জেনারেল এরশাদ সত্যই কি মহাজোট ছেড়ে যাবেন

আপডেট : ১৯ জানুয়ারি ২০১৩, ২১:০৩
আমাদের সাবেক রাষ্ট্রপতি এবং বর্তমান জাতীয় পার্টির নেতা জেনারেল এরশাদের সাম্প্রতিক কথাবার্তা শুনলে আমার আরেক জেনারেলের কথা মনে পড়ে। তিনি চীনের কুওমিংটাং সরকারের আমলের রাষ্ট্রপতি জেনারেল চিয়াংকাইশেক। মাও জে দুংয়ের নেতৃত্বে কম্যুনিস্ট পার্টি চীনের মূল ভূখণ্ড (Mainland) দখল করে নেয়ার পর জেনারেল চিয়াংকাইশেক ফরমোজা দ্বীপে আশ্রয় নেন এবং সেখানে মার্কিন পাহারায় শেষ জীবন কাটান। বেঁচে থাকাকালে তিনি প্রতি বছর একটি করে হুঙ্কার ছাড়তেন এবং বলতেন, আগামী বছরেই তিনি দেশ পুনর্দখল করবেন এবং মহাচীনের মহানায়ক হবেন। যে বছর তিনি ফরমোজা দ্বীপের রাজধানী তাইপেতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন, সে বছরও তিনি এই হুঙ্কার দিয়েছিলেন। বাংলাদেশে জেনারেল এরশাদ ক্ষমতাচ্যুত হয়েছেন সেই নব্বইয়ের দশকের গোড়ায়। তারপর সম্ভবত একুনে ছয় বছরকাল দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার ইত্যাদির দায়ে অভিযুক্ত হয়ে তিনি জেলে কাটিয়েছেন। তার সাফল্য এই যে, তিনি জেলে বসে তার দলটিকে টিকিয়ে রাখতে পেরেছিলেন, সংসদ সদস্য হতে পেরেছেন এবং আওয়ামী লীগ ও বিএনপির দুই নেত্রীকে পরস্পরের বিরুদ্ধে খেলিয়ে জেল থেকে বেরিয়ে আসতেও পেরেছেন। ফরমোজা দ্বীপে মার্কিন পাহারায় নিজের এবং নিজের দলের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পেরে জেনারেল চিয়াংকাইশেকের দুরাশা যেমন বেড়ে গিয়েছিল এবং তিনি চীনে আবার ক্ষমতা দখলের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিলেন। বাংলাদেশেও কারামুক্ত হওয়ার পর কখনো বিএনপি জোট এবং কখনো আওয়ামী জোটের আশ্রয়ে থাকার সুযোগ পাওয়ায় জেনারেল এরশাদেরও সম্ভবত দুরাশা বেড়ে গেছে। তিনি আগেও বলতেন, বাংলাদেশে তিনি আবার ক্ষমতায় যাবেন। সম্প্রতি সোজাসুজি বলতে শুরু করেছেন, তিনি ক্ষমতায় যাচ্ছেন এবং আগামী সাধারণ নির্বাচনে দেশের মানুষ আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকে ভোট না দিয়ে তার দলকে জয়যুক্ত করবে এবং তিনি আবার ক্ষমতায় বসবেন। সম্প্রতি (১৪ জানুয়ারি) রংপুরের বদরগঞ্জে এক জনসভায় জেনারেল এরশাদ বলেছেন, “আওয়ামী লীগ ও বিএনপির উপর দেশের মানুষের কোনো আস্থা নেই। জনগণ এদের দূরে ছুঁড়ে ফেলবে। আমি আগামীতে এককভাবে নির্বাচন করে ক্ষমতায় আসবো” তিনি আরও বলেছেন, ‘রংপুর ও দেশের উন্নয়নের জন্য আমার আবার এককভাবে ক্ষমতায় আসা দরকার। তাই এবার এককভাবে নির্বাচন করবো। মহাজোটে গিয়ে আমি কিছুই পাইনি। দেশের মানুষকে মহাজোট সরকারের নির্যাতন থেকে বাঁচাতে চাই। এই সরকারের আমলে তাদের নেতাকর্মীদের উন্নয়ন হয়েছে। দেশের সাধারণ মানুষের কোনো উন্নয়ন হয়নি। দেশের মানুষ আবার আমাকে ক্ষমতায় চায়।’ জেনারেল এরশাদ বদরগঞ্জে যা বলেছেন, তা কোনো জনমত জরিপে জানা যায়নি। এটা তার মুখের কথা। আগের দিন (১৩ জানুয়ারি) রংপুরের মিঠাপুকুর এলাকায় এক সভায় তিনি একই বক্তব্যের পুনরুক্তি করেছেন এবং আগামী নির্বাচনে কী হবে তাও আগাম বলে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগ একশ’ আসন পাবে কিনা সন্দেহ। বিএনপিরও একই অবস্থা হবে। প্রধানমন্ত্রীর ছাত্রলীগ ও যুবলীগের তাণ্ডব এবং বিরোধী দলীয় নেত্রীর বিদেশে টাকা পাচারের দুর্নীতির যন্ত্রণা থেকে দেশবাসী মুক্তি চায়। এজন্য তারা বিকল্প সরকার খুঁজছে। আগামী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে সরকার গঠনে জাতীয় পার্টিকেই বেছে নেবে দেশের মানুষ।’ সাবেক রাষ্ট্রপতির এই আশা যদি সফল হয় এবং জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে যদি তিনি সত্যই আবার এককভাবে নির্বাচনে জিতে রাষ্ট্রক্ষমতায় যান, তাহলে কারোরই তাতে আপত্তি করার কিছু নেই। আপত্তি হবে তখন, যদি তিনি বন্দুকের জোরে আবার ক্ষমতায় যেতে চান এবং আবার বন্দুকের জোরে দেশ শাসন করে দাবি জানান, তিনি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় দেশ শাসন করছেন। অবশ্য বন্দুকের জোরে আবার ক্ষমতা দখলের সম্ভাবনা তার নেই। কারণ সেনা প্রধানের পদ তার দখলে নেই এবং বর্তমান প্রজন্মের বাংলাদেশ সেনাবাহিনী তার নেতৃত্বে আর ফিরে যেতে চাইবে না। আর দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতো সেনা শাসনের অনুকূল নয়। সুতরাং জেনারেল এরশাদকে সিভিল ড্রেসে সিভিল রাজনীতির উপর নির্ভর করতে হচ্ছে এবং আবার ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য জনগণের সমর্থন চাইতে হচ্ছে। এই সমর্থন পেতে হলে জেনারেল এরশাদকে তার অতীতের স্বৈরাচারী ভূমিকার সাফাই না গেয়ে, বরং সেই কৃতকর্মের জন্য দেশবাসীর কাছে অকপটে ক্ষমা চেয়ে গণতান্ত্রিক রাজনীতির মূল ধারায় তাকে দৃঢ় অবস্থান নিতে হবে। এই রাজনীতিতে অবস্থান নিয়ে তিনি কি পেয়েছেন অথবা পাননি তা নিয়ে আক্ষেপ করা চলবে না। যে রাজনীতি দ্বারা দেশের মানুষের উন্নতি হয়, সেই রাজনীতির ধারায় তাকে জোরালোভাবে সম্পৃক্ত থাকতে হবে। ব্যক্তিগত বা দলীয় পাওয়া না পাওয়ার ক্ষোভ বার বার প্রকাশ করে দেশের মানুষের কাছে তিনি নিজেকে খেলো করছেন মাত্র। আমার হাসি পেয়েছে মিঠাপুকুর এলাকার সভায় তার একটি বক্তব্য শুনে। তিনি বলেছেন, “আওয়ামী লীগ ও বিএনপি’র অনেক দুর্নাম আছে। তাদের নানা অপকর্মের কারণে দেশের মানুষ অতিষ্ঠ।” এই পর্যন্ত বলে তিনি থামলে ঠিক হতো। কিন্তু এরপরই তিনি বলেছেন, “বিএনপি ক্ষমতায় থেকে দুর্নীতি করে হাজার হাজার কোটি টাকা কামিয়েছে। সেই টাকা বিদেশে পাচার করেছে। বর্তমান সরকার সেই টাকা আবার দেশে ফেরত আনছে। এসব অভিযোগ আমাদের বিরুদ্ধে নেই।” তার বক্তব্যের শেষ অংশটি শুধু আমাকে নয়, অনেককেই হাসাবে এবং হাসিয়েছে। সাবেক রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও বিদেশে টাকা পাচারের অভিযোগ ছিলো না অথবা নেই এমন