আবারও নির্দয়ভাবে কোপাইয়া রক্তাক্ত করা হইয়াছে এক কলেজ ছাত্রীকে। না, বর্বরতার এইখানেই শেষ নহে। ইহার পর হতভাগ্য সেই মেয়েটির মাথায় ঢালিয়া দেওয়া হইয়াছে এসিড। পিঠে ও হাতে ছুরিকাঘাতের কমপক্ষে পাঁচটি গুরুতর ক্ষতচিহ্ন এবং এসিডে মারাত্মকভাবে ঝলসানো দেহ লইয়া মেয়েটি এখন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়িতেছে। ইহা কোনো সুদূর মফস্বল কিংবা দুর্গম অজপাড়াগাঁয়ের ঘটনা নহে। হূদয়বিদারক এই ঘটনাটি ঘটিয়াছে রাজধানী ঢাকার কেন্দ্রস্থলে এবং প্রকাশ্য দিবালোকে। সংবাদপত্রে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, পূর্ব পরিচয়ের সূত্র ধরিয়া গত মঙ্গলবার সকালে টেলিফোনে মেয়েটিকে ডাকিয়া আনা হয়। ইহার পর ঘটনার সহিত জড়িত দুই যুবক জোরপূর্বক তাহাকে নাজিমুদ্দিন রোডের একটি কাজী অফিসে লইয়া যায়। চাপ দেওয়া হয় বিবাহের জন্য। ইডেন কলেজের চতুর্থ বর্ষের এই ছাত্রী বিবাহে অসম্মতি প্রকাশের সাথে সাথে কাজী অফিসের ভিতরেই তাহার উপর চালানো হয় এই বর্বর আক্রমণ। মেয়েটির সাথে সংশ্লিষ্ট যুবকটির সম্পর্ক যাহাই হউক— ঠাণ্ডা মাথায় সুপরিকল্পিতভাবেই যে এই হামলা চালানো হইয়াছে তাহাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নাই। যুবকটির সাথে থাকা ছুরি ও এসিডই ইহার অকাট্য প্রমাণ হিসাবে উপস্থাপিত হইতে পারে।
ঘটনাটি এতোটাই ঘৃণ্য ও নিন্দনীয় যে, এই ধরনের ঘটনার উল্লেখ করিতেও আমরা সংকোচ বোধ করি। কিন্তু না করিয়াও উপায় নাই। সংবাদপত্রের পাতায় প্রায় প্রতিদিনই ছাপা হইতেছে একের পর এক বীভত্সতার খবর। শিশুরাও রক্ষা পাইতেছে না। তুচ্ছ কারণে এসিড নিক্ষেপ কিংবা বর্বরোচিত শারীরিক নির্যাতন শুধু নয়, ধর্ষণ এবং ধর্ষণের পর হত্যার মতো ঘটনাও যেন নৈমিত্তিক বিষয় হইয়া দাঁড়াইয়াছে। আর কেবল বাংলাদেশই ইহার একমাত্র ভুক্তভোগী নহে— ভারতের সামপ্রতিক ঘটনাপ্রবাহে তাহাও স্পষ্ট হইয়া গিয়াছে। লক্ষণীয় যে এই ধরনের অপরাধ দমনের জন্য প্রায়শ সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান-সংবলিত কঠোর আইন প্রণয়নের দাবি তোলা হয়। এই দাবিতে প্রতিবেশি ভারতও এখন তোলপাড় হইতেছে। বাংলাদেশে বহু আগেই অনুরূপ আইন করা হইয়াছে। সেই আইন এখনও বলবত্ আছে। নারী নির্যাতন ও হত্যার ঘটনায় মৃত্যুদণ্ডের মতো সর্বোচ্চ শাস্তি প্রদানের নজিরও একেবারে কম নহে। কিন্তু নারীর প্রতি নৃশংসতা যে থামানো যাইতেছে না তাহার উদাহরণ ভূরি ভূরি। অতএব, শুধু কঠোর আইন দিয়া কিংবা সর্বোচ্চ শাস্তির ভয় দেখাইয়া কার্যকরভাবে এই নৃশংসতার লাগাম টানিয়া ধরা যাইবে বলিয়া মনে হয় না।
অবস্থাদৃষ্টে মনে হইতেছে যে ইহা একটি মারাত্মক ব্যাধিতে পরিণত হইয়াছে। অতএব, এই ব্যাধি সারাইতে হইলে সর্বাগ্রে তাহার কারণগুলি খুঁজিয়া বাহির করিতে হইবে। বিশেষভাবে নজর দিতে হইবে বিদ্যমান সামাজিক, অর্থনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক পরিবেশ-পরিস্থিতির দিকে। সেইখানে যে গুরুতর গলদ আছে এবং বিদ্যমান আছে এই ধরনের ব্যাধিকে বিস্তৃত ও প্ররোচিত করিবার মতো বিস্তর উপাদান— তাহা অনুধাবন করিবার জন্য বিশেষজ্ঞ হইবার প্রয়োজন পড়ে না। অবশ্য অনেকে ইহার জন্য আইন প্রয়োগের দুর্বলতাকে দায়ী করিয়া থাকেন। অভিযোগটি একেবারে অমুলক নহে। তবে সমস্যাটি যে বহুলাংশে সামাজিক তাহাও অস্বীকার করিবার উপায় নাই। সমাধানও সন্ধান করিতে হইবে সেইখানেই। মনে রাখিতে হইবে যে শুধু রাষ্ট্রের উপর ভরসা করিয়া বসিয়া থাকিলে এই সমস্যার সমাধান সুদূরপরাহত। সমাজকে যেমন সচেতন ও সোচ্চার হইতে হইবে, তেমনি দায়িত্বশীল হইতে হইবে পরিবারগুলিকেও। পাশাপাশি, ব্যক্তিগত সচেতনতা ও দায়িত্বশীলতার বিষয়টিও কোনো অংশে কম গুরুত্বপূর্ণ নহে। মোদ্দাকথা হইল, ক্রমবর্ধমান অসহিষ্ণুতা ও বর্বরতার এই ব্যাধিকে রুখিতে হইলে সকলের সম্মিলিত উদ্যোগ ও সচেতনতার কোনো বিকল্প নাই।
