চীনে নগরায়ন

বাড়ছে মধ্যবিত্তদের চাপ

আপডেট : ২০ জানুয়ারি ২০১৩, ১৯:২৮
চীনে ক্রমবর্ধমান নগরায়নে শহরে বাড়ছে মধ্যবিত্তদের ভিড়। গ্রামের দরিদ্র সাধারণ মানুষ একটু উন্নত জীবনের আশায় পাড়ি জমাচ্ছে শহরে। দেশটিতে রয়েছে মোট জনসংখ্যার শতকরা ১৮.২ ভাগ অর্থাত্ ২৪ কোটি ৪৭ লাখ লোক মধ্যবিত্ত। এই বিশাল অংশের কেউ না কেউ প্রতিদিন কোন না কোনভাবে চাপ সৃষ্টি করছে শহরে। তারা পুরনো পেশা কৃষি ছেড়ে কল-কারাখানায় চাকরির দিকে ঝুঁকছে। এতে একদিকে তাদের জীবনের কিছুটা পরিবর্তন ঘটলেও কমে যাচ্ছে কৃষি শ্রমিক। এটি দেশটির অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, এটা যেহেতু ধীরে ধীরে ঘটছে ,তাই এর প্রভাবও হবে ধীরে ধীরে। তবে অদূর ভবিষ্যতে এর ফলাফল ভয়াবহ হবে বলে মনে করছেন তারা। দেশটিতে শহুরে জীবনে এ জনস্রোত আজ নতুন কিছু নয়। তবে আশঙ্কার বিষয় এটা যেহারে বাড়ছে তা ভবিষ্যতের জন্য এক অশনি সংকেত। সমপ্রতি হিউনান প্রদেশের একটি প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে চাকরির খোঁজে সুজৌ শহরে (সাংহাইয়ের কাছে) আসেন ঝ্যাং লিউ দম্পতি। একসময়ে তারা কৃষিকাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। এখন তারা ভাগ্যের অন্বেষণে শহরে এসেছেন। অনেক খোঁজাখুঁজির পর তাদের মেলে সুজৌ ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কে (চীন-সিঙ্গাপুর যৌথ উদ্যোগের একটি প্রতিষ্ঠান) একটি কাজ। তাদের স্বপ্ন জীবনের অর্থনৈতিক দৈন্যদশাকে মুছে ফেলে সংসারে একটু সচ্ছলতা ফিরিয়ে আনা। সেই লক্ষ্যে তারা চীনা সমাজের একধাপ উপরে উঠতে চান। এই আশায় তারা বুক বেঁধে সামনের দিকে তাকিয়ে আছেন। ঝ্যাং লিউ বলেন, একসময়ে তাদের দৈনন্দিন জীবনের একটি সাধারণ পণ্য কিনতে হিমশিম খেতে হতো; এখন তাদের দিন অনেকটা ফিরেছে। জীবনের এই পথ পরিক্রমা শুধু ঝ্যাং দম্পতির বেলায়ই নয়, এমনই অনেক হাজারো ঝ্যাং পরিবার রয়েছে, যারা জীবনের প্রতিটি পরতে পরতে সংগ্রাম করে যাচ্ছেন। কেউ হয়তো এর সফলতার সিঁড়ি বেয়ে সামনে এগিয়ে যাচ্ছেন; আবার কেউ হয়তো শুরুতেই হোঁচট খেয়ে যেই তিমিরে ছিলেন, সেই তিমিরেই আছেন। দেশটিও এই লক্ষ্যে একটা শক্তিশালী মধ্যবিত্ত শ্রেণী নিয়ে আধুনিক সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায়। কিন্তু সবাইকে সঙ্গে ছাড়া এটা যে সম্ভব নয় তা তাদের অজানা নয়। কিন্তু নগরায়নের কারণে শহরে যে বাড়তি চাপের সৃষ্টি হচ্ছে তা মোকাবিলায় হিমশিম খাচ্ছে চীন। সুজৌ ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক চীন ও সিঙ্গাপুরের উদ্যোগে একটি যৌথ শিল্প-কারখানা। এটা চীনের আধুনিক শিল্প-কারখানার একটি উত্কৃষ্ট উদাহরণ। সেইসঙ্গে নগরায়নে একটা উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। প্রতিষ্ঠানটির মিডিয়া শাখার পরিচালক লিউ জিউ বলেন, আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে বাত্সরিক উন্নয়ন উত্তরোত্তর বৃদ্ধি করা যাতে আমরা অনেক লোকের উন্নত জীবন বিধানের ব্যবস্থা করতে পারি। তিনি বলেন, ইতিমধ্যে আমরা বছরে ৩০ ভাগ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছি। এ ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী দিনগুলোতে এ প্রতিষ্ঠানটি লাভজনক প্রতিষ্ঠানের মডেলে পরিণত হবে। অথচ মাত্র ১৫ বছর আগেও এই এলাকাটি ছিল একটি দিগন্ত বিস্তৃত ধানক্ষেত। সুজৌর মতো একটি আধুনিক শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে পুরো এলাকার চিত্রই পাল্টে গেছে। তিনি বলেন, সুজৌকে তুলনা করা যেতে পারে একটি জাতীয় সফলতার প্রতীক হিসাবে। কারণ এটা একটা কৃষিপ্রধান এলাকা থেকে শিল্প প্রধান এলাকায় রূপান্তরিত হয়েছে। সেইসঙ্গে এটি রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠান হিসাবেও যথেষ্ট সুনাম অর্জন করেছে। এখন চীন আশা করছে একই সফলতার ধারাবাহিকতা অন্যান্য কারখানাতেও গড়ে তুলবে। মূলত সংস্কার এবং উম্মুক্ত নীতির কারণেই এই নগরায়ন বেড়েছে। ২০১১ সালের হিসাব অনুযায়ী দেশটিতে নগরে লোকসংখ্যা ছিল ৬৯ কোটি ১০ লাখ যা মোট জনসংখ্যার শতকরা ৫১.