বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সর্বশেষ জাতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হলো সম্প্রতি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা টানা সপ্তমবারের মতো সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন। আর সাধারণ সম্পাদক পদে দ্বিতীয়বারের মতো আসেন সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। তাঁদেরকে অভিনন্দন। ২০০৮ সালে সরকার গঠনের পর এটি আওয়ামী লীগের দ্বিতীয় কাউন্সিল। এ কাউন্সিল দলটিকে সাংগঠনিকভাবে তার প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি’র চাইতে সাংগঠনিকভাবে এগিয়ে রাখবে বলে কোন কোন বিশ্লেষক পত্রিকান্তরে মত প্রকাশ করেছেন।
আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী জাতীয় সম্মেলনে দলের কাউন্সিলররা এর সভাপতি, সাধারণ সম্পাদকসহ কার্যকরী পরিষদের অন্যান্য সদস্য নির্বাচন করবেন। কাউন্সিলরগণ ইচ্ছে করলে দলের সভাপতি বা সাধারণ সম্পাদককে যে কোন কর্মসম্পাদনের দায়িত্ব আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে অর্পণ করতে পারেন। সে দিক বিবেচনায় তৃণমূল থেকে আগত কাউন্সিলরগণই এর মূল চালিকাশক্তি।
এবারও জাতীয় সম্মেলনে কাউন্সিলররা সর্বসম্মতভাবে প্রধানন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দলের সভাপতি নির্বাচিত করেন। একই সঙ্গে তারা কার্যকরী পরিষদের অন্যান্য সদস্য নির্বাচনের জন্য দায়িত্বও তার হাতেই ন্যস্ত করেন। ব্যাপারটি অভিনব নয়। সব সময় এমনটিই হয়ে এসেছে । আর তাই অন্যরা একে স্বাভাবিকভাবেই নিয়েছেন। কিন্তু এমনটি গঠনতন্ত্র পরিপন্থী। গঠনতন্ত্র এ কাজ অনুমোদন করে না । কারণ, কাউন্সিলরদের সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব হলো কার্যকরী কমিটি নির্বাচন। এটা শুধুমাত্র তাদেরই কাজ। আওয়ামী লীগ সভাপতি কেবলমাত্র কার্যকরী কমিটির ২৬ জন সদস্যকে মনোনীত করার ক্ষমতা রাখেন। আবার কার্যনির্বাহী কমিটি গঠনের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজটি গঠনতন্ত্র পরিপন্থী উপায়ে করা হলো বলে কেউ যে অভিযোগ তুলবেন, সে উপায়ও নেই। গঠনতন্ত্রের ৮ নম্বর ধারা অনুযায়ী আওয়ামী লীগের কাউন্সিল বিষয়ে কোন ‘অভিযোগ করা চলিবে না’। যাই হোক,কাউন্সিলরদের এহেন সিদ্ধান্ত নিয়ে তাদের নেত্রীকে হয়তো সম্মানিত করেছেন; কিন্তু নিজেদের সম্মানটা বজায় রাখেননি। কারণ, আর যাই হোক কাউন্সিলররা নিজেরা ‘ঠুঁটো জগন্নাথ’ সেজে থাকতে ভালবাসতে পারেন বটে; কিন্তু গঠনতন্ত্র তাদেরকে তার চাইতে অনেক বেশি মর্যাদার আসনে রেখেছে। এহেন রাবার-স্ট্যাম্প-মার্কা কাউন্সিলে সাংগঠনিকভাবে উজ্জীবিত বা নির্জীব যা-ই হোন না কেন দলের বা দেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণ এদের মাধ্যমে হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। ফলে এ ধরনের আয়োজনের সর্বোচ্চ এবং একমাত্র উপযোগিতা হলো দলটি যে গণতান্ত্রিকভাবে চলছে, জনসমক্ষে এ দাবি করার মতো যথেষ্ট ভিত্তি তৈরি করা। সেক্ষেত্রে কাউন্সিল একশ’ ভাগ সাফল্যমণ্ডিত হয়েছে।
