পঞ্জিকা বর্ষ অনুযায়ী ২০১২ সালের বার্ষিক গড় মূল্যস্ফীতির হার তাহার আগের বত্সরের তুলনায় প্রায় অর্ধেকে নামিয়া আসিয়াছে। ২০১২ সালে এই গড় মূল্যস্ফীতির হার দাঁড়াইয়াছে ৬.২২% যাহা আগের বত্সর অর্থাত্ ২০১১ সালে ছিল ১১.৪৩%। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এ মাসের আট তারিখে এই তথ্য জানাইয়াছে। নিঃসন্দেহে অর্থনীতির জন্যে এই খবর স্বস্তিদায়ক। যদিওবা ডিসেম্বরে মূল্যস্ফীতি একটু বাড়িয়াছে তাহার আগের মাসের তুলনায়, তবে কোন এক মাসের বৃদ্ধি সাময়িকও হইতে পারে। ইহা নিয়া চিন্তিত হওয়ার আপাতত কোন কারণ নাই। অবশ্য বার্ষিক গড় মূল্যস্ফীতি ইহার আগের বত্সরের তুলনায় অর্ধেকে নামিয়া আসা অর্থনীতির জন্যে সুখবর হইলেও দেশের সাধারণ মানুষের জন্য কষ্টকরই। কেননা মূল্যস্ফীতি যে মাত্রারই হোক না কেন তাহা ভোগের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলিবেই। তাহার পরেও সন্তুষ্টি এই ভাবিয়া যে, সরকার সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অর্থাত্ মুদ্রা সরবরাহের প্রবৃদ্ধিকে কমাইয়া মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনিবার যে নীতি হাতে নিয়াছিল তাহাতে সফল হইয়াছে।
তবে এই সফলতার একটা নেতিবাচক দিকও রহিয়াছে যাহা এখন আমাদের বিবেচনায় আনিয়া ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। গত কয়েক বত্সর আগে যখন মুদ্রা সরবরাহের প্রবৃদ্ধি ছিলো প্রায় ২২/২৩ শতাংশের মতো তখন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ছিলো ৬.৭ শতাংশ। সেই প্রবৃদ্ধি নামিয়া আসিয়াছে গত বত্সর ৬.৩ শতাংশে। বৈশ্বিক মন্দাসহ অন্যান্য কারণ রহিয়াছে প্রবৃদ্ধি কমিয়া যাওয়ার ক্ষেত্রে। তবে মুদ্রা সরবরাহের সংকোচন একটা উল্লেখযোগ্য কারণ। এই সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির কারণে ব্যাংক ব্যবস্থা হইতে বিনিয়োগযোগ্য ঋণের পরিমাণ কমিয়া গিয়াছে। কমিয়া গিয়াছে আমদানির প্রবৃদ্ধি। আমরা জানি আমাদের আমদানির তিন-চতুর্থাংশ করা হয় মূলধন ও উত্পাদনের উপকরণের জন্যে। আমদানির ১০/১২ শতাংশ হয় নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের জন্যে। শুধুমাত্র এক-দশমাংশ হয় বিলাসদ্রব্যের জন্য। ফলে আমদানির প্রবৃদ্ধি কমিয়া যাওয়ার অর্থ হইলো ভবিষ্যত্ প্রবৃদ্ধি কমিয়া যাওয়া। এই কারণেই আমরা সংকোচনমূলক বা সংযত মুদ্রানীতিকে এই পর্যায়ে পরিত্যাগ করিতে পারি জিডিপির প্রবৃদ্ধির স্বার্থে। মূল্যস্ফীতি দুই ডিজিটে যাওয়া অবশ্যই রোধ করা দরকার ছিল এবং তাহা করা হইয়াছে। এবার প্রবৃদ্ধির প্রতি দৃষ্টি দেওয়া উচিত। সম্প্রসারণমূলক মুদ্রানীতির দিকে অগ্রসর হওয়া উচিত। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই বাংলাদেশ ব্যাংকের মনিটারি পলিসি স্টেটমেন্ট (এমপিএস) আসিতেছে। সেখানে সম্প্রসারণমূলক মুদ্রানীতির ঘোষণা আসিবে তাহাই প্রত্যাশিত।
তবে আমাদের উচ্চ মূল্যস্তর এখন নিম্ন ও নিম্নমধ্যবিত্তের জন্যে অত্যন্ত কষ্টদায়ক। মূল্যস্ফীতি শূন্য হইলেও তাহাদের জীবন যাপন অত্যন্ত কঠিন। সে জন্য সরকারকে তাহাদের প্রতি খেয়াল রাখিতে হইবে। বিভিন্ন ধরনের নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় তাহাদেরকে সহায়তা দিতে হইবে। যাহারা সহায়তা পাইতেছে তাহাদের ক্ষেত্রে তাহা অব্যাহত রাখিতে হইবে। মনে রাখিতে হইবে, উন্নয়ন ও অগ্রগতির স্বার্থে প্রবৃদ্ধিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হইবে। অন্যদিকে, উন্নয়নের বা প্রবৃদ্ধির সুফল ভোগ করিতে যাহারা ব্যর্থ হইতেছে তাহাদেরকে বিভিন্ন অর্থনৈতিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর দ্বারা সহায়তা দিতে হইবে।
