পরিকল্পিত নগরায়ন ও নগর ব্যবস্থাপনা

আপডেট : ১৭ জানুয়ারি ২০১৩, ২১:০২
বাংলাদেশে নগরায়নের হার দ্রুত বাড়িতেছে। বিশেষজ্ঞরা বলিতেছেন, আগামী তিন বা চার দশকেই সারাদেশ সিটি স্টেট বা নগররাষ্ট্রে পরিণত হইবে। কিন্তু এই নগরায়ন হইতেছে সম্পূর্ণ অপরিকল্পিতভাবে। রাজধানী ঢাকা ও চট্টগ্রাম নিয়া ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যানের কথা বলা হইলেও কার্যক্ষেত্রে দেখিতে পাওয়া যায় কেবল অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলা। অন্যদিকে দেশে ছোটবড় শহরের সংখ্যা ও আয়তন দ্রুতগতিতে বাড়িলেও তাহাতে সুপরিকল্পনা ও সমন্বয়ের অভাব বিদ্যমান। ইহাতে নানামাত্রিক ঝুঁকি বাড়িতেছে। বন্যা, ভূমিকম্প বা অন্য কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা দিলে এইসব বর্ধিষ্ণু নগরে দুর্যোগ মোকাবিলা করা কঠিন হইয়া পড়িবে। ইহাতে বিপর্যয়কর পরিস্থিতির সৃষ্টি হইতে পারে। সুতরাং এই ব্যাপারে এখনই সতর্ক হওয়া কর্তব্য। ইউনেসকো প্রকাশিত ‘বাংলাদেশের নগরকেন্দ্র : প্রবণতা, ধরন ও বৈশিষ্ট্য’ শীর্ষক প্রতিবেদন হইতে জানা যায়, ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশে শহুরে এলাকার সংখ্যা ছিল ১০৮টি। ১৯৯১ সালে তাহা বাড়িয়া দাঁড়ায় ৫২২টি। এখন ইহা বহুগুণ বাড়িয়া গিয়াছে। এইদিকে বিশ্বব্যাংকের ‘ওয়ার্ল্ড ডেভেলপমেন্ট ইনডিকেটরস ২০০৯’-এর তথ্য অনুযায়ী ২০০৭ সালে এই দেশে ২৭ শতাংশ মানুষ শহরে বসবাস করিতেন। এতদিনে ইহাও বহুলাংশে বাড়িয়া গিয়াছে। তাই শুধু রাজধানী ঢাকা ও বাণিজ্যনগরী চট্টগ্রাম নিয়া ভাবিলেই চলিবে না, অন্যান্য মহানগরী ও ছোট-বড় শহরগুলির কথাও চিন্তা করিতে হইবে। সরকার ঢাকার পার্শ্ববর্তী নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা ও গাজীপুরকে সিটি করপোরেশন করিয়াছে। বিষয়টি ইতিবচক নিঃসন্দেহে। ইহাতে ভবিষ্যতে ঢাকার উপর হইতে চাপ কমিবে। তবে নূতন সিটি করপোরেশনগুলির সমন্বিত উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন মেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ প্রয়োজন। সেখানেও প্রথম হইতে নগর কর্তৃপক্ষ গড়িয়া উঠা দরকার, যাহার কাজ হইবে নগর উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করা, কোনভাবে বাধাগ্রস্ত করা নহে। রাজধানী ঢাকায় এখন নূতন করিয়া কয়েকটি ফ্লাইওভার হইতেছে। ইহা খুবই ভাল উদ্যোগ। বিশেষত যাত্রাবাড়ি ফ্লাইওভারের মাধ্যমে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ সহজে নিউমার্কেট পর্যন্ত আসিতে পারিবেন। কিন্তু ইহার পর তাহারা কোথায় যাইবেন? উক্ত ফ্লাইওভারটি চালুর সঙ্গে সঙ্গে নিউমার্কেট এলাকায় যে দুঃসহ যানজট দেখা দিবে তাহাতে কোন সন্দেহ নাই। অর্থাত্ গোটা রাজধানীকে কেন্দ্র করিয়াই একটি পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন। অনুরূপভাবে সারা বাংলাদেশে নগরায়নের সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করিয়া অগ্রসর হইতে হইবে। সারা দেশের নগরাঞ্চলের বহুমুখি সংকট উত্তরণে জাতীয় পর্যায়ে একটি ভৌত পরিকল্পনা প্রণয়ন জরুরি। এই পরিকল্পনার মাধ্যমে কোথায় শহর ও শিল্পাঞ্চল হইবে তাহা সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করিয়া দিতে হইবে। কৃষিজমি নির্ধারণের ক্ষেত্রেও সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হইবে। এই সংক্রান্ত বর্তমান বিশৃঙ্খলা যতটা সম্ভব দূর করিয়া নূতন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কঠোর হইতে হইবে। তবে এই পরিকল্পনার আগে পর্যাপ্ত তথ্য-উপাত্ত থাকা দরকার। আশার কথা হইল, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো বিইউআরআই নামক একটি বেসরকারি সংস্থার সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে এই ব্যাপারে একটি পদক্ষেপ গ্রহণ করিয়াছে। ইহা নীতি নির্ধারকদের কাজে আসিবে বলিয়া আশা করা যায়। তাহাছাড়া নগরায়নের বৃদ্ধির পাশাপাশি নাগরিক সুযোগ-সুবিধাও বাড়াইতে হইবে। নাগরিকদের নিজ অধিকার সম্পর্কে সচেতন ও নগরে বসবাসের জন্য ন্যূনতম নাগরিক চেতনার অধিকারী হইতে হইবে। নগরের উন্নয়ন পরিকল্পনায় সচেতন নাগরিক ও জনপ্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করিতে হইবে। আয়তনে ক্ষুদ্র হইলেও বাংলাদেশ একটি জনবহুল দেশ। এখানে জনসংখ্যা দিন দিন বাড়িয়াই চলিয়াছে। এমতাবস্থায় সবকিছু পরিকল্পনা মাফিক গড়িয়া তোলা কঠিন হইবে ইহাও সত্য। তবে অর্থনৈতিক উন্নয়নের সাথে সাথে আমাদের সক্ষমতা বাড়িবে এবং সর্বত্র পরিকল্পনা ও সমন্বয়ের ইতিবাচক ফল পাওয়া যাইবে।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন