পশ্চিম আফ্রিকার দুটি দেশ মালি ও আলজেরিয়া গত সপ্তাহে বিশ্ব মিডিয়ার নজর কাড়ে ভালোমতোই। মালিতে ক্রমবর্ধমান ইসলামী কট্টরপন্থিদের দমনে দেশটির সরকারকে সহায়তা করতে অভিযানে নামে ফরাসি সরকার। আর সেই অভিযানের প্রতিক্রিয়ায় ৪১ জন বিদেশি নাগরিককে পণবন্দি করে প্রতিবেশী আলজেরিয়ার উগ্রপন্থিরা। বিদ্রোহী দমন ও পণবন্দিদের মৃত্যু—সব মিলিয়ে উত্তাল রুদ্র হয়ে উঠেছে রুক্ষ পশ্চিম আফ্রিকা ।
মালির ঘটনার নেপথ্যে রয়েছে আল-কায়েদার সঙ্গে সংযুক্ত ইসলামী বিদ্রোহীরা। গত বছরের শুরুর দিকে মালির উত্তরাঞ্চল দখল করে নিয়েছিল এই বিদ্রোহীরা। সামপ্রতিক সময় তারা দেশটির রাজধানী বামাকোর দিকে অগ্রসর হতে শুরু করলে মালি সরকার ফ্রান্সের কাছে সামরিক সহায়তা চায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১১ জানুয়ারি মালিতে ফ্রান্স সরকার সামরিক অভিযান শুরু করে। গত সপ্তাহে পাঁচদিন ধরে ক্রমাগত আকাশপথে আক্রমণ চালায় ফরাসি বিমানবাহিনী। তারপরও কট্টরপন্থিদের দখলমুক্ত করা যায়নি মালিকে। তাই এবার স্থলপথে আক্রমণের পরিকল্পনা করেছে ফরাসি বাহিনী।
পশ্চিম আফ্রিকার মালিতে গত দশ বছর ধরে ক্রমশ শিকড় গেড়ে বসেছে কট্টরপন্থি সংগঠন আনসার দিন। আন্তর্জাতিক গোয়েন্দাদের রিপোর্ট অনুযায়ী সংগঠনের নাম ‘আনসার দিন’ হলেও বকলমে আল-কায়দাই রয়েছে এর পিছনে। অর্থনৈতিক অবস্থা করুণ হলেও মালিতে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নির্বাচিত সরকারই দেশ শাসন করত। ২০১২-এর ২১ মার্চ সেনা অভ্যুত্থানে পতন হয় সরকারের। মালির উত্তরাংশের বেশিরভাগ এলাকা আইনশূন্য। অরাজকতার সুযোগ নিয়ে অরক্ষিত মালির অধিকাংশ এলাকাই দখল করে নিয়েছে আনসার দিন। সংগঠনের নেতা আইয়াদ আগ-ঘালি পশ্চিম আফ্রিকার নামকরা আল-কায়দা নেতা হামাদা আল-হামার আত্মীয় ভাই। কাজেই সংগঠন শক্তপোক্ত করতে বিশেষ বেগ পায়নি আল-কায়দা। পাহাড়ি এলাকায় আফগানিস্তানের তোরাবোরা গুহার কায়দাতেই চলে গোপন আড্ডা তৈরির কাজ। তখনই হামলা চালানোর সিদ্ধান্ত নেয় ফ্রান্স।
জাতিসংঘের সতর্ক বার্তা উপেক্ষা করেই পশ্চিম আফ্রিকার মালিতে সেনা পাঠায় ফরাসি প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওল্যাঁদ। একা নন, উত্তর মালির কট্টরপন্থি সংগঠন আনসার দিনকে প্রতিহত করতে ফরাসি বাহিনীর সাহায্যে সেনা পাঠিয়েছে প্রতিবেশী দেশ নাইজার, বুরকিনা ফাসো, সেনেগাল ও নাইজেরিয়াও। উত্তর আফ্রিকার চাদ-এ সাময়িক বিমান ঘাঁটি তৈরি করে শুরুতে সেখান থেকেই মালির উত্তরাংশের কট্টরপন্থি অধ্যুষিত এলাকায় ব্যাপক বিমান হামলা চালানো হয়। ফ্রান্সের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, দেশের মাঝামাঝি শহর মোপতির উত্তর দিকে সবটাই কট্টরপন্থিদের হাতে চলে গেছে। এই এলাকাগুলোই ছিল ফরাসি বোমার লক্ষ্য। শুক্রবার দেশের উত্তরাংশের শহর কোন্না দখল করে নেয় সন্ত্রাসীরা। কট্টরপন্থিদের প্রকোপ বাড়তে দেখে আতঙ্কিত মালির প্রতিবেশী নাইজেরিয়া, সেনেগাল, বুরকিনা ফাসো আর নাইজারও ফ্রান্সকে সাহায্য করতে সেনা পাঠিয়েছে।
দেশের সরকারি টিভি চ্যানেলের খবর অনুযায়ী, ফরাসি সেনাবাহিনীর সাহায্যে মালির সেনারা কোন্না শহর পুনর্দখল করেছে। লড়াইয়ে অন্তত ১০০ কট্টরপন্থি নিহত হয়েছে। মারা গেছেন ১১ জন সাধারণ মানুষ। এদের মধ্যে সামিল তিন শিশুও। ফরাসি মিরাজ যুদ্ধবিমান থেকে অন্তত দু’টি ২৫০ কিলোগ্রাম ওজনের বোমা মোপতি শহরের উত্তরে ফেলা হয়েছে বলে খবরে বলা হয়।
গত সপ্তাহের বুধবার থেকেই শুরু হয়ে যায় অভিযান। এর আগে ফ্রান্স শুধুমাত্র আকাশপথে হামলার পরিকল্পনা করেছিল। কট্টরপন্থিদের বিরুদ্ধে অভিযানের ক্ষেত্রেও কথা ছিল নেতৃত্ব দেবে আফ্রিকান বাহিনী, ফরাসি বাহিনী শুধু সাহায্য করবে। কিন্তু বাহিনী এসে না পৌঁছানোয় স্থলপথে আক্রমণের প্রস্তুতি নেয় ফ্রান্স। অভিযানের রাশ রয়েছে ফরাসি বাহিনীর হাতেই। ক্রমাগত বোমাবর্ষণ সত্ত্বেও বেশ কিছু নতুন এলাকা দখল করেছে কট্টরপন্থিরা। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তারা এলাকার সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। ফলে এলাকাবাসীর ক্ষতি না করে শুধুমাত্র কট্টরপন্থিদের নির্মূল করার কাজটা প্রচণ্ড কঠিন হয়ে উঠছে। এর আগে জঙ্গিদের একাধিকবার আক্রমণের মুখে সাধারণ মানুষকে ঠেলে দিতে দেখা গেছে। তাই আক্রমণের সময় অতিরিক্ত সতর্কতার নির্দেশও রয়েছে যোদ্ধাদের উপর।
মালির কট্টরপন্থিদের শক্তি কমাতে ইতিমধ্যেই একজোট হয়েছে বেশ কয়েকটি দেশ। এই অভিযানে আমেরিকা কোনো সাহায্য পাঠাবে না, তা আরও একবার স্পষ্ট করে দেন মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী লিয়ন পানেত্তা। তবে তথ্য সরবরাহের কাজে সাহায্য করবে আমেরিকা। সেনা পরিবহনের কাজে মার্কিন বিমান ব্যবহার করার প্রস্তাবও বিবেচনা করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
অভিযান চালাতে মালিতে সাড়ে পাঁচশ’ ফরাসি সেনা এসে পৌঁছেছে ইতিমধ্যেই। প্রতিবেশী নাইজেরিয়া, সেনেগাল, বুরকিনা ফাসো ও টোগো থেকে পাঁচশ’ এবং বেনিন থেকে তিনশ’ মোট দুই হাজার তিনশ’ সহায়ক সেনারও রাজধানী বামাকোয় এসে পড়ার কথা সোমবার। উত্তর আফ্রিকার আরেক দেশ চাদ সে দেশে সাময়িক ফরাসি বিমান ঘাঁটি গড়ার অনুমতি দিয়েছে। পাশাপাশি আলজেরিয়াও ফরাসি বিমানবাহিনীকে নিঃশর্তে তাদের