পাকিস্তানের সুপ্রিমকোর্ট প্রধানমন্ত্রী রাজা পারভেজ আশরাফকে গ্রেফতারের নির্দেশ দিয়েছে। এই খবর গত মঙ্গলবারের। তার আগের দিন সাবেক পার্লামেন্টারিয়ান মুহাম্মদ তাহিরুল কাদরির নেতৃত্বে দশ সহস্রাধিক মানুষ রাজধানী ইসলামাবাদে দুর্নীতিবিরোধী সমাবেশ করেন। কাদরি পাকিস্তানের একজন প্রভাবশালী ধর্মীয় নেতাও বটে। কানাডা থেকে অতি সম্প্রতি তিনি দেশে ফিরেছেন।
দীর্ঘ সামরিক শাসনের পর সরকারের লাগাম টেনে ধরা কখনই সহজ নয়। মানুষ সাধারণত খুব দ্রুত সুফল পেতে চায়। তারা স্বপ্ন দেখে কর্মসংস্থানের, আশা করে ন্যায় বিচার এবং নিরাপত্তা। কিন্তু এসব লক্ষ্য অর্জনের জন্য পদ্ধতিগত যে ভিত্তি গড়ে তোলা প্রয়োজন, তা এক-দুই বছরে হয় না। তার জন্য প্রয়োজন দশকের পর দশক। কিন্তু, সাধারণ মানুষ বুঝতে পারেন না যে, সামরিক একনায়কতান্ত্রিক শাসনের মধ্য দিয়ে একটি দেশের সমাজ ও রাজনীতির কী ভয়াবহ ক্ষতি সাধিত হয়ে যায়। এই প্রেক্ষাপটে বলা যায় যে, সংবিধান বিরোধী কোনোরূপ পদক্ষেপ ছাড়া এ বছরের এপ্রিল থেকে জুলাই মাসের মধ্যে যদি নির্বাচন হয়ে যেতে পারে, তাহলে সাফল্যের পথে পাকিস্তানের গুরুত্বপূর্ণ মোড় পরিবর্তন ঘটবে।
বর্তমান বেসামরিক সরকারের পাঁচ বছর গিয়েছে বিঘ্নসংকুল। তা সত্ত্বেও এই সময়ের মধ্যে এসব ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। যার কিছু দৃশ্যমান এবং কিছুটা প্রতীকী। ভারতের মাটিতে ভারতের বিরুদ্ধে পাকিস্তান ক্রিকেট দলের জয় হতাশ দেশবাসীকে আনন্দিত করেছে। পাক-ভারত দ্বিপাক্ষিক ভিসা সহজীকরণ এবং আঞ্চলিক বাণিজ্য প্রসার অবশ্যই প্রশংসার যোগ্য। যদিও কাশ্মীরের সাম্প্রতিক ঘটনা দুর্ভাগ্যজনক এবং উদ্বেগজনক তো বটেই।
পাকিস্তানের জনগণ প্রতিদিন মোকাবিলা করে চলেছেন ভয়াবহ সন্ত্রাস। করাচীতে অপরাধ বেড়ে চলেছে। পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের সীমান্ত এলাকার উপজাতি অধ্যুষিত অঞ্চলসমূহে জঙ্গী তত্পরতা অব্যাহত রয়েছে। ট্রাইবাল এলাকায় আইন-শৃংখলা রক্ষায় ব্যর্থতা এবং উপজাতিদের দেশের মূল স্রোতে নিয়ে আসতে না পারার অপারগতা, নিরাপত্তা ইস্যুটিকে জটিল করে তুলেছে। শত-সহস্র যুবক; যারা বেকার, তাদের কথা কেউ ভাবছেন না। ইমরান খান, পাকিস্তানের এক উদীয়মান রাজনৈতিক নক্ষত্র, যিনি দেশব্যাপী জনসমাবেশ করে চমক সৃষ্টি করেন। আর, এখন কাদরির নেতৃত্বে ইসলামাবাদে দশ সহস্রাধিক মানুষ লংমার্চে শামিল।
কাদরির দাবিগুলি উচ্চাভিলাষী। পাকিস্তানের সংবিধানও তা অনুমোদন করে না। কিন্তু তার সমর্থকরা পরিবর্তন আনয়নের যে চেষ্টা করছেন, তাতে আন্তরিকতার কোন অভাব নেই।
আন্দোলনরত জনতার মনোভাব গণতন্ত্রের রেলগাড়িটিকে লাইনচ্যুত করতে পারে, এমন আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে। বিচার বিভাগ ও সামরিক বাহিনীর কর্মকাণ্ডে সন্দেহ দানা বাঁধছে। আর কয়েক মাস পরেই পাকিস্তানে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। জনগণ ভোটের মাধ্যমে তাদের রায় জানাবেন, তাদের সমস্যার কথা বলবেন। যে কেউ এটা আশা করতে পারেন যে, নির্বাচনের মাধ্যমেই জনগণ সামন্তবাদ ও বংশানুক্রমিক গণতন্ত্রের প্রতি প্রতিশোধ নেবেন। তৃতীয় বিশ্ব তথা উন্নয়নশীল দেশে এই প্রবণতাই গণতন্ত্রের মৃত্যু বা ধ্বংস ডেকে আনছে। সামন্তবাদী ও বংশানুক্রমিক রাজনৈতিক নেতারা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে সংকীর্ণ স্বার্থে ব্যবহার করছেন। এই প্রেক্ষিতে অশিক্ষিত ও অর্ধশিক্ষিত জনগণের সৃজনশীলতার সুযোগ কম। এমনকি নেতৃত্বের দক্ষতাও ঠিকমত গড়ে ওঠে না।
উপরোক্ত পরিস্থিতিতে শেষপর্যন্ত রাষ্ট্র কর্তৃক অনুমোদিত শাসন পদ্ধতির কার্যকারিতা নিয়েই প্রশ্ন ওঠে। গুণগত নেতৃত্বের ব্যাপারেও কথা এসে যায়। সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার শাসনকার্যেই এই সংকট বিদ্যমান। এর প্রতিকারে ইসলামের চতুর্থ খলিফা ও আমিরুল মোমেনীন হযরত আলী ইবনে তালিবের (রা.) পবিত্র বাণী থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা আবশ্যক। তাঁর বাণীটি এখানে খুবই প্রাসঙ্গিক। তিনি বলেছেন, ‘ নিজেকে নেতা হিসেবে তৈরির সর্বোত্তম পথ হল জনসেবা।’ একই সঙ্গে তিনি এই বলেও সতর্ক করে দেন যে, সমান অধিকার ও ন্যায়বিচারের অভাব শেষপর্যন্ত স্বৈরাচার ও নিবর্তনমূলক শাসনের পথ উন্মুক্ত করে। পাকিস্তানের ভবিষ্যত্ নেতাদের এই বাণী অনুসরণ করা খুবই জরুরি।
এশিয়া ব্লগ থেকে ভাষান্তরিত
লেখক : এশিয়া সোসাইটির উপদেষ্টা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক
