নবম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য প্রমথ চৌধুরী রচিত ‘বই পড়া’ প্রবন্ধটি বুঝানোর জন্য শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে যেভাবে বক্তব্য দিতে পারেন এবং ছাত্রছাত্রীরা প্রবন্ধের মূলভাব অনুধাবন করতে পারে সেভাবেই তোমাদের জন্য শ্রেণিশিক্ষা পর্বে প্রবন্ধটির মর্মকথা তুলে ধরেছেন স্কলার্সহোম স্কুল এন্ড কলেজের বাংলা বিভাগের শিক্ষক রোমানা আফরোজ।
লেখক পরিচিতি
বাংলা সাহিত্যের চলিত গদ্য রীতির প্রবর্তক প্রমথ চৌধুরী। তিনি ৭ আগস্ট, ১৮৬৮ খ্রিষ্টাব্দে যশোরে জন্মগ্রহণ করেন। তবে তাঁর পৈত্রিক নিবাস পাবনা জেলার হরিপুর গ্রামে। তিনি ‘সবুজপত্র’ ও ‘বিশ্বভারতী’ পত্রিকার সম্পাদক। তাঁর ছদ্মনাম বীরবল। প্রমথ চৌধুরী ২রা সেপ্টেম্বর, ১৯৪৬ সালে কলকাতায় পরলোক গমন করেন।
শিক্ষাজীবন:
কলকাতার হেয়ার স্কুল থেকে এন্ট্রান্স ও সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ থেকে এফ এ পাস করেন। পরে দর্শনে বিএ অনার্স, ইংরেজিতে ১ম শ্রেণিতে এম এ ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তীতে লন্ডন থেকে ব্যারিস্টারি পাস করেন।
কর্মজীবন:
আইন কলেজে অধ্যাপনা, দক্ষিণেশ্বর ও গোপাল লাল এস্টেটের রিসিভার ও ঠাকুর এস্টেটের ম্যানেজার পদে দায়িত্ব পালন করেন।
সাহিত্যকর্ম:
প্রবন্ধ- বীরবলের হালখাতা, তেল-নুন-লকড়ি, নানাকথা, রায়তের কথা, আমাদের শিক্ষা, নানাচর্চা, প্রবন্ধ সংগ্রহ ইত্যাদি।
কাব্যগ্রন্থ:
সনেট পঞ্চাশত্, পদচারণ।
গল্পগ্রন্থ: চার ইয়ারি কথা, আহুতি, নীললোহিত, গল্পসংগ্রহ ।
স্বীকৃতি: কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রদত্ত ‘জগত্তারিণী’ পুরস্কার লাভ।
শ্রেণিশিক্ষা
প্রমথ চৌধুরী যুক্তিবাদী ও কালসচেতন লেখক। ‘বইপড়া’ প্রবন্ধটি প্রমথ চৌধুরীর একটি সুচিন্তিত ও অনবদ্য রচনা। এ প্রবন্ধটি ‘প্রবন্ধ সংগ্রহ’ নামক গ্রন্থ থেকে নেয়া হয়েছে। এখানে প্রাবন্ধিক বইপড়ার উপযোগিতা ও পাঠকের মনমানসিকতা নিয়ে আলোচনা করেছেন। এ প্রবন্ধে লেখক বই পড়ার প্রয়োজনীয়তা ও অপরিহার্যতা সম্পর্কে নানা যুক্তি-প্রমাণ দিয়েছেন। আমাদের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার সমালোচনা করে তিনি বলেছেন,
আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় সাহিত্যচর্চার মাধ্যমে নিজেকে প্রকৃত সুশিক্ষিত হিসেবে গড়ে তোলার কোন সুযোগ নেই। এ শিক্ষা মানুষের সুপ্ত হূদয়বৃত্তিকে প্রস্ফুটিত করে না। তাই শিক্ষার্থীরা ভ্রান্ত পথেই পরিচালিত হয়। আমাদের শিক্ষার্থীরা স্কুল-কলেজে প্রকৃত জ্ঞান অর্জনের জন্য যায় না। তারা চায় যে কোন প্রকারে পাস করে একটা সার্টিফিকেট সংগ্রহ করতে, যা তার জীবিকা অর্জনে সহায়তা করবে। অভিভাবকদের উদ্দেশ্যও তাই। তারা সন্তানদের বিদ্যালয়ে পাঠান সার্টিফিকেটধারী হওয়ার জন্য। আমাদের উদ্দেশ্য প্রয়োজনীয় শিক্ষাকাল শেষ করে চাকরি লাভ করা। অর্থোপার্জনই আমাদের একমাত্র লক্ষ। যে শিক্ষার সাথে আর্থিক যোগ নেই সেই শিক্ষা আমাদের কাছে অনর্থক বলে বিবেচিত। এ কারণেই বইপড়ার প্রতি আমাদের প্রবল অনিচ্ছা, অনাগ্রহ। অথচ শিক্ষার প্রকৃত ফল বলতে বুঝায় জ্ঞানলাভ ও মানসিক উন্নতি। এটা বর্তমান শিক্ষার্থীরা অনুধাবন করতে পারে না। তাই লেখক বলেছেন,‘পাস করা ও শিক্ষিত হওয়া এক বস্তু নয়’। আমরা সাহিত্যের রস উপভোগ করতে প্রস্তুত নই। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে যে শিক্ষা দেওয়া হয় তা অপূর্ন হওয়াতেই আজ এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। সুশিক্ষিত ব্যক্তিমাত্রই স্বশিক্ষিত। যথার্থ শিক্ষিত হতে হলে মনের প্রসারতা দরকার যা বই পাঠের অভ্যাসের মাধ্যমেই কেবল সম্ভব। একজন স্বশিক্ষিত মানুষ সকল নীচুতা,স্পর্শকাতরতা, হিংসা-বিদ্বেষের ঊর্ধ্বে। সে নিজের জীবনের মধু নিজে আস্বাদন করতে পারে। তাই বেশি করে বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। কারণ বই মানুষের সার্বক্ষণিক এবং শ্রেষ্ঠ সঙ্গী। ওমর খৈয়াম বইকে প্রিয়ার সাথে তুলনা করে বলেছেন—
“ রুটি মদ ফুরিয়ে যাবে
প্রিয়ার কালো চোখ ঘোলাটে হয়ে যাবে
কিন্তু একখানা বই অনন্ত যৌবনা
যদি তেমন বই হয়।”
বই পড়ে সত্যিকার জ্ঞান আহরণ করা যায়। সাহিত্যবিষয়ক বই মানুষকে অতীন্দ্রিয় সুখ এনে দেয় এবং দর্শন, বিজ্ঞান, ধর্মনীতি, রাজনীতি, সুখ-দুঃখ, সত্য-স্বপ্ন সর্ব বিষয়ে ধারণা দেয়। এককথায় সাহিত্য পাঠ মানবমনকে পরিপূর্ণতা দান করে। আর বই পড়ার জন্য লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করতে হবে ব্যাপকভাবে। কারণ লাইব্রেরিতে মানুষ বই পড়ে স্বেচ্ছায়- সানন্দচিত্তে। লাইব্রেরি মনের হাসপাতাল হিসেবে কাজ করে। বাধ্য না হলে লোকে বই পড়ে না, এ ধারণার অবসান ঘটাতে হবে। প্রগতিশীল বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে হলে বইপড়ার কোনো বিকল্প নেই। আর বই পড়ার জন্য উপযুক্ত পরিবেশ হিসেবে লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠারও বিকল্প নেই।
