদেশি বাঙালিরা আমরা সবকিছুকে ছোট করে দেখতে অভ্যস্ত। যেমন মনে করি, বাংলাদেশটা ছোট, আমরা বাঙালি জাতি হিসেবে ছোট, অর্থনৈতিক দিক থেকে দরিদ্র, বিদ্যায় খাটো, আমাদের মনগুলো ছোট, বাঙালিরা সাইজেও খাটো, ধৈর্য শক্তি একেবারেই কম। তবে সত্য যে, আমাদের যতকিছুকেই ছোট মনে করি না কেন, বাঙালিরা কথা বলে কিন্তু বড় বড়। যা নয়, তার চেয়ে বেশি করে বলতে আমরা পারদর্শী। যেমন বলে: ‘বারো হাত বাঙালি তেরো হাত বিচি’। আবার মারামারি করতে গিয়ে প্রতিপক্ষের নিচে পড়েও, অনেক আঘাত পেয়েও উঠে গায়ের ময়লা ঝাড়তে ঝাড়তে বলে: ‘কী বললাম বেটা তলে পড়েছিলাম, নইলে তোকে দেখিয়ে দিতাম।’ এই আমাদের বিস্ময়কর মানসিকতা। একইভাবে কিছু কিছু শব্দকে আমরা ইচ্ছে মত টেনে লম্বা করে বলতেও অভ্যস্ত এবং ভালবাসি। যেমন: স্কুলকে বলি ইস্কুল, ট্রেনকে বলি টেরেন, ব্রেনকে বলি বেরেন, প্লেনকে বলি পেলেন। তেমনি ট্রিক্সকে বলি টিরিকস্। যেমন বলেন অনেকেই:ব্যাটা আমার সাথে টিরিকস্ করেছে, আমার টিরিকস্ বুঝবার শক্তি আছে কার? ইত্যাদি। আমাদের কাছে টিরিকস্ এখন বাংলা শব্দ হিসেবেই পরিচিতি ভাল করেছে। তবে রাষ্ট্রবিজ্ঞানীর ট্রিক্স এবং আমাদের টিরিকস্ এক নয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানির মতে ট্রিক্স হল রাজনীতি সচেতন মানুষের বুদ্ধিদীপ্ততার কথা, সকল বিষয়ে সুষ্ঠু চিন্তা করার কথা, ব্রেনকে কাজে লাগানোর কথা, সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেবার কথা, ‘রাজার নীতি হল রাজনীতি’ তা রাজনীতিবিদদের আত্মস্থ করার কথা, ইত্যাদি। কিন্তু আমরা ট্রিক্স শব্দের অর্থ বুঝি অন্যভাবে। আমরা বুঝি: ট্রিক্স মানে চালাকি করা। অন্যায়ভাবে কাউকে ল্যাং মেরে তথা ঠকিয়ে নিজের স্বার্থ হাসিল করা। তবে উচ্চারণ টিরিকস্ করলেও বুঝবার সময় শব্দটা ট্রিক্স-ই বুঝি।
রাজনীতির মাঠে ট্রিক্স বা টিরিকস্ এর ব্যবহার খুব বেশি। তারা মনে করেন ইলেকশনে জিততে হলে নিজের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির কথা চিন্তা না করে, প্রতিপক্ষের জনপ্রিয়তা কীভাবে কমানো যায়। প্রয়োজনে প্রতিপক্ষকে পঙ্গু করে দেবার, কোন হত্যা মামলায় বা কোন জটিল মামলায় জড়ানোর এবং কিছুতেই কিছু না হলে ফেলশনি কেস (রেপকেস) এ ফেলার চিন্তাও করা হয়। সবকিছু টিরিকস্ এর সাহায্য নিয়েই করা সম্ভব।