আপনি আচরি ধর্ম পরকে শেখাও। বাঙালি সমাজে আচরণবিধির একটি সূত্র এটি। এর অন্যথা হলে সমাজে কাউকে শাস্তি পেতে হয় না ঠিকই, তবে শঠ বা কপটাচারী হিসেবে কলঙ্ক জুটে। ফলে কোন রাজনৈতিক দল গণতন্ত্রের দাবি নিয়ে হাজির হলে গণতন্ত্রমনা যে কোন নাগরিকের পক্ষ থেকে প্রশ্ন আসা স্বাভাবিক—দলটি কি গণতান্ত্রিকভাবে চলছে? আওয়ামী লীগকে এ প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করানো হলে জবাবটা যে কী আসবে সেটা সকলের বোধগম্য। তবে ব্যক্তিকে কপটাচারী বলা গেলেও, কোন রাজনৈতিক দলকে একই শব্দের প্রয়োগ যথাযথ হবে কি-না সেটা জানার জন্য কোন ভাষাপ্রেমিক-বিশেষজ্ঞের ফতোয়া চাওয়া যেতে পারে।
আওয়ামী লীগের প্রতি সহানুভূতিশীল পাঠক কথা তুলতে পারেন যে, আমার দল তো গণতন্ত্রের চর্চা না করুক, অন্তত নিয়মিতভাবে জাতীয় কাউন্সিল আয়োজন করে গণতন্ত্রের মহড়া তো অন্তত দেয়। এর প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলো, বিশেষ করে বিএনপি, তো সেটাও করে না। এমন মহড়া করতে করতে এক সময় প্রকৃত গণতন্ত্রে আমাদের উত্তরণ ঘটবে। খাশা যুক্তি। তবে সেটা হবার নয়। অগ্নিকাণ্ড নির্বাপনের বা প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলার মহড়ার সঙ্গে দলগুলোর গণতান্ত্রিক মহড়ার গুণগত তফাত্ অনেক। দুর্যোগ-দুর্বিপাক আকস্মিক ব্যাপার; তাই এর মোকাবিলার জন্য সার্বক্ষণিক প্রস্তুতি চাই। কিন্তু গণতন্ত্র তো কোন আকস্মিক ও ক্ষণস্থায়ী হতে পারে না। এটা নিরবচ্ছিন্ন উপলব্ধি ও চর্চার বিষয়। আওয়ামী লীগের মতো একটি প্রতিষ্ঠানে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধসম্পন্ন লোক অনেক আছে, সে ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই; তবে চর্চাকারীর যে অভাব রয়েছে সেটা নিঃসন্দেহে বলা চলে। মূল্যবোধওয়ালা নেতৃবৃন্দ যখন রাষ্ট্রীয় কোন পদে আসীন হন, তখন সে মূল্যবোধ যে ভোলেন না সেটা তাদের বক্তৃতা-বিবৃতি থেকে সহজেই বোধগম্য। আর গণতন্ত্রের চর্চার বিষয়টা যেহেতু দলের অভ্যন্তরেই অবান্তর; দলের পাটাতন ব্যবহার করে যে কোন অবস্থানে গেলে সেখানেও সেই চর্চা সেভাবেই করা হয়। উদাহরণ ভূরি ভূরি আছে। ওয়েস্টমিনিস্টার ঘরানার সংসদীয় গণতন্ত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের প্রধান সাধারণত প্রধানমন্ত্রী হন। তিনি ইচ্ছে করলে তার আস্থাভাজন যে কাউকে মন্ত্রিত্ব গ্রহণের জন্য আমন্ত্রণ জানাতে পারেন। মাস কয়েক আগে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী, আওয়ামী লীগের সভাপতি, সে অনুযায়ী তোফায়েল আহমেদ ও রাশেদ খান মেননকে মন্ত্রী হবার জন্য নিমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। পরে জানা গেল, মন্ত্রিত্বের শপথে আমন্ত্রণের পূর্বে তাদের সঙ্গে এ ব্যাপারে কোন পরামর্শও তিনি করেননি। মানে পরামর্শ করার প্রয়োজনও তিনি বোধ করেননি। করেননি কেন? কারণ— দলে তিনি যেমন, সরকারেও তার আচরণ ঠিক তেমনি। তিনিই সর্বেসর্বা।