২০ ভাগ। ১৯৯০ সালে এ হার ছিল ২৬ শতাংশ। ক্রমবর্ধমান এ নগরায়নের কারণে ২০৩৫ সাল নাগাদ নগরে লোকসংখ্যা হবে মোট জনসংখ্যার ৭০ ভাগ। পরবর্তী দুই অথবা তিন দশকে দেশটি ২০ হাজার থেকে ৫০ হাজার নতুন নতুন গগনচুম্বী অট্টালিকা গড়ে তুলবে। এ কারণে ২০২৫ সালে ১৭০টিরও বেশি শহরে দরকার হবে গণ-ট্রানজিট ব্যবস্থা। চীনের প্রধান অর্থনীতিবিদ হাজবিন ঝু বলেছেন, আগামী দুই অথবা তিন দশকে নগরায়ন হবে চীনের টেকসই প্রবৃদ্বির জন্য অন্যতম নিয়ামক। তিনি বলেন, প্রকৃতপক্ষে নগরায়ন বলতে অবকাঠামোগত চাহিদা বৃদ্ধি, জনসেবার মান উন্নয়ন প্রভৃতিকে বুঝায়, যার মাধ্যমে তৈরি হবে একটি মধ্যবিত্ত ভোক্তা শ্রেণী। আর এই শ্রেণীই একসময়ে তাদের কাজের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতির চিত্র পাল্টে দেবেন। তিনি বলেন, দ্রুত নগরায়নের কারণে একটা শঙ্কার জায়গাও সৃষ্টি হয়েছে। এর ফলে সাধারণ মানুষের শহরকেন্দি ক প্রবণতা বেড়েছে, যা গ্রামীণ অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল বিভাগের অধ্যাপক ক্যাম উইং চান বলেন, চীনের বর্তমান মধ্যবিত্ত শ্রেণী এখনও শক্তিশালী মধ্যবিত্ত শ্রেণীতে পরিণত হতে পরেনি। এর জন্য প্রয়োজন তাদের শিক্ষার হার বাড়ানো এবং অধিক দক্ষ কর্মীবাহিনী গড়ে তোলা। যদিও এখানে কলেজ পড়ুয়া অনেক গ্রামীণ ছাত্রের সংখ্যা বেড়েছে। কিন্তু পরিতাপের বিষয় তাদের অনেকেরই পড়াশুনা চালিয়ে যাওয়ার মতো আর্থিক সঙ্গতি নেই। তবে নগরায়নের কারণে দেশটিতে অন্যান্য স্থান থেকে আসা জনস্রোতে আবার নিয়ম-নীতির বালাইও রয়েছে। হুকোই সিস্টেমে নতুন কেউ শহরে আসলে তাকে নিবন্ধন করতে হয়। সে কৃষি শ্রমিক না অকৃষি শ্রমিক এ ধরনের অনেক তথ্য প্রদানের মাধ্যমে তাকে নাম লিপিবদ্ধ করতে হয়। আবার অন্য স্থান থেকে আসার কারণে তাদেরকে মৌলিক নাগরিক সুবিধা দেয়া হয় না। এক্ষেত্রে তাদের অর্থের মাধ্যমে ওই সুবিধা পেতে হয়। যেমন : শিক্ষা,স্বাস্থ্য প্রভৃতি সেবা পেতে হলে তাদের কিংবা তাদের সন্তানদের বাধ্যতামূলক অর্থ দিতে হয়। চীনে এ অসাম্য ব্যবস্থা চরমভাবে বিরাজ করছে। মূলত শহর ও গ্রাম এই দুইয়ের মধ্যে যথেষ্ট ফারাক বিদ্যমান। এটি সেবা কিংবা চাকরি উভয় ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। এছাড়া গ্রামে সেবার মান নিয়েও যথেষ্ট প্রশ্ন রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে শহরের চেয়ে গ্রামে সেবার মান নিম্নতম। এতে করে দেখা যায় নগরে বাস করা দু’টি শ্রেণীর সৃষ্টি হয়েছে। মাও সেতুং-এর সময়ে অভ্যন্তরীণ অভিবাসী শ্রমিকদের শহরে প্রবেশ করতে দেয়া হতো না। অর্থনৈতিক সংস্কারের পর এখন এটা পরিবর্তন হয়েছে। তিন দশক আগেও চীনে এক-পঞ্চমাংশ লোক শহরে বাস করতো। এখন এ সংখ্যা প্রায় তিনগুনে দাঁড়িয়েছে। চায়না ইন্সটিটিউট অব রিফর্ম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী প্রধান বলেন, চীনে মধ্যবিত্তের সংখ্যা আগামী ২০২০ সালের মধ্যে ৬০ কোটি ছাড়িয়ে যাবে। অধিকাংশ লোকই তখন কাজের সন্ধানে ভালো মজুরির প্রত্যাশায় শহরে ছুটবে।