গত পরশু শুক্রবার সুন্দরবনের ডাকাতদের কবলে পড়েন মুক্তিযুদ্ধের ৯ নম্বর সেক্টরের সাব-সেক্টর কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর (অব.) জিয়াউদ্দিন আহমেদ। দস্যুদের বন্দুকের গুলিতে তিনি আহত হন। গুলি লাগে তাঁহার মাথায়। পরে তাঁহার দেহরক্ষীদের পাল্টা আক্রমণে নিহত হয় হামলাকারী চার ডাকাত। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত জানা যায়, মেজর জিয়াউদ্দিন আহমেদ চিকিত্সাধীন রহিয়াছেন। তাঁহার শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল ও আশংকামুক্ত।
বাংলাদেশের সুন্দরবন ও উপকূলীয় এলাকায় বনে ও সমুদ্রে দস্যুদের উত্পাত কি হারে বাড়িয়াছে এই ঘটনা তাহারই জাজ্বল্যমান প্রমাণ। তাহারা একজন দেশবরেণ্য ও সম্মানিত ব্যক্তির প্রতিও হামলা করার দুঃসাহস দেখাইয়াছেন। মেজর জিয়াউদ্দিন আহমেদ আল্লাহর অশেষ রহমতে বাঁচিয়া গিয়াছেন। তাঁহার সঙ্গে কয়েকজন দেহরক্ষী ছিল বলিয়া তিনি বিপর্যয়কর ও ভয়াবহ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সক্ষম হইয়াছেন। কিন্তু নিরীহ জেলেরা অহরহ দস্যুদের হামলার শিকার হইতেছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাহাদের জিম্মি করিয়া মুক্তিপণ আদায় করা হইতেছে। তাহাদের ট্রলার লুটপাট করিয়া হত্যা পর্যন্ত করা হইতেছে। অনেক সময় হত্যা করিয়া জেলেদের লাশ গভীর সমুদ্রে ফেলিয়া দেয় দুর্বৃত্তরা। পত্র-পত্রিকায় প্রায়শ এই ধরনের মর্মান্তিক ঘটনার সংবাদ প্রকাশিত হইয়া থাকে। অনেক সময় জেলেদের নিখোঁজ হওয়ার সংবাদই শুধু ছাপা হয়। প্রকৃতপক্ষে তাহাদের ভাগ্যে কী ঘটে তাহা জানা যায় না।
সুন্দরবন বাঁচাও আন্দোলনে সম্পৃক্ততা, বিভিন্ন গণমাধ্যমে দস্যুদের বিরুদ্ধে সোচ্চার ভূমিকা পালন এবং তাহাদের বিরুদ্ধে অভিযানে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সহায়তা ও পরামর্শ প্রদানের কারণে মেজর জিয়াউদ্দিন আহমেদের ওপর দস্যুদের হামলা হইতে পারে। যে কারণেই তাহারা এই হামলা করুক না কেন, তাহাদের শনাক্ত করিয়া গ্রেফতার করিতে হইবে। গোটা সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত করিতে কোস্টগার্ডসহ সংশ্লিষ্ট আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নিয়মিত অভিযান প্রেরণ ও তত্পরতা অব্যাহত রাখিতে হইবে। কেননা বেপরোয়া ও সশস্ত্র এই দস্যুদের কাছে সুন্দরবন ও সাগর উপকূলের পাঁচ লক্ষাধিক বনজীবী ও জেলে জিম্মি হইয়া পড়িয়াছে। দস্যুরা জেলে ও বনজীবীদের নিকট হইতে প্রতি বত্সর কমপক্ষে দুই শত কোটি টাকার মুক্তিপণ আদায় করিয়া থাকে। তাহারা এতটাই নিষ্ঠুর যে, ঠিকসময়ে মুক্তিপণ না দিলে জীবিত অবস্থায় হাত-পা বাঁধিয়া সাগরে ফেলিয়া দেয় কিংবা বর্বরভাবে হত্যা করে। তাহাদের উপদ্রবে পর্যটকরাও তটস্ত। এই দুস্যরা অবাধে লুট করিয়া চলিয়াছে সুন্দরবনের মূল্যবান কাঠ। ইহাদের উত্পাতে সুন্দরবন উজাড় হইবার উপক্রম হইয়াছে। ফলে দেশের গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হইতেছে। পর্যটন কেন্দ্র হিসাবে বিশ্ব ঐতিহ্যের অন্তর্ভুক্ত সুন্দরবনের সম্ভাবনা ব্যাপক। কিন্তু এজন্য সর্বাগ্রে এখানকার দস্যুদের নির্মূল করা প্রয়োজন।
সমুদ্র এলাকা ও তত্সংলগ্ন নদ-নদীতে দস্যুবৃত্তি বহুকাল ধরিয়া চলিয়া আসিতেছে। একসময় মগ, পর্তুগীজ ও বর্গি জলদস্যুদের উত্পাতে আমরা অতিষ্ঠ হইয়া উঠিয়াছিলাম। এখন আমরা নিজেরাই এই জঘন্য বৃত্তি বাছিয়া লইয়াছি। অনেক সময় বিদেশি দস্যুদেরও তত্পরতা দেখা দেয়। তবে ব্যবসা-বাণিজ্যের খাতিরে এসব গুরুত্বপূর্ণ এলাকা ও নৌপথ সবদিক দিয়া বিপদমুক্ত রাখা অত্যাবশ্যক। গত বত্সর আগস্টে যৌথ অভিযান প্রেরণ করা হইয়াছিল। এ ধরনের অভিযান আবার জরুরি হইয়া পড়িয়াছে।
