[ রা জ নী তি ]

ঐতিহ্যহারা ছাত্রলীগ

আপডেট : ২০ জানুয়ারি ২০১৩, ২১:১২
মনে হয় যেন নতুন করে ছাত্রলীগ দিব্যি সংবাদপত্রগুলোর পাতায় রঙিন ও বড় বড় শিরোনামে ঠাঁই করে নিয়েছে। কি ব্যাপার? তারা এবারে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদেরকে পেটাচ্ছে। শিক্ষকদেরকে পিটিয়ে রক্তাক্ত দেহে হাসপাতালে ভর্তি হতে বাধ্য করছে। এমন কোন নজিরের খবর ছাত্রলীগের জন্মকাল থেকে আজঅবধি আমাদের জানা নেই। আরও চাঞ্চল্যকর খবর হলো এবারে ছাত্রলীগ শিক্ষকদেরকে পুড়িয়েছে এসিড ছুঁড়ে মেরে। নিবন্ধটি লিখতে শুরু করতে না করতেই হকার এসে পত্রিকাগুলো দিয়ে গেলে দেখি, একটি বহুল প্রচারিত জাতীয় দৈনিক তার প্রথম পৃষ্ঠায় লালকালিতে চার কলাম শিরোনামে ব্যানার করেছে। ফের ভয়ংকর ছাত্রলীগ। তাতে যেরকম করে তুলে ধরা হয়েছে হামলা হচ্ছে শিক্ষকদের উপর, অস্ত্রের সঙ্গে যোগ হয়েছে এসিড, সভাপতি দুষলেন শিক্ষকদেরই। খবরে বলা হয়েছে: ছাত্রলীগকে নিয়ন্ত্রণ করার কেউ নেই। দেশের শিক্ষাঙ্গনগুলোতে ফের বেপরোয়া হয়ে উঠছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের এই ছাত্র সংগঠনটি। সাধারণ শিক্ষার্থী ভিন্ন ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মী কিংবা পথচারী— কে্উই এখন আর রেহাই পাচ্ছে না তাদের হাত থেকে। নিরাপদ নন শিক্ষকরাও। ছাত্রলীগ ক্যাডাররা তাদেরকে পেটাচ্ছে নির্মমভাবে। ছাত্রলীগের আক্রমণে আতংকিত হয়ে পড়েছেন সরকারি-বেসরকারি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা। পুলিশের সামনেই ছাত্রলীগ ক্যাডারদের সশস্ত্র মহড়া, হামলা, সংঘর্ষ নিত্যদিনকার ঘটনায় পরিণত হয়েছে। ভর্তি বাণিজ্য টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস, দখলবাজির নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রতিপক্ষ ছাত্র সংগঠনের ঘটনা সংঘর্ষে কিংবা নিজেদের মধ্যে খুনোখুনিতে লিপ্ত হচ্ছে। সরকারের শেষ বছরের শুরুতেই ছাত্রলীগের এই লাগামহীন সন্ত্রাসে অশান্ত হয়ে পড়েছে দেশের প্রায় সব শিক্ষাঙ্গন। আতংকের পরিবেশ বিরাজ করছে এখন উচ্চশিক্ষার পাদপীঠ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে। কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের সশস্ত্র ক্যাডাররা শিক্ষক লাউঞ্জে হামলা চালায়। এতে ৩০ জন শিক্ষিক আহত হন। লাঞ্ছিত হন আরও ৪০ জন শিক্ষক। এর দু’দিন আগে বৃহস্পতিবার রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনকারী শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের উপর হামলা চালায় আওয়ামী লীগের এই ছাত্র সংগঠনটি। এ সময় তারা মারধর করেই ক্ষান্ত হননি। শিক্ষকদের উপর এসিড পর্যন্ত ছোঁড়ে এই ছাত্রলীগ ক্যাডাররা। এর আগের দিন বুধবার মধ্যরাতে ছাত্রী হোস্টেলে প্রবেশ করে ইন্টার্নি চিকিত্সক ও ছাত্রীদের মারধর এবং কয়েকজনের শ্লীলতাহানিও করে এর নেতা-কর্মীরা। বিগত চার বছরে ছাত্রলীগ দেশের প্রায় সবক’টি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে চারশ’র বেশি সংঘর্ষ ও হামলার ঘটনা ঘটায়। সশস্ত্র এসব ঘটনায় অন্তত ২৪ জন নির্মম খুনের শিকার হন। আহত হন সহস্রাধিক নেতা-কর্মী ও পুলিশ। পুরোনো ঢাকায় বিশ্বজিেক নির্মমভাবে হত্যা করে সাম্প্রতিক সময়ে সব পৈশাচিকতাকে হার মানিয়েছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগ ক্যাডাররা। কাহিনীর সমাপ্তি এখানেই নয়। বিশ্বস্ত নানা সূত্রে জানা যায়, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রলীগের সন্ত্রাসী হামলায় ২৪ জন মেধাবী ছাত্র নির্মম হত্যার শিকার হন। ছাত্রলীগের প্রতিপক্ষ সংগঠন কিংবা ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলজনিত সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে ৪০০ বার। ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, জাহাঙ্গীরনগর, কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী পলিটেকনিক, জগন্নাথ, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট), খুলনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, কুমিল্লা এবং শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ, চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ, ঢাকা ডেন্টাল কলেজ, ঢাকা পলিটেকনিক, রাজশাহী পলিটেকনিক; সিলেট এমসি কলেজ, পাবনা টেক্সটাইল কলেজসহ মহানগর, জেলা, উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত ছোট-বড় অসংখ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অজস সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এসব সংঘর্ষের কারণে ৭০টিরও বেশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য দফায় দফায় বন্ধ ঘোষণা করতে কর্তৃপক্ষকে বাধ্য হতে হয়। কখনো আধিপত্য বিস্তার, হল দখল, ভর্তি বাণিজ্য, চাঁদাবাজির টাকার ভাগ-বাঁটোয়ারা, টেন্ডারবাজি, নিয়োগ বাণিজ্য, কিংবা পদ্মা সেতুর টাকা উত্তোলনের নামে অবৈধভাবে অর্থ আদায়, কখনওবা অন্য অপকর্ম নিয়েও সংঘটিত হয়েছে অসংখ্য সংঘর্ষ। ক্যাম্পাসগুলোতে এসময় খই ফোটার মত গুলি বিনিময় হতে দেখা গেছে, দেখা গেছে রামদার মত এবং অপরাপর অস্ত্র নিয়ে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার মত বীভত্স ঘটনা ঘটতে। ছাত্রলীগ ক্রমে ক্রমে বেপরোয়া হয়ে উঠতে পারলো। দফায় দফায় আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার সুযোগে এবং শুধু তাই না, সরকারি ও দলীয় কর্তৃপক্ষ কদাপি ছাত্রলীগের গায়ে বিন্দুমাত্র আঘাত না দেয়াতে। যেন ছাত্রলীগের জন্য সাত খুন নয়, হাজার খুনও মাফ। এগুলোর জাজ্বল্যতম প্রমাণ তো আজকের বাংলাদেশের সর্বত্র দেখা যাচ্ছে। মানুষ অসহায়, শিক্ষকমণ্ডলী অসহায়, অভিভাবকবৃন্দ অসহায়, একসাথে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পাঠরত মেয়েরা অসহায়— যত্রতত্র তাদের সম্ভ্রম লুণ্ঠন, অপহরণ কোন লুকোচুরির ব্যাপার নয়, অসহায় পুলিশ, অসহায় সারাটি দেশ। কিন্তু যে বিষয়গুলো নিয়ে ছাত্রলীগের যে মাতম দীর্ঘদিন যাবত্ সবাই প্রত্যক্ষ করছি তার সাথে শিক্ষার সম্পর্ক, জাতীয় স্বার্থের সম্পর্ক, দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের আদৌ কোন সম্পর্ক আছে কি? ছোটবেলায় শিক্ষকদেরকে বিশেষ করে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে বলতে শুনেছি ছাত্রনং অধ্যয়নং তপঃ অর্থাত্ লেখাপড়াই ছাত্রদের তপঃ বা প্রধান আরাধ্য বিষয়। মাথা পেতে তা মেনে নিতাম। যে তরুণেরা আন্দোলনের মুখে পাকিস্তান আমলে একসময় গড়ে তুলেছিলেন পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগ— অতঃপর পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ যা আজ পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ থেকে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ নামে পরিচিত এবং ব্যাপকভাবেই বর্তমানে আলোচিত। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের পর গড়ে উঠলো পাকিস্তানের প্রথম অসাম্প্রদায়িক বামপন্থি ছাত্র সংগঠন—পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন, বর্তমানের বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের। এই সংগঠনগুলোর জন্ম এদেশের আন্দোলনের এক একটি পর্যায়ের ইতিহাসকে সগৌরবে ধারণ করে তাদের অহর্নিশ আন্দোলন সংগ্রামের ফলে দেশে ক্রমান্বয়ে নানা রাজনৈতিক দলও গড়ে ওঠে— যেন ঐ তরুণেরাই তার স্রষ্টা। আজকের নানা রাজনৈতিক দলের, কি কেন্দ্রীয়, কি স্থানীয় তাবত্ নেতৃত্বের দিক তাকালেই দেখা যাবে ঐ ছাত্রসংগঠনগুলোর জন্ম দেয়া নেতা-নেত্রীদেরকেই সামান্য কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া। এরাই জাতীয় ঐক্য গড়ে তুললেন ষাটের দশকের শেষদিকে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৬-দফা ও ছাত্র সমাজের ১১-দফার সমন্বয় ঘটিয়ে গণ-আন্দোলনের মাধ্যমে আর এই আন্দোলনগুলোর কণ্ঠশ্রুতিতেই আজকের স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। তাতে ছাত্রলীগের অতীত অবদান গৌরবের— যা আজ বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে যাচ্ছে— নন্দিত নন, নিন্দিত হচ্ছেন জনগণের কাছে ছাত্র সমাজসহ সবার কাছেই। কিন্তু যে ছাত্রনেতারা এই বিশাল ইতিহাস রচনা করলেন অক্লান্ত আন্দোলন, গভীর দেশপ্রেম ও আত্মত্যাগের মাধ্যমে জাতির স্বার্থে বহু বিশাল অর্জনের গৌরবের দাবিদার হলেন তার মূল কারণটি কি ছিল। কি এমন চমক ছিল যাতে কোটি কোটি দেশবাসী তাদের প্রতি এত গভীরভাবে আকৃষ্ট হলেন? একমাত্র দেশপ্রেম, নিষ্ঠা, সততা, চারিত্রিক দৃঢ়তা ও আপোষহীন আন্দোলনের ফলেই সাবেক কালের ছাত্রনেতারা নন্দিত হওয়ার সৌভাগ্য ও গৌরব অর্জন করেছিলেন। অতীতের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের অন্যতম শ্রদ্ধা ছাত্রলীগ আজ নারীমাংসের লোভ, ভর্তি বাণিজ্যের লোভ, টেন্ডার বাণিজ্যের মোহ, নানা কিছু দখলের মধ্যদিয়ে ব্যক্তি ও গোষ্ঠীস্বার্থ উদ্ধার করার কাজে অতি নোংরাভাবে লিপ্ত, শিক্ষা-প্রসার নয়, শিক্ষাকে ধ্বংস করার কাজে লিপ্ত, শিক্ষকদের প্রতি শ্রদ্ধাশীলতা দূরের কথা—তাদেরকে মেরে, পিটে, এসিড ছুঁড়ে আজ ক্যাম্পাস-ছাড়া করতেও তারা দ্বিধাহীন- মাসের পর মাস নানা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণায় সামান্যতম বিব্রত বোধ না করা- শিক্ষা কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়া প্রভৃতি তাদের স্বার্থ জড়িত নানা অপকর্মের কারণে ঘটে চললেও না আছে সাংগঠনিক শাস্তি, না আছে আইনগত ব্যবস্থা তাদের বিরুদ্ধে। তাই হত্যা, খুন, ধর্ষণ, টেন্ডারবাজিসহ সকল অপকর্মের অবাধ বিস্তার ঘটে যেতে পারছে। বিস্ময়ের ব্যাপার এই যে ছাত্রলীগ ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের অঙ্গ বা সহযোগী সংগঠন হওয়া সত্ত্বেও এবং তাদের কার্যকলাপের ফলে আওয়ামী লীগ ও তার নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার প্রশ্নবিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও কি অদ্ভুত নির্বিকার ও নিস্পৃহতায় না ভুগছে। তবে কি রাষ্ট্রের ক্ষমতা, আইন-আদালতের শক্তি, সরকার ও প্রশাসন বা মূল রাজনৈতিক দল আজ ছাত্রলীগের কাছে এতটাই অসহায় যে ছাত্রলীগ দিন দিনই বেপরোয়া হয়ে পড়ছে এবং পড়তে পারছে। না, এসব ধরনের কোন ছাত্র সংগঠনের কোন প্রায়োজনীয়তা নেই দেশের জন্য। থাকলে তা দলের জন্য থাকতেও বা পারে। কিন্তু দল কি তাতে উপকৃত হবে। লেখক : রাজনীতিক E-mail:[email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন