সাম্প্রতিক মিয়ানমার সম্পর্কে জাপানি সাংবাদিক ফ্রান্সিস ফুকুইউমা লিখেছেন, প্রেসিডেন্টের প্রাসাদের সামনে আমি ২০ লেনের রাস্তা দেখেছি। এর পরে প্রেসিডেন্টের যে প্রাসাদ দেখলাম তা যুক্তরাষ্ট্রের হোয়াইট হাউস থেকে কয়েকগুণ বড়। যে হোটেলে আমি থাকলাম তা দুর্দান্ত। একেবারে পরিপাটি, গোছানো, সুন্দর। কিছুদূর এগিয়ে গেলেই আরো কয়েক ডজন পাঁচতারকা হোটেল আমার চোখে পড়লো। সামনের এশিয়ান গেমস এবং আসিয়ান সামিটকে সামনে রেখে মিয়ানমারের সরকার এ হোটেলগুলো তৈরি করছে। তবে এর আড়ালে অন্য সত্যি লুকিয়ে আছে বলে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জাপানী ওই সাংবাদিককে বলেছেন। সামরিক শাসন থেকে গণতন্ত্রের পথে উত্তরণের পর পশ্চিমা বিনিয়োগকারীরা এখন ছুটছেন মিয়ানমারের দিকে।
নতুন এ মিয়ানমারের খবরে অনেকে হয়তো অবাক হবেন, বিশেষ করে যারা ১৯৬৪ সালের একটি ঘটনার সাক্ষী হয়ে আছেন। সেসময় তত্কালীন বার্মাতে ইংরেজি শিক্ষা নিষিদ্ধ করা হয়েছিলো। এর প্রতিবাদে ছাত্ররা রাস্তায় নেমে পড়ে। পরিস্থিতি এমন জটিল হয়েছিলো যে, সরকার তিন বছর ধরে রেংগুন বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছিলো। কিন্তু আজকের মিয়ানমারে তরুণরা ইংরেজি শেখার জন্য ল্যাংগুয়েজ ক্লাবগুলোর সামনে লাইন দিচ্ছে। অনেকে আফসোস করছে এ ভাষাটা আগে শিখেনি বলে। এই ইংরেজি শেখার পেছনে মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে-পশ্চিমা কোম্পানিগুলোতে বেশি বেতনে চাকরি করা।
তবে মিয়ানমারের ওপর থেকে পশ্চিমারা অবরোধ তুলে নেয়ায় অনেকে মনে করছেন সেখানকার জান্তা সরকার অনেক ভালো থাকবেন। কিন্তু সাম্প্রতিককালের কিছু ঘটনা মিয়ানমার জান্তা সরকারকে ভালোভাবেই টেনশনে রেখেছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ভালো সম্পর্ক আর অপরদিকে বিদ্রোহীদের সাথে চীনের ভালো সম্পর্ক মিয়ানমার সরকারকে ফেলেছে বিপদে। কমিউনিস্ট পার্টি অব বার্মার (সিপিবি) সাথে চীনের সম্পর্ক ঐতিহাসিক। অনেক আগে থেকেই চীনা সরকার সিপিবিকে অস্ত্র সরবরাহ করে আসছে। ১৯৬৭ সালে চীন বার্মার ছাত্রদেরকেও অস্ত্র সরবরাহ করে আসছিলো। এছাড়া মিয়ানমার সরকার দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে যে, চীন মিয়ানমারের বিদ্রোহী গ্রুপকেও বড় মাপের অস্ত্র সরবরাহ করে। বিশেষ করে ওয়া এবং কাচিন প্রদেশের বিদ্রোহীরা চীন থেকে প্রতিনিয়ত অস্ত্র পেয়ে আসছে। এ দুটি প্রদেশের সীমান্ত চীনের ইউয়ান প্রদেশের সাথে লাগোয়া। এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, মিয়ানমারের জান্তা সরকার এবং সরকার সমর্থিত রাজনীতিকরা চীনের এ যোগাযোগ সম্পর্কে ওয়াকিবহাল। তবে কোন কোন নিরাপত্তা বিশ্লেষক বলছেন, চীন এক্ষেত্রে দ্বৈত নীতি অবলম্বন করছে। বিশেষ করে একদিকে জান্তা সরকারকে চীন যেমন সমর্থন করছে আবার অস্ত্র দিয়ে বিদ্রোহীদের সহায়তা করছে।
সাম্প্রতিককালে মিয়ানমার সরকার অনেক বিদ্রোহী গ্রুপের সাথে অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তি করেছে। তারপরও বিদ্রোহীদের একটি বড় অংশের কাছে এখনো অস্ত্র রয়ে গেছে। বিশেষ করে কাচিন বিদ্রোহীরা এখনো সরাসরি চীনের সাথে যুক্ত। চীনের সাথে সীমান্ত থাকায় তারা রয়েছে সুবিধাজনক অবস্থানে। এখানে চীনের অর্থনীতির সম্পর্কটিও জড়িত। কাচিন প্রদেশে চীনের অনেক বিনিয়োগ রয়েছে। এখানে চুনাপাথর এবং গ্যাস পাইপলাইনের বড় ব্যবসা। যে গ্যাস পাইপলাইন মিয়ানমার হয়ে চীনে প্রবেশ করেছে তার উল্লেখযোগ্য অংশ আসে কাচিন প্রদেশ দিয়ে। কাচিন ইন্ডিপেন্ডেন্ট আর্মি ওই অঞ্চলের অধিকাংশ জায়গা নিয়ন্ত্রণ করে। তাদেরকে হাতে রেখে চীন ব্যবসা করছে বলে অনেক নিরাপত্তা বিশ্লেষক মনে করেন। কারণ কাচিন প্রদেশ দিয়ে চীনের মোট ৬ শতাংশ জ্বালানি পরিবাহিত হয়ে থাকে।
