রাজনীতির ভাষা :শোভন ও অশোভন

আপডেট : ২০ জানুয়ারি ২০১৩, ২১:১৩
বাংলাদেশের সামপ্রতিক রাজনৈতিক কথকথায় অমার্জিত ভাষা প্রায় প্রলাপের উক্তি হিসেবে স্বাদে, গন্ধে, সমাজের পর্বে পর্বে অভিঘাত সৃষ্টি করছে। রাজনীতিবিদদের ভাষা, ব্যক্তিমনের গুণবাচক উপাদান হওয়া সঙ্গত। একইভাবে এই ভাষার প্রয়োগ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের জন্য পরিচিতি বাচকও। রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরা যে ভাষায় কথা বলেন, তা রাষ্ট্রিক, কৃষ্টিক ও আর্থিক ধারণার একটি পাটাতনে দাঁড়িয়ে স্বকীয়তার সীমানায় থেকেই বলেন। এই সীমাবন্ধনই তাকে পরিচিত করে, সুনির্দিষ্ট ইতি-নেতিবাচক ইমেজ তৈরি করে। মনীষার অভাবহেতু, স্বভাবতই অমার্জিত, অশোভন কৃত্যাচার নেতৃত্ব, বয়স ও অবস্থান নির্বিশেষে বেমানান। রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের বিবমিষা কথা, সাধারণ মানুষের ক্ষুদ্ধতা, রটনা ও বৈরিতা মিলিয়ে রাজনীতির জমিনে নতুন মেধাবী মুখের কোন আকর্ষণ নেই। ভালো লোকের কোন ভাত নেই। তরুণ নেতৃত্ব, পাইপলাইনের নেতৃত্ব-অর্থবিত্ত, টেন্ডার বাণিজ্য, ভর্তি ও নিয়োগ বাণিজ্যসহ বাজিকরির মতো ফফর দালালিতে নেতৃত্বের শূন্যতা পূরণে উদগ্রীব। তারা অনুসরণীয় নেতৃত্বের ভবিষ্যত্ কাণ্ডারি, লাভালাভের বাটোয়ারার ওয়ারিশদার। বড় আয়নায় যেমন চেহারা দেখা যায়, ছোট আয়নাতেও তেমন চেহারা দেখা যায়। ব্যক্তি হচ্ছে ছোট আয়না, রাষ্ট্র হচ্ছে বড় আয়না। ব্যষ্টির মধ্যেও রাষ্ট্র প্রকৃতির উপস্থিতি যেমন, তেমনি সমষ্টির মধ্যেও রাষ্ট্র প্রকৃতির উপস্থিতি লক্ষণীয়। সমাজই হবে সংস্কৃতির নার্সারি, ভাষার সর্বোত্তম প্রয়োগ, শিক্ষণ ও অর্থ উত্পাদনের ক্ষেত্র। রাজনীতিকদের জীবনাদর্শ, রাষ্ট্রদর্শনের বুদ্ধিবৃত্তিক পাটাতনে ভিত্তিশীল হলেই জাতির পক্ষে অগ্রসরমাণ হওয়া সম্ভব। চীনা দার্শনিক কনফুসিয়াসের মতে, আদর্শ রাষ্ট্রশাসক সে ব্যক্তি, যিনি প্রত্যেক নাগরিককে নামে চেনেন। খারাপ শাসকের চেয়ে বাঘ আর বিপদ সংকুল জঙ্গলও ভালো। কনফুসিয়াস রাষ্ট্র শক্তির সঙ্গে প্রজাশক্তির মেলবন্ধন চেয়েছিলেন। আর ভারতবর্ষের দূরত্ব, কতো দূরপনেয় ছিল, এর নজির নবাব সিরাজ-উদ্দৌলা ইংরেজের সঙ্গে যুদ্ধে হারে, কৃষক দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে স্বাধীনতার অস্তমিত সূর্য দেখে। নৃতাত্ত্বিক দার্শনিক ম্যালিনোস্কির মতে, ধর্মের সবটুকু কালচার, কিন্তু কালচারের সবটুকুই ধর্ম নয়। পাকিস্তানি জামানায় শাসকের রবীন্দ্রবর্জিত মুসলিম মানসিকতায়, দীর্ণতায় প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান, বুলবুল