কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ ও ছাত্রদলের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটিয়াছে গত বৃহস্পতিবার। ইত্তেফাকে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এই সংঘর্ষে উভয়পক্ষের অন্তত ৫০ জন আহত হইয়াছে। ভাঙচুর হইয়াছে বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাম্বুলেন্স ও বাসসহ কয়েকটি গাড়ি। গোলাগুলির ঘটনাও ঘটিয়াছে। সর্বাপেক্ষা উদ্বেগের বিষয় হইল, পুলিশের অস্ত্র কাড়িয়া লইয়া সেই অস্ত্র দিয়াই গুলিবর্ষণ করা হইয়াছে। একাধিক জাতীয় সংবাদপত্রে প্রকাশিত ছবি ও তথ্য অনুযায়ী, এই অপকর্মটি করিয়াছে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের বেপরোয়া ক্যাডাররা। এমনকী দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের মারধরের অভিযোগও উঠিয়াছে তাহাদের বিরুদ্ধে। একই দিনে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়েও ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের মধ্যে মারামারির ঘটনায় আহত হইয়াছে আরও ১০ জন। এইদিন ভাঙচুরের ঘটনা ঘটিয়াছে রাজধানীর তেজগাঁও কলেজেও। নিয়মবহির্ভূতভাবে অতিরিক্ত শিক্ষার্থী ভর্তির দাবিতে কলেজ শাখা ছাত্রলীগের কিছু নেতাকর্মী এই ঘটনা ঘটাইয়াছেন বলিয়া অভিযোগ করিয়াছেন কলেজের অধ্যক্ষ। দুর্ভাগ্যজনকভাবে দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে কারণে-অকারণে সংঘর্ষ, হানাহানি ও ভাঙচুর যেন নৈমিত্তিক বিষয় হইয়া দাঁড়াইয়াছে। ইহার জন্য এখন বেশিরভাগ ক্ষেত্রে যেমন ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে অভিযোগের আঙুল উঠিতেছে, তেমনি পূর্ববর্তী চারদলীয় জোট সরকারের সময়ে ছাত্রদলের বিরুদ্ধেও একই অভিযোগ উঠিয়াছে। সরকার বদলের সাথে সাথে ছাত্র সংগঠন এবং সংগঠনভুক্ত ক্যাডারদের অবস্থান ও ভূমিকার বদল ঘটিলেও অবস্থা অপরিবর্তিতই থাকিয়া গিয়াছে। অতএব, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে অতীতে যাহা ঘটিয়াছে আর এখন যাহা ঘটিতেছে এবং যাহারা ঘটাইতেছে— সবকিছুর মূল উত্স যে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা বা ক্ষমতার পৃষ্ঠপোষকতা তাহা দিবালোকের মতো স্পষ্ট।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে উপর্যুপরি সংঘাত ও সহিংসতার অন্তর্নিহিত বাস্তবতাটি অনুধাবন করিবার জন্য শুধু ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে যাহা ঘটিয়া গিয়াছে তাহার উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করিলেই চলে। পুলিশের উপস্থিতিতেই নানা ধরনের অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হইয়া উভয়পক্ষ সংঘর্ষে লিপ্ত হইয়াছে। একপর্যায়ে পুলিশের অস্ত্র কাড়িয়া লইয়া গুলিবর্ষণও করিয়াছে। কিন্তু প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, পুলিশ তাত্ক্ষণিকভাবে তো নয়ই, এমনকী গুরুতর এই অপরাধের সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেন নাই। যেইটুকু ব্যবস্থা নেওয়া হইয়াছে তাহাও পক্ষপাতমূলক। সর্বোপরি, বিস্ময়করভাবে নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক এক পুলিশ কনষ্টেবল ‘কাঁদিতে কাঁদিতে’ ইত্তেফাককে বলিয়াছেন, ‘পেটের দায়ে মানুষের নিরাপত্তা দেওয়ার কাজ করি। অথচ ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা আমাদেরই বেধড়ক পিটাইয়া আহত করিল এবং আমাদেরই অস্ত্র কাড়িয়া লইয়া গুলি করিল। আমাদেরই এখন নিরাপত্তা নাই এবং চাকরি হারানোর ভয়ে আমাদের এখন বোবাকান্না কাঁদিতে হইতেছে’। যিনি নিজের অস্ত্রটিই রক্ষা করিতে পারেন না তিনি বা তাহারা জনগণের নিরাপত্তা দিবেন কিভাবে তাহা আমরা বুঝিতে অক্ষম। সরকারি অস্ত্র কাড়িয়া লইলে কী করিতে হয় তাহা পুলিশের সদস্যরা জানেন না—ইহাও কী আমাদের বিশ্বাস করিতে হইবে? এক হাতে যে তালি বাজে না তাহা কোনো নূতন কথা নহে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর জানাইয়াছেন যে ক্যাম্পাসে মিছিল-মিটিং নিষিদ্ধ থাকিলেও ছাত্রদল তাহা অমান্য করিয়া মিছিল বাহির করিয়াছে। অন্যদিকে, ক্যাম্পাসে নিয়ম-শৃঙ্খলা রক্ষা করা ছাত্রলীগের দায়িত্ব না হইলেও তাহারা ছাত্রদলের মিছিলে হামলা চালাইয়াছে। অর্থাত্ কেহই নিয়ম-কানুনের তোয়াক্কা করেন নাই। পালন করেন নাই নিজ নিজ দায়িত্ব। ফলে যাহা হইবার তাহাই হইয়াছে।
বাস্তবতা হইল, যাহারা প্রায়শ সদম্ভে আইন নিজের হাতে তুলিয়া লইতেছে কিংবা পুলিশের অস্ত্র কাড়িয়া লইয়া বীরত্ব ফলাইতেছে— তাহারা জানে যে আইন তাহাদের কেশাগ্রও স্পর্শ করিবে না। ইহাতে বিস্মিত হইবার কিছু নাই। নির্বাচিত-অনির্বাচিত সকল সরকারের আমলেই এই ধরনের ঘটনা ঘটিয়াছে। রাষ্ট্রের কর্ণধাররা স্বপ্রণোদিতভাবে সংযত না হইলে এবং আইনকে তাহার নিজস্ব গতিতে চলিতে না দিলে আমাদের শত আবেদন-নিবেদন এবং সুবচনেও কোনো কাজ হইবে না। বন্ধ হইবে না সংঘর্ষ, সংঘাত ও হানাহানি। বরং দিনে দিনে দুর্বৃত্তরা আরও বেপরোয়া হইয়া উঠিবার আশঙ্কাই বেশি।