সত্য যে, আমাদের রাজনৈতিক অঙ্গনকে যারা অলংকৃত করে রেখেছেন, তাদের মধ্যে বেশিরভাগই দেশের সর্বোচ্চ ডিগ্রীধারী। কম ডিগ্রীধারীর সংখ্যা কমই। রাজনীতিতে যারা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সম্পৃক্ত তারা সকলেই বিজ্ঞজন, জনগণের দ্বারা নির্বাচিত এবং সবার শ্রদ্ধেয়। স্বীকৃত যে- ‘হুইজ ইলেকেটড হি ইজ বেস্ট ম্যান’। ব্যারিস্টার, উকিল, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, কৃষিবিদ, শিল্পী, সাহিত্যিক, সামরিক কর্মকর্তা এমনকি বিচার বিভাগের লোকজনও রাজনীতির সাথে জড়িত। আগেকার দিনে রাজনীতি করতে চাইলে ছাত্রজীবনেই দলে ও খাতায় নাম লিখাতে হত। আজকালের চিত্র ভিন্ন। যে কোন বয়সেই যে কোন পেশা থেকেই হোক না, সুযোগ অনুকূলে এলেই একজন রাজনৈতিক কর্মী তো বটেই, নেতাও হওয়া যায়। সরকার পরিচালনায় যারা অংশ নেন, তাদের আদর্শ, সুন্দরতা আমাদের রাষ্ট্রীয় জীবনে প্রতিফলিত হবে, তাইই সত্য। সাধারণ নাগরিকেরা তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধির ভাল কিছু দেখলে মুগ্ধ হবে তাও সত্য এবং তাইই হওয়া উচিত। কিন্তু আজকালের চিন্তায় কোথায় যেন একটা গন্ডগোল হয়ে গেছে। নেতা-কর্মীরা সেন্সর ছাড়াই অনেক কথা বলেন যা অনেকের কাছেই ভাল লাগে না; যা না বললেও কোন ক্ষতি হবার নয়। শব্দ চয়ন ও বাক্যগঠন প্রক্রিয়ায় অনেক ত্রুটি থাকার কারণেই সমস্যার সৃষ্টি হয়। কোনরূপ শব্দ দূষণ হ’ল কি না, সাধু-চলিতের মিশ্রণ ঘটলো কিনা ভাববার অবকাশ নেই আমাদের। অনেক শব্দ, অনেক বাক্য, অনেক কথাই চেয়ারের সাথে মেলে না। আমরা যে ভুল করছি এবং ভুল যে করা উচিত নয়, তা ভুল করেও ভাবি না। আমার মনে হয় স্রষ্টার উপর থেকে নির্ভরশীলতা অনেক কমিয়ে আনার জন্যই বোধকরি ভুল করছি বেশি বেশি। সৃষ্টিকর্তাই যে মানুষের ভালমন্দ নির্ধারণ করে রেখেছেন, তিনিই যে সবকিছুর নিয়ন্ত্রণকারী, তাঁর কাছেই যে আমাদের চাইতে হবে, তাঁর কাছেই যে শেষে ফিরে যেতে হবে প্রভৃতি সম্পর্কে ভাবতে ও মানতে আমাদের কৃপণতা আছে। পরের সমালোচনাকে বাইপাস করে যদি নিজের সমালোচনা করা যায় এবং নিজের কোন ভুল থাকলে তা সংশোধন করা যায়, তাহলেই তা হবে বেশি সুন্দর। আমি সুন্দর হলে আরেকজন অবশ্যই আমাকে ভালবাসবে। তাই মানুষের মনে প্রশ্ন থাকা উচিত ঃ আমি সুন্দর হব না কেন? সুন্দর হতে ক্ষতি কি?