কথা শুনলে একটি দুগ্ধপোষ্য শিশুরও হাসি সংবরণ করা কষ্টকর হবে। একজন রাজনীতিবিদ ভালো জেনারেল হতে পারেন, কিন্তু একজন জেনারেল ভালো রাজনীতিবিদ হতে পারেন তার প্রমাণ খুব কম। ফ্রান্সের দ্য গলে এবং আমেরিকার আইসেন হাওয়ার দক্ষ এবং ভালো জেনারেল হিসেবে নাম করেছিলেন। কিন্তু রাজনীতিতে এসে সেই সুনাম রক্ষা করতে পারেননি। জেনারেল দ্য গলেকে গণভোটে জনগণ কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত হয়ে ক্ষমতা ছাড়তে হয়েছিল। জেনারেল আইসেন হাওয়ার নাটোর সুপ্রিমো হিসেবে নাম কিনেছিলেন, কিন্তু আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর তার সুনামে ধস নামে। এই সময়ে সামরিক শক্তি মহাশূন্য অভিযান, বিশ্বে প্রভাব বিস্তার ইত্যাদি ক্ষেত্রে সাবেক সোভিয়েট ইউনিয়ন আমেরিকাকে পেছনে ফেলে এগিয়ে গিয়েছিল এবং আমেরিকার এই অবস্থার জন্য দায়ী হতে হয়েছিল প্রেসিডেন্ট আইসেন হাওয়ারকে। কুখ্যাত ইউ-টু বিমান দুর্ঘটনার পর আইসেন হাওয়ারকে খেদোক্তি করতে হয়েছিল যে, তিনি দেশ শাসন করছেন না, আমেরিকা শাসন করছেন একটি ইনভিজিবল গভর্নমেন্ট বা অদৃশ্য সরকার। জেনারেল এরশাদের যদি জেনারেল আইসেন হাওয়ারের মতো সততা থাকতো, তাহলে তিনি জেনারেল জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর ক্ষমতায় আসার জন্য জনগণের ম্যান্ডেট চাইতেন। তিনি বিচারপতি সাত্তারের মতো একজন নির্বাচিত রাষ্ট্রপতিকে ভয় দেখিয়ে পদত্যাগে বাধ্য করে ক্ষমতা দখল করতেন না এবং এই ক্ষমতা দখলের জন্য জিয়াউর রহমানের চতুর পন্থা অনুসরণ করতেন না। জিয়াউর রহমানের মতোই একজন বিচারপতিকে প্রথমে ক্ষমতাহীন রাষ্ট্রপতি পদে বসিয়ে পরে তাকে পদত্যাগে বাধ্য করে (জাস্টিস আহসানউদ্দীন) এরশাদ সাহেব নিজে সর্বময় ক্ষমতা দখল করতেন না। এখন তিনি বলছেন, রাষ্ট্রপতি সাত্তারের অনুরোধে ক্ষমতা গ্রহণ করেছিলেন। ক্ষমতা দখল করেননি। তিনি কিভাবে বিচারপতি সাত্তারের সরকারকে ভীতি দেখিয়ে এবং ম্যানুপুলেট করে ক্ষমতা দখল করেছিলেন, সে বৃত্তান্তে এখন আমি যেতে চাই না। জেনারেল এরশাদ এখন দাবি করছেন, তিনি স্বেচ্ছায় শান্তিপূর্ণভাবে ১৯৯০ সালে ক্ষমতা হস্তান্তর করেছিলেন বলেই দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয়েছিল। তার এই দাবিটিও সঠিক নয়। ’৯০-এর ব্যাপক এরশাদ- বিরোধী আন্দোলন, নূর হোসেনদের আত্মদান, সেনাবাহিনী কর্তৃক প্রেসিডেন্টের উপর থেকে সমর্থন প্রত্যাহারের ইঙ্গিত পেয়েই তিনি ক্ষমতা হস্তান্তরে বাধ্য হয়েছিলেন। এই ব্যাপারে তিনি পাকিস্তানের জেনারেল আইয়ুব খানের পন্থা অনুসরণ করেছিলেন। পেশোয়ারে আইয়ুবের জনসভায় গুলি হতেই আইয়ুব বুঝে ফেলেছিলেন, এটা তার সেনাবাহিনীর কাজ। সেনাবাহিনীর সমর্থন তার উপর নেই। দেশেও চলছে আইয়ুব-বিরোধী আন্দোলন। তিনি প্রধান সেনাপতি জেনারেল ইয়াহিয়ার কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে নিজের প্রাণ বাঁচান। এরপর তিনি বাংলাদেশের