আকাশসীমা ব্যবহার করার অনুমতি দিয়েছে। একটি সূত্র বলছে, ফরাসি বিমানবাহিনী এরপর হয়তো মালির উত্তর দিকের কিদাল শহরকে টার্গেট করবে। আনসার দিন ও তার নেতা আইয়াদ আগ-ঘালির সবচেয়ে শক্তিশালী ঘাঁটি সেখানেই। ফরাসি প্রতিরক্ষামন্ত্রী জ্যঁ-ইভস দ্য দ্রিয়ঁ জানিয়েছেন, বিমান হামলা চালানোর পর মালির সেনা এবং যৌথবাহিনী স্থলভাগের বিভিন্ন এলাকা দখলের কাজে হাত দেবে। তবে কট্টরপন্থিদের দখলে থাকা অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র ও এসএ৭ এবং এসএ২-এর মতো বিমানঘাতী ক্ষেপণাস্ত্র বিস্মিত করেছে ফরাসিদের।
এদিকে গত কয়েক বছরে মালি এবং তার প্রতিবেশী দেশ নাইজেরিয়ায় বেশ কয়েকজন ফরাসি নাগরিককে অপহরণ করেছে কট্টরপন্থিরা।
ফ্রান্সের সাবেক উপনিবেশ মালির পূর্বদিকের অন্যতম বড় শহর গাও গত প্রায় এক বছর ধরে কট্টরপন্থি সংগঠন আনসার দিন, আল-কায়দা ইসলামী মাগরিব ও ‘মুজাও’ (মুভমেন্ট ফর ইউনিটি অ্যান্ড জেহাদ ইন ওয়েস্ট আফ্রিকা) সংগঠনের অধীনে ছিল। স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকেই বিভিন্ন সময় অভিযোগ করেছিলেন, কট্টরপন্থিদের কালাকানুনের সামান্যতম বিচ্যুতি দেখা দিলেই একেবারে তালেবানি ঘরানার অত্যাচার চালানো হতো এই অঞ্চলে। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে রাস্তায় ফেলে মারা হতো একের পর এক চাবুকের ঘা।
গত সপ্তাহের শুরুতে ফরাসি অভিযান প্রসঙ্গে ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ ফাবিউ জানিয়েছেন, মালিতে অনেকদিন থাকার কোনো পরিকল্পনাই নেই ফরাসি সরকারের।
ফরাসি আক্রমণের পর মালির বিদ্রোহীগোষ্ঠী আনসার দিন প্রতিশোধের হুমকি দিয়েছে। তাদের মুখপাত্র রয়টার্স বার্তা সংস্থাকে বলেছেন, ‘এই অভিযানের ফল ভালো হবে না এবং তা শুধু ফরাসি পণবন্দিদের জন্যই নয়—সব ফরাসি নাগরিকের জন্যই, তা তারা মুসলিম দুনিয়ার যেখানেই থাকুন না কেন।’ শুধুমাত্র মালিতেই প্রায় ছয় হাজার ফরাসির বাস, যাদের মালি পরিত্যাগ করার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। মালির বিদ্রোহীদের হাতে এখনও সাতজন ফরাসি নাগরিক পণবন্দি হয়ে আছেন বলে একটি সূত্র জানায়। তবে গোটা পশ্চিম আফ্রিকা জুড়ে হাজার হাজার ফরাসির বাস, বিশেষ করে সেনেগাল এবং আইভরি কোস্টে।
সামরিক বিশেষজ্ঞরা অবশ্য এই অভিযান শিগগিরই শেষ হওয়ার কোনো সম্ভাবনা দেখছেন না। কারণ উত্তর মালির বিদ্রোহী অধিকৃত এলাকা রুক্ষ ও জনবিরল, অথচ আয়তনে প্রায় ফ্রান্সের সমান এবং স্থল অভিযানের জন্য সরঞ্জাম অথবা সৈন্য দু’টোর কোনোটাই প্রস্তুত নেই।
স্থিতিশীলতা না ফেরা অবধি মালিকে সামরিক সহায়তা অব্যাহত রাখবে ফ্রান্স—ফরাসি প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওল্যাঁদ বলেছেন একথা। অন্যদিকে, জার্মান চ্যান্সেলর আঙ্গেলা ম্যার্কেল মালিতে মানবিক সহায়তা প্রদানের বিষয়টি বিবেচনা করছেন।
মালির প্রতিক্রিয়া আলজেরিয়ায় : এদিকে মালির প্রতিক্রিয়া পড়ে প্রতিবেশী দেশ আলজেরিয়ায়। সেখানে এক গ্যাস ফিল্ডে ৪১ জন বিদেশিকে জিম্মি করে একটি ইসলামী উগ্রবাদী গোষ্ঠী। তাদের দাবি, মালিতে আটক জঙ্গিদের ছেড়ে দিতে হবে।
তবে সরকার জঙ্গিদের সঙ্গে আলোচনার সম্ভাবনা বাতিল করে দিয়েছে। সরকার নিশ্চিত আলজেরিয়ার উগ্রপন্থি গোষ্ঠীটির নেতৃত্বে রয়েছেন মোখতার বেলমোখতার। ধারণা করা হয়, সামপ্রতিককালে পশ্চিমা দেশগুলোর অধিবাসীদের জিম্মি করার অনেক ঘটনার পেছনেই আছেন এই বেলমোখতার। এসব পণবন্দিকে উদ্ধারে আলজেরিয়ার সেনাবাহিনী গত বৃহস্পতিবারই অভিযান চালায়। তাতে কয়েকটি পশ্চিমা দেশের বেশ কয়েকজন নাগরিকসহ ২৩ জন জিম্মি এবং কমপক্ষে ৩২ জন উগ্রপন্থি মারা যায়। আলজেরিয়ার এ ঘটনার পর ফরাসি প্রেসিডেন্ট ফ্রঁঁসোয়া ওল্যাঁদ বলেছেন, মালিতে সেনা অভিযানের যৌক্তিকতা প্রমাণ হয়েছে আলজেরিয়ার ঘটনার মধ্য দিয়ে।
আলজেরিয়ার এ ঘটনায় ফ্রান্স, ব্রিটেন, জাপানসহ অনেকগুলো দেশই উত্কণ্ঠিত। অনেক জিম্মির কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। জিম্মিরা যেসব দেশের নাগরিক সেই দেশগুলো বলছে, আলজেরীয় সরকার জঙ্গিদের ওপর হামলা চালানোর আগে তাদের সঙ্গে কোনো আলোচনা করেনি। জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে এ নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেছেন, আলজেরিয়ার সরকার যা করেছে তা খুব দুঃখজনক। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর প্রথম বিদেশ সফর শুরু করেছিলেন তিনি। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কয়েকটি দেশ সফর করার কথা ছিল প্রধানমন্ত্রী আবের। কিন্তু সব সফর বাতিল করে তিনি দেশে ফিরছেন।
এদিকে আলজেরীয় সরকার জানিয়েছে, জঙ্গিদের ব্যাপারে অতীতের মতোই কঠোর তারা। জঙ্গিদের সঙ্গে কোনো আলোচনা, কোনো আপোষ সম্ভব নয়। সমঝোতার কোনো চেষ্টা না করার কারণও জানানো হয়েছে। আলজেরিয়া সরকার জানিয়েছে, উগ্রপন্থিরা জিম্মিদের নিয়ে অন্য কোনো দেশে চলে যাওয়ার পর আলোচনা শুরুর প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু সেটা মেনে নেয়া সম্ভব নয় বলেই হামলা চালানো হয়। উল্লেখ্য, আলজেরিয়া উনিশ শতকের মাঝামাঝি থেকে ১৯৬২ সালে ইতিহাসের অন্যতম রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা লাভের আগ পর্যন্ত ফ্রান্সের উপনিবেশ ছিল।
