রেন্টাল পাওয়ার প্ল্যান্ট স্থাপনে দুর্নীতির কারণে সম্প্রতি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী রাজা পারভেজ আশরাফকে গ্রেফতারের নির্দেশ দিয়েছে দেশটির সুপ্রিম কোর্ট। ধর্মীয় নেতা তাহিরুল কাদরির নেতৃত্বাধীন দুর্নীতি বিরোধী অভিযানের পর সুপ্রিম কোর্ট এ নির্দেশ দেয়। এ বিক্ষোভের পিছনে সেনা সমর্থন রয়েছে বলে বিভিন্ন মহল থেকে অভিযোগ রয়েছে।
পাকিস্তানের রাজনৈতিক ইতিহাসে সেনাবাহিনীর প্রভাব নতুন কোনো ঘটনা নয়। তবে এ ঘটনা নতুন করে গণতন্ত্রকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করছে দেশটির গণমাধ্যমগুলো। এসব গণমাধ্যমের মতে এ ঘটনা নতুন করে বিশৃঙ্খলা এবং অনিশ্চয়তার সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে বর্তমান সরকারের ভবিষ্যত্ ও আগামী নির্বাচন নিয়ে সন্দেহ ও অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। সামনে খুব কঠিন সময় আসছে। ডেইলি টাইমস কাদরির বিক্ষোভ ও প্রধানমন্ত্রীকে আটকের আদেশকে রাজনৈতিক ব্যবস্থায় অস্থিরতা বলে উল্লেখ করেছে। এসব ঘটনার পেছনে সম্ভবত কিছু অদৃশ্য হাত রয়েছে। যারা পিয়ানো বাজানোর মতো এসব ঘটাচ্ছে। সময় হলেই এসব বেসুরো সুর শোনা যাবে।
পাকিস্তানের এ অস্থির অবস্থার মধ্যে রাজনৈতিক প্রভাবশালী কিছু ব্যক্তির কথা উল্লেখ করেছে বিবিসি। যারা দেশটির রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন এবং সম্ভাব্য যেকোন পট-পরিবর্তনে তারা অনুঘটক হিসেবে কাজ করতে পারেন। আবার সুবিধাপ্রাপ্ত ও সুবিধা বঞ্চিতও হতেও পারেন। পাকিস্তানের সরকার প্রায় সেনাবাহিনী ও বিচার বিভাগের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়েছে। প্রধানমন্ত্রী ইউসুফ রাজা গিলানিকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে অযোগ্য করায় বিচারকরা রাজনৈতিক ব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ করেছে বলে অনেকে মনে করে থাকে। তাই এ তালিকায় মূলত রাজনীতিক, সেনা কর্মকর্তা ও বিচারকদের নামই এসেছে।
প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারি
পাকিস্তানের রাজনীতিতে বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব হলেন জারদারি। তাকে প্রায়ই এক্সিডেন্টাল (দৈবক্রমে) প্রেসিডেন্ট মনে করা হয়। তার স্ত্রী বেনজির ভুট্টোর হত্যাকাণ্ডের পর পাকিস্তানিদের সহানুভূতি পেয়ে ক্ষমতায় আসেন তিনি। তার সরকারের সময় পাকিস্তানে আত্মঘাতী হামলা, সামাজিক অস্থিরতা, দুর্নীতি ও সামাজিক অব্যবস্থাপনা চরম রূপ ধারণ করেছে। তার নেতৃত্বের কারণে পাকিস্তান ও ওয়াশিংটনের সম্পর্কেও অবনতি হয়েছে। দুর্নীতির অভিযোগের কারণে জারদারি পাকিস্তানিদের কাছে মিস্টার টেন পারসেন্ট হিসেবে পরিচিত। সুপ্রিম কোর্ট তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা আবারো চালু করতে চাইছে। যদিও একটি দুর্নীতি মামলায় তিনি ইতিমধ্যে ৮ বছর জেল খেটেছেন। শারীরিক অসুস্থতার জন্য তিনি বর্তমানে পাকিস্তানের রাজনীতি থেকে নিজেকে অনেকটা দূরে সরিয়ে রেখেছেন। চিকিত্সার জন্য অনেক সময় তিনি বিদেশে অবস্থান করছেন।
২০১১ সালের শেষদিকে তিনি পাকিস্তানে সম্ভাব্য সেনা অভ্যুত্থান ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সহায়তা চেয়েছিলেন বলে অভিযোগ ওঠে। যদিও জারদারি এ অভিযোগ অস্বীকার করেন।
প্রধানমন্ত্রী রাজা পারভেজ আশরাফ
পাকিস্তান পিপলস পার্টির বিশ্বস্ত নেতা হলেন প্রধানমন্ত্রী রাজা পারভেজ আশরাফ। গিলানি সরে যাওয়ার পর তিনি ২০১২ সালের জুনে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হন। রেন্টাল পাওয়ার প্রজেক্টে দুর্নীতির অভিযোগে সম্প্রতি তাকে গ্রেফতারের আদেশ দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। দুর্নীতির অভিযোগ ওঠায় তার নাম হয় রাজা রেন্টাল। যদিও তিনি এসব অভিযোগ অস্বীকার করে এসেছেন।
জেনারেল আশফাক পারভেজ কায়ানি
পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর ইতিহাসে কঠিন সময় পার করছেন এই সেনাপ্রধান। পাকিস্তানের মাটিতে মার্কিন সেনাদের হাতে আল কায়েদা নেতা ওসামা বিন লাদেন নিহত হয়েছেন, দেশটির জঙ্গিদের হামলার হুমকি বেড়েই চলেছে, মার্কিন ড্রোন হামলার কারণে জঙ্গিদের সঙ্গে নিরীহ পাকিস্তানি মারা যাওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যেও সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে ক্ষোভ বাড়ছে। চলতি মাসেই শিয়া নেতারা সেনাবাহিনীর ব্যর্থতার জন্য সেনাপ্রধানের সরাসরি সমালোচনা করে। কথিত জারদারি মেমোগেট কেলেঙ্কারির তদন্তের দাবি জানিয়েছিলেন এই সেনাপ্রধানই। যদিও তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী ইউসুফ রাজা গিলানি তার বিরুদ্ধে অসাংবিধানিক আচরণের অভিযোগ তুলেছিলেন। পাকিস্তানের সেনাবাহিনী তিনবার অভ্যুত্থানের ঘটনা ঘটিয়েছে। এখনো সে ধরনের সম্ভাবনা রয়েছে। যদিও এ মুহূর্তে জঙ্গিদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে থাকা সেনাবাহিনী খুবই চাপের মধ্যে রয়েছে। এ অবস্থায় কোনো অভ্যুত্থান হলে সেনাবাহিনীকে আন্তর্জাতিক সমালোচনার মুখে পড়তে হবে।
সাবেক প্রেসিডেন্ট পারভেজ মোশাররফ
পাকিস্তানের সাবেক এই স্বৈরশাসক এখনো দেশটির রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। ২০০৮ সালে ক্ষমতা থেকে নেমে যাওয়ার পর বর্তমানে স্বেচ্ছায় নির্বাসনে বিদেশে অবস্থান করছেন। ২০১২ সালে তিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন দেশে ফিরবেন। এ সময় তার সমর্থকদের নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে আহ্বান জানান। কিন্তু দেশে ফিরলে গ্রেফতার করা হবে এমন হুমকিতে তিনি দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত বাদ দেন। প্রয়াত সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টোকে তিনি যথাযথ নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হন বলে অভিযোগ রয়েছে। তিনি যখন ক্ষমতা থেকে নামেন তখন সেনাবাহিনীর প্রতি সাধারণ মানুষের বাজে ধারণা ছিলো। তারা আবারো ক্ষমতায় আসুক তা পাকিস্তানের অনেক জনগণই চায় না।
বিরোধী দলীয় নেতা নওয়াজ শরীফ
নওয়াজ শরীফ ইউএস মেমোগেটকে তিনি বিশ্বাসঘাতকতার মতো কর্মকাণ্ড বলে সুপ্রিম কোর্টের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন। দুইবারের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফ পাঞ্জাবের মূল রাজনৈতিক দল ও দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম দলের নেতা। বেনজীর ভুট্টো নিহত না হলে ২০০৮ সালের নির্বাচনে তার জয়ের সম্ভাবনাই বেশি ছিলো। রাজনীতিতে এখন সতর্ক হয়ে খেলা খেলছেন তিনি এবং সময়ের জন্য অপেক্ষায় রয়েছেন।
সাবেক ক্রিকেটার ইমরান খান
সাবেক এই ক্রিকেটার বিগত কয়েক বছর ধরেই রাজনীতি করছেন। জনগণের মাঝে তার ব্যাপক জনপ্রিয়তা থাকলেও নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনা তার অনেক কম। ২০১২ সালের অক্টোবরে মার্কিন ড্রোন হামলার বিরুদ্ধে প্রচারণা চালিয়ে তিনি ব্যাপক জনসমর্থন পান।
প্রধান বিচারপতি ইফতিখার মুহাম্মদ চৌধুরী
সরকারের বিরুদ্ধাচরণ করার সুনাম রয়েছে এই প্রধান বিচারপতির। ২০০৭ সালে প্রেসিডেন্ট মোশাররফের সময় বরখাস্ত হওয়া কয়েকজন বিচারপতির মধ্যে তিনিও একজন ছিলেন। দীর্ঘ আন্দোলনের পর ২০০৯ সালের মার্চে তাকে স্বপদে বহাল করা হয়। জনমনে তার সম্পর্কে ভালো ধারণা রয়েছে। যদিও পাকিস্তানের ইতিহাসে সেনা অভ্যুত্থানকে সব সময় বৈধতা দিয়ে এসেছে বিচার বিভাগ।
গোয়েন্দা প্রধান জহিরুল ইসলাম
২০১২ সালে ইন্টার সার্ভিস ইন্টিলিজেন্স (আইএসআই)-এর প্রধান হন জহিরুল ইসলাম। গোয়েন্দা সংস্থাটি সীমান্ত এলাকায় জঙ্গিদের মদদ দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র এমন অভিযোগের মুখে তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করেন। যদিও পাকিস্তান এ ধরনের অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। করাচিতে এক সেনাপরিবারে জন্মগ্রহণ করা জেনারেল ইসলাম-এর আগে আইএসআই-এর উপ-প্রধান ছিলেন। অনেকেই মনে করেন, আফগান তালেবানদের সঙ্গে শান্তি আলোচনার ক্ষেত্রে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবেন।