জেনারেলের মতো দাবি করেননি যে, শান্তিপূর্ণভাবে গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তনের জন্য তিনি ইয়াহিয়ার কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেছিলেন। যা হোক, পুরনো কাসুন্দি ঘাঁটতে চাই না। জেনারেল এরশাদ যে দুর্নীতি এবং ক্ষমতায় বসে বিদেশে টাকা প্রচারের কথা বলছেন, তার সূত্রপাত তার সরকারের আমলে এবং তার বিরুদ্ধে অভিযোগ কম ওঠেনি এবং দুর্নীতির মামলাও কম হয়নি। তার সৌভাগ্য, দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের ক্ষমতার কোন্দলে তিনি বেঁচে গেছেন। নইলে তার পরিণতি মার্কোস কিংবা ইরানের শাহের মতো হতে পারতো। বর্তমানে বাংলাদেশের যে সব সুযোগ-সন্ধানী বুদ্ধিজীবী বা কলামিস্ট সভা-সেমিনার ডেকে বলছেন, বর্তমানের দুই নেত্রীর চাইতে এরশাদ ভালো ছিলেন, তাদের অতীতের লেখা ও বক্তব্য পাঠ করলে বোঝা যাবে, জেনারেল এরশাদকে তারা কতোটা খারাপ স্বৈরাচারী মনে করতেন। এখন নিজেদের সুবিধার জন্য তাদেরই কথিত পতিত স্বৈরাচারীর গায়ে ভালো মানুষের লেবাস পরাতে চাইছেন। জেনারেল এরশাদ এখন বলছেন, তিনি জেলে থাকাকালে নির্যাতিত হয়েছেন। কি ধরনের নির্যাতন সেটা খুলে বলেননি। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত জেলকক্ষে বসে তিনি মুঠোফোনে তার একাধিক বান্ধবীর সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পেয়েছেন। অন্যদিকে তার আমলে চট্টগ্রামে শেখ হাসিনার জনসভায় তাকে সরাসরি হত্যার উদ্দেশ্যে এক পুলিশ অফিসার গুলি চালিয়েছে। হাসিনা প্রাণে রক্ষা পেলেও অসংখ্য লোক হতাহত হয়েছে। এই দুর্বৃত্ত পুলিশ অফিসারের বিরুদ্ধে তিনি কোনো ব্যবস্থাই গ্রহণ করেননি। এরশাদ বিরোধী আন্দোলনকালে বেগম খালেদা জিয়া একটি হোটেল কক্ষে অবস্থানের সময় পুলিশ লাথি মেরে দরোজা ভেঙে বেগম জিয়ার ঘরে প্রবেশ করেছিল। ঘরে বসে রাজনৈতিক সভা করার সময় এরশাদ সরকারের পুলিশ ড. কামাল হোসেনসহ বিরোধী দলীয় অসংখ্য বরেণ্য নেতাকে চোখ বেঁধে অত্যন্ত অবমাননাকরভাবে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে গিয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের শান্তিপূর্ণ মিছিলে পুলিশ ইচ্ছাপূর্বক ট্রাক চালিয়ে ছাত্রহত্যা করেছে। জেনারেল এরশাদ কি তার আমলের এসব নির্যাতনের কথা ভুলে গেছেন? জেনারেল এরশাদের প্রতি আমার কোনো ব্যক্তিগত বিদ্বেষ নেই। বরং কবি ও সাহিত্যরসিক জেনারেল এরশাদের প্রতি আমার এক ধরনের দুর্বলতা আছে। সেজন্যই তাকে স্মরণ করিয়ে দেই, তার অতীতের স্বৈরাচারী কার্যকলাপের জন্য জাতি তাকে ক্ষমা করেনি। দেশের একটি অঞ্চলে কোনো কারণে নির্বাচনে ভোট পাওয়া সেই ক্ষমার প্রতীক নয়। দেশের দুই নেত্রীর ঝগড়ার সুযোগে তিনি বেঁচে গেছেন এবং এখনো একটি রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে আছেন। তার উচিত, এই সুযোগের সদ্ব্যবহার দ্বারা সত্যই দেশবাসীর কাছে গ্রহণযোগ্য হওয়ার জন্য স্বচ্ছ ও গণতান্ত্রিক রাজনীতির ধারায় তার ফিরে আসা সম্পর্কে দেশবাসীর মনে আস্থা ও বিশ্বাস প্রতিষ্ঠা করা। তিনি এই বিশ্বাস এখনো ফিরিয়ে আনতে পারেননি। লোকে বলে তিনি বহুরূপী চরিত্রের। কখন কি বলেন তার ঠিক নেই এবং নিজের সুবিধা মতো যেকোনো সময় মত ও পথ বদলাতে পারেন। তিনি যদি বলেন, তিনি মহাজোট ছাড়বেন, সেকথা যেমন মানুষ বিশ্বাস করে না, তেমনি তিনি যদি বলেন, মহাজোট ছেড়ে তিনি যাবেন না, সে কথাও মানুষের মনে বিশ্বাস জন্মায় না। তার সম্পর্কে দেশের মানুষের এই অবিশ্বাস ও অনাস্থার ভাব তিনি নিজেই সৃষ্টি করেছেন। একবার বিএনপি জোটে যোগ দেওয়ার সময় তিনি বলেছেন, বিএনপি’র সঙ্গে তার রাজনৈতিক মত ও পথের মিল বেশি। আবার আওয়ামী জোটে যোগ দেওয়ার সময় বিএনপিকে দুর্নীতিবাজ ও অগণতান্ত্রিক আখ্যা দিয়েছেন এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে এক ধরনের সমর্থন জানাতে দ্বিধা করেননি। সাবেক রাষ্ট্রপতির এই বারম্বার ভোল বদল সম্পর্কে ঢাকার এক সাংবাদিক বন্ধু বলেছেন, “জেনারেলের রাজনীতি শাখামৃগের খেলার মতো। কখন কোন ইচ্ছায় কোন ডাল ধরবেন এবং কোন ডাল ছাড়বেন তার ঠিক নেই।” তার এই মন্তব্য উড়িয়ে দেওয়া যায় না। জ্যোতিষ শাস্ত্রে আমাদের সাবেক রাষ্ট্রপতির পারদর্শিতা আছে কিনা আমি জানি না। নইলে সম্ভাব্য সাধারণ নির্বাচনের বছরখানেক আগেই তিনি নির্বাচনের ফল সম্পর্কে বালকোচিত উক্তি করেন এবং এককভাবে তার দলের ক্ষমতায় যাওয়ার স্বপ্ন দেখেন কিভাবে? এতো চীনের চিয়াংকাইশেকের মতো আত্মপ্রতারণার রোগে ভোগার শামিল। আগেই বলেছি, আমি জেনারেল এরশাদের শুভাকাঙ্ক্ষী। তিনি তার দীর্ঘদিনের রাষ্ট্র পরিচালনার অভিজ্ঞতা নিয়ে দেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে অবস্থান করুন, এটা দেশের অনেকের মতো আমারও কাম্য। আমার ধারণা, মুখে যাই বলুন তিনি মহাজোট ছাড়বেন না। নির্বাচনের আগে তিনি জোটের কাছ থেকে অধিক সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করছেন। ক্ষমতায় যাওয়ার স্বপ্ন দেখিয়ে নিজের দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখার চেষ্টা করছেন। কারণ, তার দলে এখন ভাঙনের সুর। তার নিজের জেলা রংপুরেও তৃণমূল জাতীয় পার্টি গঠিত হয়েছে। গণতান্ত্রিক রাজনীতির মূল ধারা থেকে সরে গিয়ে তিনি নিজের এবং দলের রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পারবেন না। এটা আমার ধারণা, কোনো প্রেডিকসন নয়, জেনারেল এরশাদ আর যা-ই হোন, একেবারে কাঁচা রাজনীতিক নন। তিনি এখন মুখে যাই বলুন, মহাজোট ছাড়বেন না। মহাজোটে থাকলে আগামী নির্বাচনের পর তার দল জাতীয় রাজনীতিতে আরও বেশি সুবিধাজনক অবস্থানে যাবে। মহাজোট ছাড়লে এবং দেশে যথাসময়ে যথা নিয়মে নির্বাচন হলে তার জাতীয় পার্টি এবার উত্তরবঙ্গেও ক’টি আসন পাবে সে সম্পর্কে আমার সন্দেহ আছে। লন্ডন, ১৯ জানুয়ারি, শনিবার, ২০১৩

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন