সম্পর্কের দোলাচলে ভারত-পাকিস্তান

আপডেট : ২০ জানুয়ারি ২০১৩, ১৯:২৮
সম্পর্কের দোলাচলে রয়েছে দুই শক্তিশালী প্রতিবেশী ভারত ও পাকিস্তান। সমপ্রতি দেশ দুটির সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। তবে দেশ দুটির সরকার এবং রাজনৈতিক দলের নেতাদের কথাবার্তায় মাঝে মাঝে সম্পর্ক হোচট খাচ্ছে। ১৯৯৯ সালের কারগিল যুদ্ধের পরিস্থিতি এড়াতে দুই দেশই সচেষ্ট। কারগিল যুদ্ধসহ পূর্বের যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি এবং অর্থনৈতিক অবস্থা বিবেচনা করে দেশ দুটির সরকার আলোচনার দিকে যাচ্ছে। এ বছরের শুরুতে বিরোধপূর্ণ কাশ্মীর সীমান্তে গড়ে ওঠা উত্তেজনা দেশ দুটির মধ্যকার শান্তি প্রক্রিয়ায় যে ভাটা সৃষ্টি করেছিল সেটিতে আবার সম্পর্কের জোয়ার আসতে শুরু করেছে। তবে জোয়ারের পর আবার ভাটা আসবে কিনা সেটি নির্ভর করছে সীমান্তে আবার কোনো যুদ্ধবিরতির লঙ্ঘন ঘটবে কিনা সেটির ওপর। ভারত-পকিস্তানের রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারনা, দেশ দুটির নেতাদের সতর্ক মন্তব্য, গণমাধ্যম এবং সর্বোপরি জনগণ যুদ্ধাবস্থা থেকে সরে আসতে উভয় দেশের সরকারকে সহযোগিতা করছে। ২০০৩ সাল থেকে দক্ষিণ এশিয়ার পরমাণু শক্তিধর দেশ দুটির মধ্যে যুদ্ধবিরতি চুক্তি কার্যকর রয়েছে। এরপর বিভিন্ন সময় দুই দেশের সেনাবাহিনীর মধ্যে গুলি বিনিময়ের ঘটনা ঘটে। ২০১২ সালে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের৭০টি ঘটনা ঘটে। তবে সেটি বর্তমান পর্যায়ের ছিল না। এ বছর সম্পর্কের অবনতির ক্ষেত্রে যেটি সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখে সেটি হলো ভারতীয় দুই সৈন্যের একজনের মাথা বিচ্ছিন্ন করে নিয়ে যাওয়া। এ পর্যন্ত উভয় দেশের পাঁচজন সৈন্য নিহত হয়েছে। বরাবরের মতো ভারত এবং পাকিস্তান দু্ই দেশই এই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। গতকাল ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং বলেন, সীমান্তের ঘটনা ভারত পাকিস্তান সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তিনি বলেন, আমরা সবকিছু বিবেচনা করে সতর্কতার সঙ্গে সামনের দিকে যাব। তবে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে আমাদের মতো পাকিস্তানকেও এগিয়ে আসতে হবে। গত ১৫ জানুয়ারি তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্ক রাখা যায় না। গতকাল ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সালমান খুরশিদ বলেন, কারো দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আমরা পাকিস্তানের সঙ্গে সংলাপে বসবোনা। সার্বিক পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করবে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক কোনদিকে যাবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, দুই দেশের মহাপরিচালক (সামরিক অভিযান) পর্যায়ে আলোচনা একটি ইতিবাচক দিক। এর আগে তিনি বলেছিলেন, ভারত সরকার সেনাবাহিনী, জনগন এবং দেশের স্বার্থে যে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারে। বিশ্লেষকরা মনে করেন , এর মাধ্যমে তিনি হয়তো যুদ্ধের দিকেই ইঙ্গিত করেছেন। ভারতের বিরোধী দল ভারতীয় জনতা দলের (বিজেপি) পক্ষ থেকে আক্রমণাত্মক বক্তব্য দেয়া হয়। দলের নেত্রী সুষমা স্বরাজ বলেন, হেমারজের বিচ্ছিন্ন মস্তক পাওয়া না গেলে পাকিস্তান সৈন্যদের দশটি মাথা চাই। এরপর সরকার বিরোধী দলের সঙ্গে বৈঠক করে এবং এরপর বিরোধী দল কিছুটা নমনীয় ভাব দেখায়। ৬ জানুয়ারি পাকিস্তানের সৈন্য নিহত হওয়ার পর পাকিস্তানে নিযুক্ত ভারতের ডেপুটি হাইকমিশনারকে তলব করে ইসলামাবাদ। এরপর ভারতীয় সৈন্য নিহত প্রতিবাদে ভারতে নিযুক্ত পাকিস্তান হাইকমিশনারকে ডেকে পাঠায় ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এরপর ১৬ জানুয়ারি আবার পাকিস্তানের সৈন্য নিহত হলে ভারতের হাইকমিশনারকে তলব করে প্রতিবাদ জানায় পাকিস্তান। বরফ গলতে শুরু করে গত ১৪ জানুয়ারি। ওই দিন দুই দেশের সীমান্তের ব্রিগেড কমান্ডারদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে পরস্পর বিরোধী বক্তব্যই স্থান পায়। পাকিস্তান তাদের সৈন্য হত্যার তদন্ত দাবি করে এবং পাশাপাশি ভারতের সৈন্য হত্যার বিষয়টি অস্বীকার করে। ভারত পাকিস্তানের সৈন্য হত্যার অভিযোগ প্রত্যাখান করে। ভারতীয় কমান্ডাররা তাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় ভূমি মাইন পুঁতে রাখার অভিযোগ তোলে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে। তবে দুই দেশ সীমান্তে যুদ্ধবিরতির লঙ্ঘন করবে না বলে সিদ্ধান্ত নেয়। শুক্রবার ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং বলেন, আমাদের প্রতিবেশি বিপজ্জনক। তবে তাই বলে আমরা তাকে দূরে ঠেলে দিতে পারি না। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ভারত পাকিস্তানের আহবানে ইতিবাচক সাড়া দিবে। পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, ভারত এবং পাকিস্তানের জনগণ আর যুদ্ধ চায় না। কারণ এর আগের যুদ্ধগুলো শুরুর আগে দুই দেশের জনগণ তাদের সৈন্য হত্যার বিষয়ে যেভাবে প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন, সে রকম চিত্র এবার চোখে পড়েনি। কারণ মানুষ এখন আগের চেয়ে অনেক সচেতন হয়েছে। কেউ চায় না দুই প্রতিবেশী যুদ্ধ বাধিয়ে অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হোক। তারা দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককেই গুরুত্ব দিচ্ছে বলে মনে হচ্ছে।