সর্বে-সর্বা কিসের বলে? তিনি বঙ্গবন্ধু কন্যা বলে? মোটেও তা নয়। যদি তাই হতো তাহলে দলে তার অবস্থান নিশ্চিত করতে গঠনতন্ত্রের দরকার হতো না। ২০০৯ সালে সর্বশেষ সংশোধিত গঠনতন্ত্র অনুযায়ী দলের সভাপতিকে ঈশ্বরসুলভ ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। এর বলে তিনি যে কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। দলের সর্বোচ্চ নীতি-নির্ধারণী সভা ‘সভাপতিমণ্ডলী’ বড় জোর তাকে পরামর্শ দিতে পারেন, যা তিনি মর্জিমতো গ্রাহ্য বা অগ্রাহ্য করতে পারেন। তিনি চাইলে যে কোন কিছু করারও ক্ষমতা রাখেন। দলের গঠনতন্ত্র সেক্ষেত্রে কোন বাধা নয়। কারণ, তিনি চাইলে গঠনতন্ত্রের নতুন ব্যাখ্যা হাজির করে ‘রুলিং দিতে পারেন’ [ধারা ২৫(ক)]। দলের সভাপতির জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার যে কোন ব্যাপার থাকতে পারে আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্র থেকে সেটা বুঝা মুশকিল।
এবারের কাউন্সিলে সবচাইতে বেশি আলোচিত হয়েছে কয়েকজন বরেণ্য আওয়ামী লীগের রাজনীতিবিদের অবস্থান। এটা ঠিক যে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় কোন রাজনৈতিক দলে কে কখন গুরুত্বপূর্ণ পদ পাবেন সেটা দলস্থ স্বার্থগোষ্ঠীগুলোর গতি-প্রকৃতি, নেতৃত্ব ও সাংগঠনিক দক্ষতা, জনপ্রিয়তা ইত্যাদির উপর নির্ভরশীল। তবে নেতৃত্ব যদি ধ্রুব তারার চাইতেও ধ্রুব ও স্থির হয় [ যেমন: আওয়ামী লীগ ও বিএনপিসহ অধুনা-প্রতিষ্ঠিত দেশের কয়েকটি রাজনৈতিক দল] তাহলে এতদ্বর্ণিত বিষয়গুলোর বাইরে সবকিছুই তার সাপেক্ষে বিবেচিত হবে। ধর্মাবতারগণের প্রতি অবিচল আস্থা ও বিশ্বাস যেমন ধার্মিককুলের মুক্তির প্রথম শর্ত, ধ্রুব নেত্রীর প্রতি দ্বিধাহীন-প্রশ্নহীন আস্থা ও বিশ্বাসই হলো দলে যে কোন পদ পাওয়ার অত্যাবশ্যক শর্ত। আর সে শর্ত পূরণ না করতে পারার সরাসরি ফল হলো তোফায়েল-আমুদের সভাপতিমণ্ডলীতে না থাকাটা। এরা সভাপতিমণ্ডলীতে থাকলে আওয়ামী লীগ যে অন্য কিছু হয়ে যেতো না, সেটা ঠিক। তবে তাদের বর্তমান অবস্থান স্পষ্টই অনুমিত যে, সুদীর্ঘকাল সংগঠনটির সঙ্গে সক্রিয় থেকেও তারা কোন প্রভাব-বলয় বা অনুসারী-গোষ্ঠী তৈরি করে যেতে পারেননি। এমনটি হতে পারে দুটো কারণে: প্রথম কারণ, এজন্য যে যোগ্যতা বা দক্ষতা থাকা দরকার তাদের মধ্যে সেগুলোর অনুপস্থিতি। এমন হবার সম্ভাবনা কম। কেননা তরুণ বয়সেই তারা তাদের সক্ষমতার প্রমাণ করেছেন। দ্বিতীয়ত: দলের মধ্যে অসচেতনভাবে ক্রিয়াশীল এমন কোন পদার্থ যা নেতৃত্ব, জনপ্রিয়তা বা সাংগঠনিক যোগ্যতার মতো গুণগুলোকে অবান্তর করে দেবার মতো শক্তিসম্পন্ন। সমাজবিজ্ঞানী ম্যাক্স ওয়েবার একে ‘ক্যারিসমা’ বলেছেন। অধিকাংশ মানুষ ক্যারিশমাচ্ছন্ন থাকতে পছন্দ করলেও এটি মূলগতভাবে গণতন্ত্র-বিধ্বংসী। তত্ত্বের বরাত না দিয়েও বলা যায় যে, বাংলাদেশে এ মুহূর্তে উক্ত গুণসম্পন্ন কোন নেতা নেই। যদি ক্যারিশমা না থাকে, তাহলে আওয়ামী লীগে [ কিংবা বিএনপি’তে] গণতন্ত্র-বিধ্বংসী পদার্থটি কী? পদার্থটি আর যাই হোক সেটা তাদের শীর্ষ-নেতার গুণ নয়; বরং তা লাখো কর্মীর সামষ্টিক সমর্পণের ফল। সবচেয়ে দুঃখজনক হলো কর্মীগণ এ ব্যাপারে না-ওয়াকেব।
লেখক :শিক্ষক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