তবে চীন কি ইচ্ছে করে মিয়ানমারে অস্থিতিশীল অবস্থা জিইয়ে রেখেছে? এ প্রশ্নের উত্তরে অনেকে বলছেন, এটা হয়তো নাও হতে পারে। ঐতিহাসিকভাবে এটা চলে আসলেও চীন এখন আর সেটা চায় না। কারণ চীন তার জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চাইলে কাচিন প্রদেশে স্থিতিশীলতা বজায় রাখার প্রয়োজন আছে। কারণ কাচিন অস্থিতিশীল হলে মিয়ানমারে চীনের অবকাঠামোগত বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হবে। মিয়ানমারের ওপর দিয়ে চীনের পাঁচ হাজার কিলোমিটারেরও বেশি পাইপলাইন রয়েছে। ইতিমধ্যে মিয়ানমার জান্তা সরকার কাচিন বিদ্রোহীদের দমনে আক্রমণ শুরু করে দিয়েছে। অবশ্য শনিবার মিয়ানমার সেনাবাহিনী অস্ত্রবিরতি ঘোষণা করে বিদ্রোহীদের সাথে আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছে। চীন এতে কোন প্রতিক্রিয়া না জানালেও মনে করা হচ্ছে এ বিষয়ে তারা আগে থেকে জানতো। জান্তা থেন সেইন এখন আর নিজ থেকে কোন সিদ্ধান্ত নেন না। দেশের নিরাপত্তার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে এখন তিনি ১১ সদস্যের নিরাপত্তা উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করেছেন। যে কোন অভিযানের বিষয়ে এখন তারা সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন। অভিযোগ রয়েছে যে, নিরাপত্তা পরিষদের অনেকে চীন ঘেঁষা। আনুষ্ঠানিকভাবে তারা চীনের সাথে আলোচনা না করলেও গোপনে চীনা অথরিটির সাথে তারা আলোচনা করে নিয়েছেন।
অবশেষে মিয়ানমারের জান্তা সরকার বিদ্রোহীদের সাথে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দেয়। গত শনিবার মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে এ প্রস্তাব দেয়া হয়। তবে গতকাল রবিবার সেনাবাহিনী বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালায়। ব্রিটিশ গণমাধ্যম বিবিসির সংবাদদাতা জনাথন হেড কাচিন থেকে জানিয়েছেন, যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব আসার পরও বিদ্রোহীরা এখনো আতংকে আছে। কারণ যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবে বলা হয়েছে, সেনাবাহিনী আত্মরক্ষার্থে গুলি চালাতে পারবে। আর দীর্ঘ ১৮ মাস যুদ্ধ চালানোর পর হঠাত্ করে সেনাবাহিনী শান্তি চাচ্ছে এটাও বিদ্রোহীদের বিশ্বাস হচ্ছে না। অপর রিপোর্টে বলা হয়, ২০১১ সালের মাঝামাঝি শুরু হওয়া যুদ্ধে এ পর্যন্ত ১০ হাজারেরও বেশি লোক উদ্বাস্তু হয়েছে।
মিয়ানমার সরকার বিদ্রোহীদের জন্য ক্ষমা ঘোষণা করলেও অনেক গ্রুপ ইতিমধ্যে অস্ত্র জমা দিয়েছে। শুধু কাচিন ইন্ডিপেন্ডেন্ট আর্মি এখনো অস্ত্র জমা দেয়নি।
বার্মায় এখন সামরিক জান্তা সমর্থিত বেসামরিক সরকার রয়েছে। ২০১০ সালের নভেম্বরে নির্বাচনী আইনসহ নানা বিষয়ে সংস্কারের মাধ্যমে যে নির্বাচন হয়েছে তাতে একটি বেসামরিক সরকার নিযুক্ত হলেও সমস্যা এখনো পুরোপুরি কাটেনি। থেন সেইনের ছায়া রয়ে গেছে সরকারের মধ্যে।