চৌধুরীর নৃত্যানুষ্ঠান দেখে বলেছিলেন, তুমি পাকিস্তানি কালচারের প্রাণ। যদিও কালচার হয় জাতি পরিচয়ে। যদিও সংস্কৃতিহীনতার সংস্কৃতি জারির দিকেই বর্তমান মধ্যযুগীয় দৌড় পথ খুঁজছে। ষাটের দশকে হিন্দু সাহিত্যিকেরা বলতো, বাঙালির কালচার নেই, যা আছে তা এগ্রিকালচার। জাপানী এক অধ্যাপক বলেছিলেন, এগ্রিকালচার নামে বাঙালির যা আছে, তা আসলে আগ্লিকালচার। এ সব একাডেমিক পরিহাস বাঙালির পরিচয় নয়। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশে রাজনীতিকরা কি পরিচিতি নির্মাণ করে চলেছেন? কিছু কিছু বাক্যবাণে মনে হয়, প্রধানমন্ত্রী প্রত্যক্ষভাবে জিয়া পরিবারকে লক্ষ্য করে বিশেষ উদ্দেশ্য অর্জন করতে চান। তারেক রহমান দুর্নীতি ও চরিত্র হননের টার্গেটে পরিণত হন। অপরদিকে, সজিব ওয়াজেদ জয়ও নিষ্ফল ও দুর্বল আক্রমণের শিকার হন। গ্রামীণ ঝগড়ার মতো করেই প্রধানমন্ত্রী বলেন, চোরের মার বড় গলা। বিরোধীদলীয় নেত্রী খালেদা জিয়া এসব শুনে হতভম্ব হয়ে পড়েন। আইন প্রতিমন্ত্রী কামরুল ইসলাম সবজান্তার মতো বলেন, জিয়া মুক্তিযোদ্ধা নয়, পাকিস্তানি এজেন্ট। সমরযুদ্ধের ইতিহাসও তিনি নতুন করে জাতিকে প্রমাণসহ জানাতে চান। কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী ন্যূনতম মূল্যবোধের তোয়াক্কা না করেই বলেন, ৭১ এ খালেদা জিয়া ক্যান্টনমেন্টে ছিলেন। শেখ হাসিনা জন্ম হোক যথা তথা কর্ম হোক ভালো ভুলে গিয়ে খালেদা জিয়াকে উদ্দেশ্য করে বলেন, উনার জন্ম দার্জিলিং এর চা বাগানে। মতিয়া চৌধুরী জাতিকে নতুন ইতিহাস শেখাতে চোখ-মুখ খিচিয়ে বলেন, খালেদা জিয়া যুদ্ধাপরাধী। শেখ হাসিনা ব্যক্তিগত আক্রমণে বলেন, উনি এতিমের সম্পদ লুটকারী। যেন বাকযুদ্ধ নয়, গৃহযুদ্ধের কমান্ডার মতিয়া চৌধুরী বলেন যে, খালেদাকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা হবে। জাসদ (ইনু) দের মহাজোটভুক্ত হাসানুল হক ইনু বলেন খালেদা জিয়াকে রাজনীতি থেকে মাইনাস করা হবে। ওয়ান ইলেভেনের ভূত যেন রাজনীতির পিছু ছাড়ছে না। খালেদা জিয়া জনসভায় বলেন যে, সরকারের টপ টু বটম চোর। এই সরকার বিশ্বচোর। চট্টগ্রামের মহাসমাবেশে খালেদা জিয়া সরকারের উদ্দেশে বলেন, সরকারকে ল্যাংড়া, লুলা করে দেয়া হবে। দেখি খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে কত দূর যায়। প্রত্যুত্তরে বন ও পরিবেশ মন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ বলেন, আল্লাহ উনাকেই খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাটায়। সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের ঘটনার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, কারো বেডরুম পাহারা দেওয়া সম্ভব নয়। সৌদি কূটনীতিক খালাফ রাস্তায় হত্যাকাণ্ডের শিকার হলে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এরশাদ বললেন, এই সরকারের আমলে ঘরে খুন, বাইরে গুম। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস সরকার দলীয় আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল হানিফের বক্তব্যে উত্তেজিত হয়ে বলেন, ওর জিহ্বা কেটে কুত্তা দিয়ে খাওয়াবো। সর্বশেষ বিরোধীদলীয় নেত্রী খালেদা জিয়া ঢাকার গাবতলীতে এক পথসভায় বলেন, সাপকে বিশ্বাস করা যায়, আওয়ামী লীগকে না। প্রধানমন্ত্রী সারাদিন মিথ্যা কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রতিক্রিয়ায় জানান যে, উনার আশপাশে কারা? উনি সাপের ঝাঁপি মাথায় নিয়ে হেঁটে চলছেন। ওঝা মরে সাপের বিষে। নবম জাতীয় সংসদের উপনেতা সাজেদা চৌধুরী খালেদা জিয়ার উদ্দেশে বলেন, তিনি কালনাগিনী। ভাষার বিষে নীল হওয়া রাজনীতির উদ্ধৃত কিছু উদাহরণ-বাক্য থেকে উপলব্ধি করা যায় যে, শুধু পার্শ্বচরিত্র নয়, রাজনীতির দূষণ খাস মহলেও পৌঁছে গেছে। রাজনীতি হতে সুবচন নির্বাসনে গেছে। দেশে মনুষ্য সৃষ্ট দুর্যোগের ঘনঘটায় চলতি রাজনীতিতে সাপ ভিলেনের চরিত্রে হঠাত্ আবির্ভূত। ফাঁফা কথামালার রাজনীতি বাতাসে উত্তাপ ছড়াচ্ছে। অন্ত:সার শূন্য ঠুনকো মেধাহীন কথার ফুলঝুঁড়িতে রাজনীতি পুঁতিগন্ধময়, তমসাচ্ছন্ন। জনগণের ললাট লিখন, দুর্ভোগ, দুর্ভাগ্যের অমোচনীয় দাগে কলঙ্কিত। আশাহীন, দিশাহীন রাজনৈতিক শূন্যগর্ভ ভাষণে ও দু:শাসনে জনগণ ভবিষ্যত্ নিয়ে শঙ্কিত। পাকিস্তান আমলে মুসলিম লীগের ছয় বছরের শাসন আমলে আবুল হোসেন সরকারের মন্ত্রীসভাকে বলা হতো, ‘লুটপাট কোম্পানি’। আলী বাবা ও চল্লিশ চোরের আমলে ১৯৫৭ সালের ২১ মার্চ পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদে বাজেটের উপর সাধারণ আলোচনায় বাঙালিদের জন্য পৃথক ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের প্রতিষ্ঠাতা, প্রাদেশিক পরিষদের স্বতন্ত্র সদস্য মেজর গণির উদ্ধৃতিতেও সাপের মাথায় ব্যাঙের নাচন দেখা যায়। সেই যুক্তফ্রন্ট সরকার আমলে ভূত-বা সাপের প্রসঙ্গ নতুন কিছু নয়, বরং বেশ পুরানো। পার্লামেন্টের ভাষণে সরকারের মতিগতি নিয়ে বলা হয়, ‘বলিবে দক্ষিণে, যাইবে উত্তরে, সাপের মাথায় ব্যাঙ নাচে, জলে শিলা ভাসে, বানর সঙ্গীত গায়’। আমরা আজ অশোভন অনুকরণপ্রিয়তায় কার সঙ্গীত বারবার গাইছি? লেখক :সহকারী অধ্যাপক, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। [email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন