রাজধানীর হাতিরঝিল জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়েছে। এক সময় হাতিরঝিল ছিল ময়লা-আবর্জনার ভাগাড়। গোটা এলাকায় ছিল বস্তি। সেখানে এখন গড়ে তোলা হয়েছে ছবির মতো একখণ্ড সৌন্দর্য বাগান। রাজধানীর মানুষ দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষার প্রহর গুণছিল কবে উন্মুক্ত হবে হাতিরঝিল। সে প্রতীক্ষার অবসান হয়েছে গত ২ জানুয়ারি। নতুন বছরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করে সেই স্বপ্নিল প্রত্যাশার দ্বার খুলে দিলেন। উদ্বোধনকালে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ঢাকাবাসীর জন্য এটি নববর্ষের উপহার। আমরা এ উপহার দিতে পেরে আনন্দিত।’ সত্যিই হাতিরঝিল একটি দারুণ উপহার।
হাতিরঝিল প্রকল্পটির পুরো নাম হাতিরঝিল-বেগুনবাড়ী সমন্বিত উন্নয়ন প্রকল্প। ২০০৭ সালে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) এই প্রকল্প নেয়। আর এটি বাস্তবায়ন করে রাজউকের অধীনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর স্পেশাল ওয়ার্কস অর্গানাইজেশন। আর আমাদের গর্ব হচ্ছে, প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হয়েছে দেশীয় পরামর্শকদের তৈরি করা নকশা ও সার্বিক তত্ত্বাবধানে। প্রকল্পটি গড়ে উঠেছে ৩০২ একর জমির ওপর। ঢাকা মহানগরের নান্দনিক সৌন্দর্য বাড়ানো, রাজধানীর পূর্ব ও পশ্চিম অংশের মধ্যে যোগাযোগ ব্যবস্থাসহ সার্বিক পরিবেশের উন্নয়নই এ প্রকল্পের লক্ষ্য। যানবাহন চলাচলের জন্য প্রকল্পে চারটি সেতু, চারটি উড়াল সড়ক, প্রায় ১৭ কিলোমিটার সড়ক, ২৬০ মিটার ভায়াডাক্ট (সেতুপথ) এবং প্রায় ১২ কিলোমিটার হাঁটার পথ নির্মাণ করা হয়েছে। জানা যায়, হাতিরঝিলসহ তেজগাঁও এলাকায় ভাওয়ালের রাজার এস্টেটের অনেক ভূ-সম্পত্তি ছিল। এস্টেটের হাতির পাল এখানকার ঝিলে স্নান করতে বা পানি খেতে বিচরণ করত বলে কালক্রমে এর নাম হাতিরঝিল হয়। ইতোমধ্যে হাতিরঝিল উদ্বোধন হলেও পরে সংযোজিত দুইটি ‘ইউ’ আকৃতির লুপের নির্মাণকাজ এখনো চলছে। এ ছাড়া বিনোদনের জন্য উদ্যান স্থান, ওয়াটার কোর্ট, পানিতে চলাচলের ট্যাক্সি টার্মিনাল ও অ্যাম্ফিথিয়েটারসহ আরো বেশ কিছু কাজ করার কথা রয়েছে। সেগুলোও খুব তাড়াতাড়ি সম্পন্ন হোক, এটিই আমরা প্রত্যাশা করি।
সাধারণের জন্য প্রকল্প এলাকা উন্মুক্ত করে দেয়ার পর প্রতিদিনই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার মানুষ সেখানে ভিড় করছেন। বর্তমানে অনেক মানুষ সপরিবারে বেড়াতে আসছেন। রাতে আলোকসজ্জার জন্য হাতিরঝিল অন্যরকম রূপ ধারণ করছে যা খুবই উপভোগ্য। হাতিরঝিলে এখনো উত্সবের আমেজ বইছে। নয়নাভিরাম সৌন্দর্য ঘুরে ঘুরে দেখছেন দর্শনার্থীরা। দিনভর প্রকল্পের বাহারি রঙের ফুলের বাগান, নয়নাভিরাম লেক, সেতু ঘুরে ঘুরে দেখে নগরবাসী রীতিমতো মুগ্ধ। নিষ্প্রাণ কংক্রিটের রাজধানীতে প্রাণের ছোঁয়া দিয়েছে হাতিরঝিল। প্রচুর দর্শনার্থী। চোখে-মুখে তাদের আনন্দ-উচ্ছ্বাস। প্রকল্পের লেকের পাশে, কেউ সেতুর ওপর আবার কেউবা ওভারপাসের পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন।
বৃক্ষসখা হিসেবে দ্বিজেন শর্মার নাম কমবেশি অনেকেই জানেন। নগরের নিসর্গ নিয়েও তিনি অনেক ভাবেন। সম্প্রতি একটি লেখায় হাতিরঝিল প্রকল্পের গাছপালা সম্পর্কে তার বিশেষ রকমের ঔত্সুক্যের কথা জানতে পারি। সেই দায় থেকে তিনি যেচে গিয়ে হাতিরঝিল প্রকল্পের আর্কিটেকচারাল কনসালটিং ফার্মকে পরামর্শও দিয়েছিলেন ঝিলের পাড়ের ভূমি, জলভাগের মধ্যকার নকশা, কোন অংশে কী ধরনের গাছ লাগানো হবে এসব সম্পর্কে। হাতিরঝিল খুলে দেয়ার পর কৌতূহল থেকে তিনি তা দেখতেও গিয়েছিলেন; কিন্তু হতাশ হয়েছেন। কারণ, গাছ নির্বাচন, লাগাবার ধরন বিন্যাস— কোনোটিই তার মনঃপুত হয়নি। তার কাছে মনে হয়েছে, এটা অদক্ষ বাগানকর্মীদের কাজ। তার মতে, ‘অচিরেই পুরো এলাকাটি সৌন্দর্যহীন একটা জঙ্গলে পরিণত হবে।’ তার মতে, ধানমন্ডি লেকে এবং ঢাকা শহরের অন্যান্য জায়গায়ও এই সমস্যা বিদ্যমান। দ্বিজেন শর্মার মতে, গাছ লাগানোর আদর্শ মডেল হলো ১৯০৮ থেকে ১৯১৮ সাল পর্যন্ত রমনা গ্রিনে প্রাউডলকের গাছ লাগানোর মডেলটি; কিন্তু পরবর্তী সময়ে তা আর অনুসরণ করা হয়নি।
হাতিরঝিলে বিদেশি পাম ও ক্যাসুরিনাসহ অনেক গাছ লাগানো হয়েছে, যেগুলো এই দেশে পাওয়া যায় না, বিদেশ থেকে কিনে আনতে হয়। দেশি গাছ গাছালিদের গুরুত্ব দেয়া হয়নি। হাতিরঝিলে কোনো ফলগাছ নেই। নেই আম, কালোজাম, বুনোজাম, আমলকী, আমড়া, জলপাই, কামরাঙা ইত্যাদি গাছ। এ জন্য দুঃখ হয়েছে তার।
তারপরও বলবো, হাতিরঝিল একটি অসাধারণ প্রকল্প। তবে এখন দর্শনার্থীরা হাতিরঝিল প্রকল্পের এক মাথা থেকে আরেক মাথায় যেতে যানবাহন সংকটে ভুগছেন। বিশেষত যারা প্রাইভেট যানবাহন ছাড়া সপরিবারে ঘুরতে আসছেন তাদের দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। শিশু ও বয়োজ্যেষ্ঠদের কষ্ট হচ্ছে আরো বেশি। এজন্য শুধু প্রকল্প এলাকার মধ্যে মিনিবাস, পর্যটন বাস বা মোড়ে মোড়ে বিশেষত বড় ব্রিজগুলির আশেপাশে নতুন ও দৃষ্টিনন্দনীয় হিউম্যান হলার, সিএনজি বা ট্যাক্সি স্ট্যান্ডের ব্যবস্থা করতে পারলে ভাল হতো। অন্যান্য রাস্তার মতো হাতিরঝিল এলাকায় বড় পাবলিক বাস চলুক ও কোনোভাবে এর সৌন্দর্যের হানি হোক তা আমরাও চাই না; কিন্তু সাধারণ দর্শক যারা ঘুরতে আসবেন, তাদের পরিবহনের জন্য একটা ব্যবস্থা করা যেতেই পারে।
লেখক : সাংবাদিক
[email protected]