আমাদের জাতীয় জীবনের সবচেয়ে উচ্চ মানের, সমালোচনার ঊর্ধ্বের ও সুন্দর প্রতিষ্ঠান হল জাতীয় সংসদ। সংসদ অধিবেশনের চিত্র আগে টেলিভিশনের খবরে অংশবিশেষই দেখানো হত। এখন নিজস্ব চ্যানেল হওয়ায় পূর্ণ অধিবেশন দেখানো হয়। কিন্তু কতজন দেখেন, আমি জানি না। তবে সংখ্যায় যে খুব কম, তা জানি। বিজ্ঞজনেরা আগে যাও একটু দেখতেন, কিন্তু সংসদে বিজ্ঞ সদস্যগণ যে সব বক্তব্য নির্বিবাদে সেন্সার ছাড়াই রাখেন, সে সব শুনে তারা দেখা ছেড়ে দিয়েছেন। ঐসবের কোন উদাহরণ দেবার প্রয়োজন নেই; কারণ সবারই জানা আছে।
এ প্রসঙ্গে আমার বলার যে, সংসদের জন্য আলাদা ভাষা থাকা উচিত। আমাদের থাকলেও তার চর্চা খুবই কম। সুন্দরকে কেউ অবজ্ঞা করলেও, সুন্দরের তাতে অসুন্দর হবার কোন ভয় নেই। বরং অবজ্ঞাকারী নিজেই নিজেকে অবজ্ঞা করেন। যা ভুল এবং সে ভুল বুঝবার ক্ষমতা আমাদের কম। অন্যকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। দোষমুক্ত হলে, তা মঙ্গলকর হবে দেশের জন্য, মানুষের জন্য এবং নিজের জন্য ত বটেই।
ইতিহাসের পাতা উল্টালেই চোখে পড়ে, কত মহান খ্যাতিমান রাজনীতিবিদগণ মানুষের মঙ্গলে অনেক কাজই করে গেছেন, অনেক কথাই বলে গেছেন, যেগুলো আজ নীতিকথা হিসেবে পুস্তকে স্থান পেয়েছে এবং মানুষ তা মুখস্থ করে নিজের জীবনে কাজে লাগাচ্ছে। যাঁরা পৃথিবীর শেষ দিন অবধি মানুষের হূদয়ে বেঁচে রবেন। যারা ইতিহাসের পথ ধরে এগিয়ে চলে, তারাই তো পারেন পৌঁছতে আসল ঠিকানায়। হায়রে মানুষ, তারপরও মানুষ মাঝপথে পথ হারায়! তাইতো সারাক্ষণই নিজের কাছে প্রশ্ন করি, নতুন করে আরকি নতুন কোন নীতিকথার জন্ম হবে না? চাঁদ কখনই ভুল করেও তার পেছনের অংশ দেখায় না; কুিসত জন্যই। চাঁদের স্কুলে ভর্তি হতে দোষ কি? সংসদ ভবন পবিত্র স্থান। যেখান হতে কেবলি মানুষের মঙ্গলই চিন্তা করা যায়। সংসদ ভবনের ভিতরের অবস্থা বাইরের মানুষেরা নাইবা জানলাম, কিন্তু সূর্য উঠা থেকে আবারো উঠা অবধি ভবনের সংরক্ষিত এলাকায় যা কিছু ঘটে তা কেউই দেখেন না। নিজ নিজ দায়িত্ব পালনের প্রতি আমরা মোটেই আন্তরিক নই। সময় থাকতে আবর্জনা পরিষ্কার না করলে এক সময় তা পচে দুর্গন্ধ বেরুবেই; যা সরানোও যাবে না, সহ্যও করা যাবে না। ভবনের ভীতে পচন একদিন অবশ্যই ধরবে। আমার মতো অতি সাধারণ একজন মানুষের চিন্তায় যা খেলে তা হলো : পৃথিবীর আঙ্গিনায় স্পেশালী রাজনৈতিক বিষয়ে শিক্ষা গ্রহণের জন্য পৃথক বিদ্যালয় থাকা প্রয়োজন। যেখানে পাঠ্য বিষয়ে অন্তর্ভুক্ত থাকবে নিজ নিজ দেশের মাতৃভাষা। রাজনীতিতে আসতে হলে উক্ত বিদ্যালয় হতে অবশ্যই ডিগ্রি নিয়ে আসতে হবে। যদি আমার চিন্তা মানুষের চিন্তায় কোনদিন এতটুকুও আঘাত হানতে সহায়ক হয়, সেদিনই সংসদ ভবন হবে সত্যিকার অর্থেই মানুষের জন্য কল্যাণকর প্রতিষ্ঠান। সেদিন কেউ আর ট্রিক্সকে টিরিক্স্ জানবে না। আমার মন বলছে, আজকের ভুলগুলো সময়ের ব্যবধানে সত্যিই ভুল হিসেবে প্রমাণিত হবে।
++লেখক :জেলা ও দায়রা জজ (অবসরপ্রাপ্ত)
